জনদুর্ভোগকে আড়াল করতেই সারা দেশে ছাত্রদল-যুবদলকে দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতাসহ জনদুর্ভোগ থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতেই দেশজুড়ে ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছাত্রদলের এই সন্ত্রাসী সক্ষমতা যাচাইয়ের অপচেষ্টা তাদের জন্যই বুমেরাং হবে বলেও মন্তব্য করেছেন ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের পর রাতে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়।
দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল ও যুবদলের ক্যাডারদের মাধ্যমে সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ছাত্রশিবিরের সভাপতি। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উদযাপন অনুষ্ঠান চলাকালে জকসু নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এবং ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল ও যুবদলের চিহ্নিত ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা বর্বরোচিত হামলা চালায়। এসব হামলায় বহু নেতাকর্মী আহত হন।
শিবির সভাপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ অনুষ্ঠান চলাকালে শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট নিরসন ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবির প্ল্যাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু প্রক্টর অফিস ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের পথ আটকে প্ল্যাকার্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলে। পরবর্তীতে জকসুর ভিপি শিক্ষার্থীদের ভেতরে নিতে এলে প্রক্টর অফিস এবং জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও সদস্য সচিব শামসুল আরেফিনের নেতৃত্বে পুনরায় পথ আটকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গায়ে হাত তোলা হয়।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, মূলত, ক্যাম্পাসের বড় বাজেটের উন্নয়ন কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকবে এবং কেউ চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কিন্তু ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার চাঁদা ও অবৈধ কমিশনের ভাগ পাওয়ার লোভী মানসিকতা থেকেই ছাত্রদল সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে।
এই হামলায় জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, এজিএস মাসুদ রানাসহ ইনকিলাব মঞ্চ ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী, কর্তব্যরত সাংবাদিক এবং অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে আহতরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও হামলাকারীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। সেখানে থাকা রোগীদেরও রেহাই দেয়নি।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ক্যাম্পাসের শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকবে এবং কেউ চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কিন্তু ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার চাঁদা ও অবৈধ কমিশনের ভাগ পাওয়ার লোভী মানসিকতা থেকেই ছাত্রদল সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও জকসু প্রতিনিধিদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি করতে না পেরে এই সন্ত্রাসীরা আজ উন্মাদ হয়ে গেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণে শতকোটি টাকার উন্নয়নের কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে চাঁদাবাজি করা যাবে না। তবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে করলে চাঁদা আর কমিশনের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করা যাবে। সে কারণে ছাত্রদল সেনাবাহিনীর কাছে এই কাজ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে।
এ হামলায় জকসু নেতাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তির নেতাসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানান নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, জবি ক্যাম্পাসের পর কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল নেতাদের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয় ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। সেখানে সাধারণ রোগীদের ওপরও হামলা করা হয়।
ঢাকা কলেজে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের জন্য দোয়া ও আহত ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকালে ছাত্রদল হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন ছাত্রশিবিরের সভাপতি। আর ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার হলে বহিরাগত ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
কিছুদিন ধরে ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে নূরুল ইসলাম বলেন, ভিত্তিহীন গুজবকে হাতিয়ার বানিয়ে শাহবাগে থানার ভেতর ডাকসু নেতাদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে এই হামলার শুরু হয়। এই ধারাবাহিক হামলার পেছনে সরকারের উচ্চ মহল থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতাও অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করছে।
ছাত্রশিবিরের সভাপতি আরও বলেন, “ক্ষমতার মসনদ খুব পিচ্ছিল। ক্যাম্পাসগুলোকে অস্থিতিশীল করলে ক্ষমতার মসনদে বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভব হবে না। প্রধানমন্ত্রীর পতনের জন্য যুবদল-ছাত্রদলই যথেষ্ট হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের হামলার বিচারের দাবিতে বুধবার সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত ছাত্র-গণজমায়েত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
হামলার ঘটনায় শিবির কোনো মামলা করেছে কি না, সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে নূরুল ইসলাম বলেন, এর আগে মামলা করে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। সে কারণে তাঁরা মামলা করেননি। এ ঘটনায় প্রশাসন যেন তদন্ত করে, সেই দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ, প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান, ছাত্র অধিকার সম্পাদক ও জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ কমিটির অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো:
১. সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবির সাহায্যে জকসু জিএস আব্দুল আলিম আরিফের চোয়াল ভেঙে দেওয়া জবি ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান রুমি ও জাফর, ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসার ঘটনায় জড়িত যুবদল নেতা নয়ন এবং বেরোবিতে হামলাকারী বহিরাগত সকল সন্ত্রাসীকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২.সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা এবং অডিটোরিয়ামে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্টর অফিসের যেসকল কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৩. জকসু নেতৃবৃন্দ, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং কর্তব্যরত আহত সাংবাদিকদের সুচিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারকে বহন করতে হবে।
৪. ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার হলের নিয়ন্ত্রণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের আবাসিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. শিক্ষার্থীদের মূল দাবি অনুযায়ী জবি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ অবিলম্বে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে এসব হামলার প্রতিবাদে ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত গণজমায়েত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্রশিবির। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি দেয়া হবে বলে তারা জানান।
সংবাদ সম্মেলনের আগে এই হামলার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর ফটকে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রশিবির।
পালাবদল/এসএ