
সংবাদ সম্মেলনে মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পমেরানিয়ার নির্বাচনে মিনিস্টার-প্রেসিডেন্ট পদের এএফডির প্রার্থী লেইফ-এরিক হোল্ম, বার্লিনে এএফডির প্রধান প্রার্থী ক্রিস্টিন ব্রিঙ্কার এবংএএফডির চেয়ারপার্সন অ্যালিস ভাইডেল ও টিনো ক্রুপালা। ছবি: ডিডব্লিউ
গত রোববার দুটি রাজ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও জার্মানির জোট সরকারের প্রধান দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (সিডিইউ) বড় ব্যবধানে হেরেছে৷ এ পরাজয়ের ফলে আরো চাপে পড়েছেন সিডিইউ নেতা, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস৷ তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চরম-ডানপন্থি দল ‘অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড' (এএফডি)-কে ঠেকিয়ে রাখা৷
ম্যার্ৎসের ওপর চাপ আরো তীব্র করা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়া এবং রাজধানী বার্লিনের আঞ্চলিক নির্বাচনের ফলাফলের পাঁচটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক৷
১. কোণঠাসা, তবে এখনই বিদায় নিচ্ছেন না ম্যার্ৎস
এবং রাজধানী বার্লিনের আঞ্চলিক নির্বাচনের ফলাফল নিঃসন্দেহে ম্যার্ৎস এবং তার দল সিডিইউ-র জন্য খুব বড় ধাক্কা৷ দলের অনেক ভোটার এখন এএফডি (এএফডি)-র দিকে ঝুঁকছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে৷ কারণ, ৭০ বছর বয়সি ম্যার্ৎস জার্মানির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে৷
জার্মানির নির্বাচনের ফলাফলের রেকর্ড যখন থেকে রাখা হয়, তখন থেকে এই পর্যন্ত ইতিহাসের সর্বনিম্ন জনসমর্থন পাওয়া চ্যান্সেলর এখন ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস৷ নির্বাচনের ফলাফলকে ম্যার্ৎস নিজেও ‘বিপর্যয়' হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ চ্যান্সেলরের দায়িত্ব আছেন মাত্র ১৭ মাস ধরে, অথচ এরই মধ্যে জোরালো হচ্ছে তার পদত্যাগের দাবি৷ এর পাশাপাশি বাড়ছে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের চাপ৷ চ্যান্সেলরের পদে যে বহাল থাকবেন-এমন ইঙ্গিত ইতিমধ্যে দিয়েছেন ম্যার্ৎস৷ তবে সংস্কারের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি৷
কিন্তু তার জন্য পরিস্থিতি খুব প্রতিকূল৷ কারণ, রোববার মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় তার দলের ফলাফল ছিল ১৯৪৯ সালের পর যেকোনো রাজ্যের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ৷ এমন ফলাফল সিডিইউ-এর ভেতরে তার অবস্থানকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে৷
জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে ম্যার্ৎসের দুর্বল অবস্থান জোটের ঐক্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে৷ কারণ, এই জোটে একদিকে চরম-ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হয়েছে এবং অর্থনৈতিক চাপও তীব্র হয়েছে৷
২. এএফডি-র সুসংহত অবস্থান
মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়া এবং বার্লিন-দুই রাজ্যেই এএফডি ভালো করেছে৷ মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় ২০২১ সালের তুলনায় তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে৷ এর ফলে রাজ্যের শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে তারা৷
চলতি মাসের শুরুর দিকে সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে জয়ের পর এ নিয়ে ফলে ২০২৯ সালের ফেডারেল নির্বাচনের আগে দলটির অবস্থান যে অনেক শক্তিশালী হয়েছে তা খুবই স্পষ্ট৷
জাতীয় জনমত জরিপে ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ইতিমধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হয়ে ওঠা দলটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি৷ সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানিতে থাকার বৈধ অধিকার নেই এমন বিদেশিদের বহিষ্কারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, সস্তায় রুশ জ্বালানি ব্যবহারের নীতিতে ফেরা এবং প্রথাগত পারিবারিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে রক্ষণশীল মূল্যবোধের প্রসার ঘটানো৷
তবে জনপ্রিয়তা বাড়লেও ফায়ারওয়াল, অর্থাৎ বিচ্ছিন্নকরণ কৌশলের অংশ হিসেবে জার্মানির অন্যান্য প্রধান দলগুলো এএফডির সঙ্গে জোট গড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে৷ ফলে মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়া কিংবা বার্লিন-দুই রাজ্যেই এএফডির সরকার গঠনের সম্ভাবনা ক্ষীণ৷ বার্লিনে সরকার গঠন করা তাদের জন্য অনেক বেশি কঠিন, কারণ, সেখানে তৃতীয় হয়েছে তারা৷
