বুধবার ৫ আগস্ট ২০২৬ ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার ৫ আগস্ট ২০২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
‘দুই সপ্তাহেই ককরোচরা মোদির ২৪ বছরের পুরো ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে’





ইন্ডিয়া টুডে
Wednesday, 5 August, 2026
3:05 AM
Update: 05.08.2026
3:10:58 AM
 @palabadalnet

ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায় সোমবার বলেছেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে তরুণদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনমনে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তিকে ধ্বসিয়ে  দিয়েছে। তিনি এই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবকে ‘এক অর্থে নির্বাচনের চেয়েও বড় বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

তার বই  Mother Mary Comes to Me-এর হিন্দি অনুবাদ  Meri Maa, Meri Gangster প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অরুন্ধতী রায় বলেন, সাম্প্রতিক এই গণমোবিলাইজেশন দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েক দশক ধরে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ানও অল্প সময়ের মধ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তাহলে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। যন্তর মন্তরের তরুণ বিক্ষোভকারীরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ভূমিকা পালন করায় তাদের প্রশংসাও করেন তিনি।

ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে আয়োজিত এক পরিপূর্ণ অনুষ্ঠানে অরুন্ধতী রায় বলেন, “আমার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, আমাদের বা দেশের ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা কেউ জানে না। চিত্রনাট্য লেখা হচ্ছে। আর প্রত্যেকেরই সেখানে নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। মানুষ প্রায়ই মনে করত, তাদের হাজার বছর ধরে একই পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই ধারণা কিছুটা হলেও শিকড় থেকে নড়ে গেছে।”

‘তেলাপোকারা ২৪ বছরের ভাবমূর্তি ধ্বংস করেছে’

অরুন্ধতী রায় বলেন, বিপুল অর্থ ব্যয় করে ২৪ বছর ধরে নরেন্দ্র মোদির একটি জনভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে। এমনকি তিনি কোনো সংবাদ সম্মেলনও করেননি। অথচ অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদির ২৪ বছরের যে ভাবমূর্তি-কোটি কোটি রুপি খরচ করে তৈরি করা হয়েছে, এমনকি তিনি কোনো সংবাদ সম্মেলনও করেননি; কেউ কেউ তাকে বিষ্ণুর অবতার পর্যন্ত বলেন-দুই সপ্তাহের মধ্যে তেলাপোকারা সেই ২৪ বছরের পুরো ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।”

এরপর এই ঘটনাকে তিনি ‘এক অর্থে নির্বাচনের চেয়েও বড় বিজয়’ বলে অভিহিত করেন।

তবে অরুন্ধতী রায় সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ যদি সরকারের হাতেই থেকে যায়, তাহলে প্রকৃত পরিবর্তন আনা কঠিন।

তিনি বলেন, “এই সরকার যদি প্রতিষ্ঠানগুলো বা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ধরে রাখে, তাহলে আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে।”

‘তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে’

অরুন্ধতী রায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি যন্তর মন্তরের তরুণ বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকার সম্ভাবনা থাকলেও তরুণরা পরিণত আচরণের পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে।”

সংগীতের উদাহরণ দিয়ে অরুন্ধতী রায় বলেন, “বেস গিটারবাদক গায়ক হতে পারেন না, গায়ক ড্রামার হতে পারেন না, ড্রামার গিটারবাদক হতে পারেন না-তারা প্রত্যেকে ভিন্নভাবে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছেন। এখন বড়দেরও নিজেদের পরিণত হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে।”

মা ও ‘মেরি মা, মেরি গ্যাংস্টার’

আলোচনায় অরুন্ধতী রায় তার বই  Meri Maa, Meri Gangster নিয়েও কথা বলেন। বইটির হিন্দি অনুবাদ করেছেন প্রভাত সিং এবং প্রকাশ করেছে রাজকমল প্রকাশন।

অরুন্ধতী রায় বলেন, বইটি ‘তার আত্মজীবনীও নয়, আবার তার মায়ের জীবনীও নয়’। বরং এটি মা ও মেয়ের মধ্যকার সম্পর্কের ‘জীবনী’-যেখানে তারা মা ও মেয়ে হওয়ার পাশাপাশি দুজন স্বতন্ত্র নারী।

বইটির কেন্দ্রে রয়েছে তার মা মেরি রায়ের সঙ্গে অরুন্ধতীর জটিল সম্পর্ক। মেরি রায় ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও নারী অধিকারকর্মী। কেরালার সিরিয়ান খ্রিস্টান নারীদের পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার আইনি লড়াইয়ের জন্য তিনি পরিচিত।

