
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপস্থিতিতে ওয়াশিংটনের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে কাঠামোগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন (সামনের সারি, বাম থেকে) যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লাইটার, স্টেট ডিপার্টমেন্টের চিফ অব স্টাফ ড্যানিয়েল হলার এবং যুক্তরাষ্ট্রে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি সই হয়েছে, যা উভয় দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে চুক্তির শর্ত, বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং হিজবুল্লাহর অবস্থানের কারণে এটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “এটি শুরুরও শুরু। সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি। প্রথম পদক্ষেপটাই সবচেয়ে কঠিন।”
চুক্তিতে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মাওয়াদ, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লাইটার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেন। রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি।
চুক্তিতে কী আছে?
মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির লক্ষ্য হলো লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা, তাদের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা এবং পরে ইসরায়েলি বাহিনীকে সীমান্তে ফিরিয়ে নেওয়া।
এ লক্ষ্যে ‘লেবাননের জন্য সামরিক সমন্বয় গ্রুপ’ নামে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারক করবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ নথিতে বলা হয়েছে, একটি ‘ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া’র মাধ্যমে লেবাননের সেনাবাহিনী দেশটির পুরো ভূখণ্ডে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এর আগে অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ ও তাদের অবকাঠামো ধ্বংস নিশ্চিত করতে হবে—যা মূলত হিজবুল্লাহকে ইঙ্গিত করে।
এর পরই কেবল ইসরায়েল ধীরে ধীরে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।
‘পাইলট জোন’ কী?
চুক্তিতে প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি ‘পাইলট জোন’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাবে এবং লেবাননের সেনাবাহিনী ধাপে ধাপে নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
চুক্তি অনুযায়ী, এসব এলাকায় অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর সফল নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সহায়তায় পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে এবং বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে পারবেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, লেবাননের সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসরায়েলের জন্য হুমকি থাকলে সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র কী সহায়তা দেবে?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সমন্বয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তা দেবে।
এ ছাড়া, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় ৩ কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ওয়াশিংটন।
লেবাননের অবস্থান কী?
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেছেন, চুক্তির উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েলের দখলে থাকা সব লেবানিজ ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা।
তার ভাষায়, এটি মূলত পূর্ববর্তী চুক্তি ও জাতিসংঘের প্রস্তাবনাগুলোর ধারাবাহিকতা, যেখানে পুরো দেশের ওপর লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও একে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বাস্তুচ্যুত মানুষদের মুক্ত হওয়া এলাকায় ফিরে যাওয়ার পথ খুলে দেবে এই চুক্তি।
হিজবুল্লাহ কেন আপত্তি করছে?
চুক্তি আলোচনায় হিজবুল্লাহ অংশ নেয়নি। তবে বাস্তবে সংগঠনটির অবস্থানই চুক্তির সফলতা বা ব্যর্থতার অন্যতম নিয়ামক।
হিজবুল্লাহ বরাবরই বলে আসছে, ইসরায়েলকে কোনো শর্ত ছাড়াই লেবানন ত্যাগ করতে হবে। সংগঠনটির মহাসচিব নাঈম কাসেম ইসরায়েলের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে লেবাননের সেনাবাহিনী যদি এই চুক্তি বাস্তবায়নে বলপ্রয়োগ করে, তাহলে তা গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তার দাবি, হিজবুল্লাহ অস্ত্র আরও দৃঢ়ভাবে ধরে রাখবে এবং কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঠেকাবে।
মাটিতে বাস্তবতা কী?
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম ও শহর ধ্বংস করেছে। রাজধানী বৈরুত এবং বেকা উপত্যকাতেও হামলা চালিয়েছে।
মার্চ মাসের পর থেকে সংঘাতে লেবাননে চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যদিও আগের একটি যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কিছুটা কমেছে, তবু ইসরায়েল এখনও লেবাননের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে রেখেছে।
চুক্তি সইয়ের দিনও দক্ষিণাঞ্চলের মায়ফাদুনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকায়ও হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে মানসৌরি শহরে ইসরায়েলি বাহিনী লিফলেট ফেলে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
ইসরায়েল বলছে, এসব এলাকা তাদের ‘নিরাপত্তা বলয়’ বা বাফার জোনের অংশ, যেখান থেকে হিজবুল্লাহর হামলা ঠেকানো সম্ভব।
এই চুক্তি কি স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে?
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নটি দুই স্তরে বিবেচনা করতে হবে। একদিকে ইসরায়েল ও লেবানন রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৪৮ সাল থেকেই কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ একটি স্বাধীন সশস্ত্র শক্তি হিসেবে এখনও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
চুক্তিতে ইসরায়েল ঘোষণা করেছে যে লেবাননের ভূখণ্ডে তাদের কোনো স্থায়ী ভৌগোলিক দাবি নেই। কিন্তু দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা দীর্ঘমেয়াদে লেবাননে অবস্থান করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
স্মোত্রিচ সম্প্রতি বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত আমরা থাকব। এমনকি তার পরেও থাকতে হতে পারে, কারণ আমাদের নিরাপদ সীমান্ত দরকার।’
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ মনে করে, ইসরায়েলের ওপর ভরসা করা যায় না এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে তাদের অস্ত্র ধরে রাখা জরুরি।
ফলে নতুন এই কাঠামোগত চুক্তি সংঘাত কমানোর একটি সূচনা তৈরি করলেও, স্থায়ী শান্তির পথে এখনও বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাধা রয়ে গেছে।
পালাবদল/এসএ