৩. জোট গঠন ক্রমশ কঠিন হচ্ছে
এএফডি-র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং ভোটারদের মধ্যে বিভাজনের কারণে স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা এখন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় পরবর্তী সরকার গঠন করতে তিনটি দলের জোট গড়তে হবে৷
ভোটারদের মধ্যে বিভাজন হওয়ায় সমঝোতার মানসিকতা আরো জরুরি হয়ে পড়েছে এমন এক দেশে, যেখানে দুটি দলের সমন্বয়ে জোট সরকার প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ২০২১ সালে ফেডারেল পর্যায়ে প্রথমবারের মতো তিন দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল ‘ট্রাফিক লাইট' জোট৷ কিন্তু তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তা ভেঙে গিয়েছিল৷
এই মুহূ্র্তে এএফডিকে-কে ক্ষমতার বাইরে রাখতে পারছে ‘ফায়ারওয়াল' কৌশল৷ তবে ভোটারদের মধ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা এ কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে৷
এসব পরিবর্তন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে বিকল্প জোট গঠনের উপায় খুঁজতে বাধ্য করছে৷ মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় সবচেয়ে সম্ভাব্য বিকল্পটি হলো, দ্বিতীয় স্থানে থাকা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) আর বামপন্থি লেফট পার্টির বিদ্যমান জোটে গ্রিন পার্টিকেও নিয়ে নেয়া৷ অন্যদিকে বার্লিনে জয়লাভ করা লেফট পার্টি এসপিডি এবং গ্রিন পার্টির সঙ্গে মিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে এবং তাতে তারা সরকারও গঠন করতে পারে৷
৪. নির্বাচনে অর্থনৈতিক উদ্বেগের প্রভাব
জার্মানির দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করছে৷ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাজনিত হতাশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন ভোটাররা৷ জার্মানির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির৷ এ কারণে কিছু ভোটার মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিকল্প খুঁজেছেন৷
বার্লিনে শহরের আবাসন সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে লেফট পার্টি৷ সাশ্রয়ী মূল্যে নতুন বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি ভাড়া স্থানীয় গড় ভাড়ার চেয়ে ২০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হলে তা কমিয়ে আনা এবং পর্যটকদের জন্য স্বল্পমেয়াদে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আশাবাদী করতে পেরেছে তারা৷
অন্যদিকে এএফডি রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইন আবার চালু করার প্রস্তাব রেখে নিজেদের দিকে ভোট টেনেছে৷ এএফডি মনে করে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে পাইপলাইনটি আবার চালু করলে জ্বালানি খরচ অনেকটা কমে আসবে৷
৫. ভোটাররা মূলধারার রাজনীতি থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন
রাজ্য নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল বলছে জার্মানির সাধারণ ভোটাররা মূলধারার রাজনীতি নিয়ে হতাশ৷ এ কারণেই কট্টর-বামপন্থি দল ডি লিঙ্কেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে৷ জার্মানির সংবাদমাধ্যম এআরডি -এর জন্য একটা জরিপ করেছে ইনফ্রাটেস্ট ডিম্যাপ৷ সেই জরিপ অনুযায়ী, মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় ডি লিঙ্কে, অর্থাৎ বাম দল ম্যার্ৎস-এর নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল দল সিডিইউ -এর ২৮ হাজার এবং মধ্য-বামপন্থি দল এসপিডি থেকে প্রায় ৪৫ হাজার ভোটারের সমর্থন নিজেদের দিকে টেনেছে৷
এসপিডির নেত্রী ও মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ার মুখ্যমন্ত্রী মানুয়েলা স্ভেসিগ মনে করেন, ইউক্রেনকে সহায়তার বিরোধিতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন আবার চালু করাকর পক্ষে অবস্থান নেয়া-এই দুই কারণেই জার্মানির পূর্বাঞ্চলের ভোটাররা এবার এএফডির দিকে ঝুঁকেছেন৷
প্রাথমিক তথ্য বলছে, বার্লিনে বাম দলের কাছে প্রায় ৩৬ হাজার ভোটার হারিয়েছে এসপিডি৷ এছাড়া জার্মানির রাজনীতিতে প্রায়ই কিংমেকার বা সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করা গ্রিন পার্টিও বাম দলের কাছে ৫১ হাজার ভোটার হারিয়েছে৷
পালাবদল/এসএ