বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬ ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬
 
বিদেশ
এক ইরান যুদ্ধেই ফুরিয়ে যাচ্ছে ট্রাম্পের অস্ত্রভাণ্ডার?





Wednesday, 29 July, 2026
12:30 AM
 @palabadalnet

টমাহক ক্রুজ মিসাইল। ছবি: সংগৃহীত

টমাহক ক্রুজ মিসাইল। ছবি: সংগৃহীত

চলতি মাসের শুরুতে পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটের মঞ্চে ওঠেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বৃহত্তম প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা। তাদের উদ্দেশে ট্রাম্পের বার্তা ছিল একটাই, আরও অস্ত্র তৈরি করুন এবং আরও দ্রুত তৈরি করুন।

মার্কিন আর্মি ওয়ার কলেজে ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী’ পিট হেগসেথকে পাশে রেখে জড়ো হওয়া অস্ত্র নির্মাতাদের ট্রাম্প বলেন, ‘বিশ্বের সেরা মানের অস্ত্র আমাদের আছে। কিন্তু আমাদের আরেকটু গতি দরকার।”

ট্রাম্প প্রশাসন এই সম্মেলনকে দুটি লক্ষ্য অর্জনের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরে। একটি মার্কিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং অপরটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বাড়ানো।

হেগসেথের ভাষ্য, দেশটির ‘স্বাধীনতার অস্ত্রাগার’ আরও শক্তিশালী করা।

তবে যে বিষয়টি অনেকটাই অনুচ্চারিত থেকে গেছে, তা হলো চলতি বছরের শুরুতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরির’ আওতায় ইরানে প্রায় ৪০ দিনের তীব্র সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ও উৎপাদন-কঠিন অস্ত্রের ব্যবহার। এরপর পাল্টাপাল্টি হামলাতেও এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত মার্কিন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা)। এর সিংহভাগই খরচ হয়েছে গোলাবারুদ ও অস্ত্রে।

৮ এপ্রিল নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ইরানজুড়ে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ১ হাজার ৭০০টির বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে এখন ইরানে হামলা স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা বাদ দিতে ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত আরও কমে যেত।

সোমবার অস্ত্রের ঘাটতি থাকার কথা অস্বীকার করেন ট্রাম্প।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, “বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ আছে, এমনকি আমাদের যতটা প্রয়োজন, তার চেয়েও অনেক বেশি।”

বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই মার্কিন প্রশাসনের জন্য স্পর্শকাতর। গত মাসে এ নিয়ে বিবিসির তরফ প্রশ্ন করা হলে হেগসেথ অস্ত্রের সরবরাহ কমে আসার কথা অস্বীকার করেছিলেন।

তবে এরপর তার অবস্থান বদলেছে বলেই মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটিকে তিনি বলেন, সরঞ্জামসহ ‘যথেষ্ট ঘাটতি’ মোকাবিলায় পেন্টাগনের আরও ৮৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

ঠিক কত গোলাবারুদ খরচ হয়েছে এবং মজুতে আর কত আছে, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।

তবে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সংকলিত তথ্য থেকে অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। স্বল্প সময়ে এই ঘাটতি পূরণ করাও কঠিন।

বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল ও সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, ‘কোন অস্ত্র, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে—তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে এক থেকে পাঁচ বছর লাগে, এটাই মূল কথা।”

“আর এটিকে দ্রুত করার মতো কিছুই আপনি করতে পারবেন না।”

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও মিসাইলের মজুদ কি ঝুঁকিতে? সম্প্রতি অতিরিক্ত গোলাবারুদ খরচের কারণে পেন্টাগন ভবিষ্যতে নিজেদের সামরিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিপাকে পড়তে পারে বলে বিবিসির এক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

কমে যাওয়া মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার

যুদ্ধে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়-দূরপাল্লার স্থলভাগে হামলার ব্যবস্থা এবং ইরানের আসা হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

স্থলভাগে হামলার যেসব অস্ত্র সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, তার মধ্যে ছিল টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল বা টিএলএএম। সাধারণত জাহাজ বা সাবমেরিন থেকে এটি ছোড়া হয় এবং ১ হাজার মাইলের (১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার) বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারে।

এই অস্ত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কমান্ড বাংকার বা সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনার মতো কঠিন লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলা চালাতে পারে, আবার পাইলটচালিত উড়োজাহাজকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হয় না।

সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে ১ হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। যুদ্ধের আগের পর্যায়ে মজুত ফিরতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সিএসআইএসের তথ্য অনুযায়ী, টিএলএএমের সর্বশেষ সংস্করণের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ২৬ লাখ ডলার।