বইয়ের নামের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মাকে ‘গ্যাংস্টার’ বলার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেন অরুন্ধতী রায়।

তিনি বলেন, “সম্ভবত হিন্দিভাষী বিশ্বের কিছু মানুষ ক্ষুব্ধ হন, কারণ আমি আমার মাকে ‘গ্যাংস্টার’ বলেছি। কিন্তু সমালোচক ও যারা আমাকে সমর্থন করেন-উভয়েই বিষয়টি বুঝতে ভুল করছেন। সমালোচকরা বলেন, ‘কীভাবে তুমি তোমার মাকে গ্যাংস্টার বলতে পারো?’ আর যারা আমাকে সমর্থন করেন, তারা বলেন, ‘তিনি শুধু অত্যন্ত সুরক্ষাদানকারী ছিলেন।’ দুটোই ভুল। তিনি গ্যাংস্টার ছিলেন।”

তিনি আরও বলেন, যখনই তিনি কোনো আক্রমণের মুখে পড়েন, তখন নিজেকে মনে করিয়ে দেন, “তোমরা কি জানো আমার মা কে? তোমরা কি জানো আমি কার মেয়ে? তোমরা আমার কী করতে পারো?”

‘অন্য ঘরে কেউ একজনকে মারধর করা হচ্ছে’

সফল লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণে নিজের মধ্যে যে চাপ অনুভব করেন, সে বিষয়েও কথা বলেন অরুন্ধতী রায়।

তিনি বইটির ‘Collateral’ অধ্যায়ের প্রসঙ্গ তুলে শৈশবের একটি ঘটনা স্মরণ করেন। একবার তার ভাইয়ের রিপোর্ট কার্ডে তাকে ‘গড়পড়তা শিক্ষার্থী’ বলা হয়েছিল। এরপর মা তাঁর ভাইকে ঘুম থেকে তুলে কাঠের স্কেল দিয়ে মারধর করেন। অরুন্ধতী তখন ঘুমের ভান করে ছিলেন।

পরদিন সকালে ভালো ফলাফল করার কারণে মায়ের কাছ থেকে আলিঙ্গন পেয়েছিলেন তিনি।

বইয়ে অরুন্ধতী লিখেছেন, “সেই সময় থেকেই আমার কাছে ব্যক্তিগত প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে এক ধরনের অশুভ আশঙ্কা জড়িয়ে আছে। যখনই আমাকে অভিনন্দন জানানো হয় কিংবা করতালি দেওয়া হয়, আমার সবসময় মনে হয়, অন্য কেউ, নীরব কেউ, অন্য একটি ঘরে মার খাচ্ছে।”

অরুন্ধতী বলেন, পরবর্তী সময়ে ‘অন্য ঘর’-এর এই ধারণাটিই তাঁর লেখালেখির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “মানুষ মনে করে আমি একজন সফল লেখক। আমি তা নই। তারা আমাকে সম্মান জানায়, পুরস্কার দেয়, বুকার পুরস্কার দেয়-কিন্তু অন্য ঘরে কেউ একজনকে মারধর করা হচ্ছে। আমার পুরো লেখালেখিই সেটি নিয়ে।”

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নির্যাতন ও অবিচারের প্রসঙ্গে এই রূপককে আরও বিস্তৃত করেন অরুন্ধতী। তাঁর ভাষায়, সর্বত্রই “কেউ না কেউ মার খাচ্ছে”-“গাজায়, কোনো বাসস্ট্যান্ডে, কোনো গ্রামে, যন্তর মন্তরে।”

অরুন্ধতী বলেন, তাঁর লেখালেখির উদ্দেশ্য হলো এমন মানুষ ও অভিজ্ঞতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা, যেগুলো প্রায়ই মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

‘আমরা আর মার খাব না’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে অরুন্ধতী রায় বলেন, অবিচারকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব এখন নাগরিকদের।

তিনি বলেন, “এখন আমাদের দেখাতে হবে, আমরা আর মার খাব না।”

বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অরুন্ধতী রায়ের বক্তব্যে একদিকে উঠে আসে যন্তর মন্তরের তরুণদের আন্দোলন, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি; অন্যদিকে উঠে আসে তার মা মেরি রায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা—যা Meri Maa, Meri Gangster বইটির মূল বিষয়।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]