
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ছবি: রয়টার্স
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী দলগুলোর ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে অবশেষে আজ শনিবার দুপুরের দিকে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ধর্মেন্দ্র নিজে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নেতৃত্বে ভারতজুড়ে তুমুল বিক্ষোভ চলে।
সম্প্রতি ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট-ইউজি) ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং ব্যাপক কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। এরপরই মূলত ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির এই আন্দোলন গতি পায়।
গত সোমবার সিজেপির ডাকে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্ট (সংসদ) অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটা করে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে দিল্লিতে এটি ছিল সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।
এরপর সিজেপি ঘোষণা দেয়, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। এই চাপের মুখেই আজ পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়ে এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া দীর্ঘ এক বিবৃতিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, “আমি দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং তাদের ন্যায়সংগত প্রত্যাশাকে গভীর সম্মান করি। প্রথম দিন থেকেই আমি এই পরিস্থিতির (পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস) দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়েছি।”
তিনি বলেন, গত ৩ মে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম দেখা দেওয়ার পর সরকার অবিলম্বে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, “আমার সংকল্প ছিল যে পরীক্ষা মাফিয়াদের কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেব না, কারও সঙ্গে অন্যায় হতে দেব না। কিন্তু এই সময়েও দায়িত্বশীল পদে থাকা অনেক ব্যক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, যা আমার মনকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে।”
মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিট–এর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ঘিরে শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন করে আসছেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে এ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সারা দেশ থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে সমর্থন জানান।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠক করেন। সিজেপি তিনটি দাবি উত্থাপন করেছে। এগুলো হলো—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টের (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ।
গতকালের বৈঠকে আন্দোলনকারীদের দুটি প্রধান দাবিতে নীতিগতভাবে সম্মতি দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। সেগুলো হলো বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া। তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকেন শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সিজেপির নেতারা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে বিজেপির কয়েকটি সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সরকার কোনোভাবেই মানবে না।
আজ বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে তৃতীয় দফার বৈঠক হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
শনিবার সকালে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অন্যতম প্রধান মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেছিলেন, সরকার যদি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না করাতে চায়, তাহলে সেটি স্পষ্ট ভাষায় জানাতে হবে। তার ভাষায়, ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিষয় নিয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের মূল দাবি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই সরকারকে ‘হ্যাঁ অথবা না’-এমন পরিষ্কার উত্তর দিতে হবে। যদি ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করেন, তাহলে এ ধরনের বৈঠকের আর কোনো অর্থ নেই এবং আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না-করলে আন্দোলন থামবে না, জানিয়ে দিয়েছিল সিজেপি। শনিবার সকালে রাঙ্কা সমাজমাধ্যমে নতুন করে সেই বার্তা দিয়েছেন। লিখেছেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবির সঙ্গে কোনও আপস করা যাবে না। সরকার যদি তাতে রাজি না থাকে, তা হলে নতুন করে আলোচনার কোনও মানে নেই।”
একটি সাক্ষাৎকারে রাঙ্কা বলেছেন, “এটা একটা সংবেদনশীল বিষয়। মাসের পর মাস ধরে এটা চলতে পারে না। কারণ, সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সরকার আমাদের যত বেশি অপেক্ষা করাবে, ক্ষোভ তত বাড়বে। এখন সেই ক্ষোভের নিশানায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও চলে এসেছেন। সরকারকে বুঝতে হবে, আগামী দিনে হয়তো আন্দোলন আর শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।”
সিজেপি’র তরফে মোট তিনটি দাবি সরকারের সামনে রাখা হয়েছে- এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। দুই, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা এবং তিন, প্রশ্নফাঁসের কারণে নিট বাতিল হওয়ার পর যে ছাত্রছাত্রীরা আত্মঘাতী হয়েছেন, তাঁদের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ।
পালাবদল/এসএ