যুদ্ধে ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে প্যাট্রিয়টের। ভূমিভিত্তিক এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উড়োজাহাজের পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো যায়।

সিএসআইএসের হিসাবে, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে আনুমানিক ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ছিল। সংঘাতে এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৩০টি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম আনুমানিক ৪০ লাখ ডলার (প্রায় ৫০ কোটি টাকা)। অর্থাৎ এটি ব্যয়বহুল, তবে কার্যকর। বারবার এটি ব্যবহার করে ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, অথচ এসব ড্রোনের প্রতিটির দাম মাত্র ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে।

ক্যানসিয়ান বলেন, “একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে কয়েক বছর লাগে। আজ যদি আপনি এই ব্যবস্থায় অর্থ দেন, তিন বা চার বছরের আগে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পাবেন না। কখনো কখনো পাঁচ বছরও লাগে।”

“আমরা এখন যেসব ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছি, সেগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল ২০২৩ সালে”, বলেন তিনি।

যুদ্ধে আরও ব্যবহৃত হয়েছে অপেক্ষাকৃত নতুন ও অত্যাধুনিক একটি ব্যবস্থা-টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড। পুরোনো প্যাট্রিয়টের তুলনায় এর পাল্লা বেশি এবং আরও বেশি উচ্চতায় লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে পারে।

থাডের মজুত আগে থেকেই সীমিত ছিল। সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে আনুমানিক ৩৬০টি থাড ছিল, যার মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টি ছোড়া হয়েছে।

বিশ্বে মাত্র নয়টি থাড ব্যাটারি কার্যকর রয়েছে। এর সাতটিই যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে এভাবে অস্ত্র ব্যবহার চলতে থাকলে রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত সংখ্যায় মার্কিন বাহিনীর হাতে নাও থাকতে পারে।

নজর এখন তাইওয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে

ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ এমন এক সময়ে হয়েছে, যার ঠিক পরেই আসছে সেই সময়কাল, যাকে প্রায়ই ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বলা হয়। কিছু মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদের চোখে এই সময়ে চীন তাইওয়ানে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করতে পারে-এমন আশঙ্কা বেড়ে যায়।

বিতর্কিত এই ধারণাটি প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চিন্তাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এর সূত্রপাত ২০২১ সালে কংগ্রেসের এক শুনানিতে। তখন ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আগামী ছয় বছরের মধ্যে’ তাইওয়ানে আক্রমণ ঘটতে পারে।

২০২৩ সালে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে চীন তাইওয়ানে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দেখে এবং এর সঙ্গে ‘পুনরেকত্রীকরণের’ অঙ্গীকার করে আসছে। এ জন্য শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি বেইজিং।

তাইওয়ানকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে এবং চীনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। এই অস্পষ্টতা সত্ত্বেও দ্বীপটিকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।

অস্ত্রের এই ঘাটতিকে ক্যানসিয়ান একটি ‘ঝুঁকির সময়কাল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘প্রয়োজনীয় পছন্দের অস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুত থাকবে না’।

তার বিশ্বাস, এতে এমন ঝুঁকি বাড়ছে যে প্রশান্ত মহাসাগরে সংঘাত হলে চীনের বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও উড়োজাহাজের অস্ত্রভান্ডারের মুখোমুখি হতে মার্কিন বাহিনী যথেষ্ট প্রস্তুত থাকবে না।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে চীন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। এর মধ্যে রয়েছে হাইপারসনিক গ্লাইড ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানের ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও সস্তা ড্রোনের চেয়ে অনেক বেশি অত্যাধুনিক।

বিশাল ‘ড্রোন-সোয়ার্ম’ বা একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহারের কৌশল তৈরিতেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে বেইজিং।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুতকে সবাই শুধু দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন না।

সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে মধ্যপ্রাচ্য নীতিবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা জ্যাকব ওলিডর্ট বলেন, যুদ্ধে এসব অস্ত্রের ব্যবহারও শক্তিশালী বার্তা দেয়।

বর্তমানে রক্ষণশীল ঘরানার আমেরিকা ফার্স্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের আমেরিকান নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক পরিচালক ওলিডর্ট বলেন, ‘অস্ত্র শুধু কোনো দেশের কাছে থাকার কারণেই প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে না। দেশগুলো যে এসব অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত, তা দেখানোর মাধ্যমেও প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়।”

তিনি আরও বলেন, ‘অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এবং রেকর্ড সময়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় করার ক্ষেত্রে’ যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য চীনসহ অন্য প্রতিপক্ষ এবং তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিও একটি বার্তা পাঠায়।

ইউরোপের কী হবে?

মিত্রদের অস্ত্র দেওয়া এবং নিজেদের মজুত সংরক্ষণের মধ্যে যে দৃশ্যমান টানাপোড়েন, সেটি ইউক্রেনের ক্ষেত্রেই আগেই দেখা গেছে।

অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর কয়েক মাস আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প ইউক্রেনকে টমাহক দিতে অস্বীকৃতি জানান। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

ইরান যুদ্ধের পর বৃহত্তর অস্ত্রভান্ডার নিয়ে যে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে, ওই ঘটনাটি যেন তারই আগাম আভাস ছিল।

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে তাদের জরুরিভাবে প্যাট্রিয়ট ও অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।

মার্চে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল যে জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছ তা নয়, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদন সক্ষমতার ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, “ফলে আমাদের (ইউক্রেনের) সম্পদও কমে যাচ্ছে।”

এই উদ্বেগ বোঝাতে সংখ্যাও তুলে ধরেন জেলেনস্কি। যুক্তরাষ্ট্র মাসে আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, অর্থাৎ বছরে ৭০০ থেকে ৮০০টি। অথচ অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম দিনেই ৮০৩টি ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে আরও সম্প্রতি ইউক্রেনকে নিজেদের দেশেই প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তাকে অবাক করেছেন ট্রাম্প। জার্মানি ও জাপানে এরই মধ্যে একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রতিরক্ষা দপ্তরে ১৩ বছর কাজ করা এলেইন ম্যাককাসকার বর্তমানে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা-দুটিই বর্তমান ব্যয়বহুল অস্ত্রগুলোর পাশাপাশি কম খরচে ব্যাপকভাবে উৎপাদনযোগ্য ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

তিনি বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরেই জানি যে ১ হাজার ডলারের ড্রোন লক্ষ্য করে ৬০ লাখ ডলারের ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে চাই না। আমার মনে হয়, এখন সেই সমাধানের দিকে আমাদের মনোযোগ আরও বেড়েছে এবং কম খরচে, সহজে হারানো বা প্রতিস্থাপনযোগ্য সমাধান বেশি সংখ্যায় তৈরির দিকে আরও বেশি মানুষ মনোযোগ দিচ্ছেন।”

এরপর কী?

এত কিছুর পরও শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা খুব বেশি নেই। এর কারণ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত সীমাহীন, বরং ইরানের অবস্থা আরও খারাপ।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বিবিসিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য এবং তার বাইরেও প্রয়োজন মেটানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মজুত রয়েছে। আর অপারেশন এপিক ফিউরি দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লাগতে এলে কী ঘটে।”

তিনি আরও বলেন, “তারপরও প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি আরও অস্ত্র নিরন্তর উৎপাদন করতে তাগিদ দিয়েছেন।”

সাম্প্রতিক সময়ে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড যেসব হামলার ঘোষণা দিয়েছে, সেগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে ফেলার তেহরানের সক্ষমতা দুর্বল করা। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র অবরুদ্ধ করে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একের পর এক হামলার পর ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে সেই ঘাটতি পূরণের সক্ষমতাও দেশটির অত্যন্ত সীমিত।

ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরানের নীতিবিষয়ক পরিচালক জেসন ব্রডস্কি বলেন, ‘অনেক বিশ্লেষণে এমনভাবে দেখানো হয়, যেন ইরানের অস্ত্রের পরিমাণ প্রায় সীমাহীন। আমার মনে হয়, আমাদের বুঝতে হবে, সেখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিকে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দুর্বল করে দিয়েছে।”

তিনি বলেন, ইরানের যে ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্রব্যবস্থা প্রয়োজন, সেগুলো ‘বড় পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা’ অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।

ব্রডস্কির ভাষ্য, ইরান তাদের হাতে থাকা অবশিষ্ট অস্ত্রের মজুতকে এখন এমন এক শেষ বাজি বা ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যার সক্ষমতাও সময়ের সাথে সাথে দ্রুত কমে আসছে।

ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ব্রডস্কি একে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ বা মনোযোগের কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাই ওয়াশিংটনের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে এটিই অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

যদিও কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, সামগ্রিক অস্ত্রের মজুতের চিত্র উপেক্ষা করা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ হবে।

ব্রডস্কি বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক এখন আরও দূরের হুমকি। নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। আর এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে।”

আপাতত ইরানের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে ছোড়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো প্রতিটি অস্ত্র কিংবা তাইওয়ানের জন্য রেখে দেওয়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র—সবই এমন একটি অস্ত্রভান্ডার থেকে আসছে, যা ক্রমেই ছোট হয়েছে।

তারপরও ওয়াশিংটনের বাজি হলো, উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানোর আগ পর্যন্ত এই সংঘাত সামলে নেওয়া সম্ভব হবে।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]