রবিবার ২ আগস্ট ২০২৬ ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ২ আগস্ট ২০২৬
 
বিদেশ
ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার পথ খুঁজছেন হতাশাগ্রস্ত ট্রাম্প





পালাবদল ডেস্ক
Sunday, 2 August, 2026
3:00 PM
 @palabadalnet

হতাশাগ্রস্ত ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

হতাশাগ্রস্ত ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

‘হতাশাগ্রস্ত ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার পথ খুঁজছেন’-সিএনএনের এমন শিরোনাম তুলে ধরেছে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমস। ধরে নেওয়া যায়, এমন সংবাদে ইরান সরকার ‘যারপরনাই খুশি’।

শুক্রবার সিএনএনের সংবাদ থেকে জানা যায়-ইরানকে এখন আপাতদৃষ্টিতে খানিকটা শক্তিশালী মনে হলেও, ইরান সত্ত্বর দুর্বল হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের মিত্রদের অনেকের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের পুরো মেয়াদ ‘গিলে’ ফেলতে পারে।

একই দিনে তেহরান টাইমস মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের শিরোনাম দিয়ে প্রকাশিত নিজেদের প্রতিবেদনে ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতির ‘পরস্পরবিরোধী’ ও ‘বিদ্বেষমূলক’ বক্তব্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

ইরানি প্রতিবেদনটিতে ট্রাম্পের ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন’ ও ‘যুদ্ধপ্রীতি’র কথা তুলে ধরা হয়।

পাশাপাশি, মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের ‘আত্মবিশ্বাস’ ও শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে তেহরানের ‘সুদৃঢ়’ অবস্থানকে শক্ত-ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে।

ট্রাম্প ইরানে আরও ধ্বংসাত্মক হামলা চালাবেন বলে যে হুমকি ক্রমাগত দিয়ে আসছেন, তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনটিতে সে কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে, সিএনএনের এমন সংবাদে যে ইরানের শাসকবিরোধীদের ‘মুখ পুড়েছে’, তা বলাই বাহুল্য।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনভিত্তিক ফারসি সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল এক বিশ্লেষণের শিরোনামে প্রশ্ন রাখে,ইরানে ‘কাজ শেষ’ বলতে ট্রাম্প আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? এতে বলা হয়-মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলছেন যে তিনি ইরানে তার অভিযান শেষ করতে চান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর মাধ্যমে বোঝা যায়-ট্রাম্প ইরানের পরমাণু সক্ষমতা, সামরিক দক্ষতা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা ধ্বংস করতে চান। কিন্তু, বাস্তবে ট্রাম্প কি এসবের চেয়েও বেশি কিছু বোঝাতে চাচ্ছেন?

প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার অ্যাডমিরাল রবার্ট হার্ভার্ডের মত-শুধু ইরানের পরমাণু সক্ষমতা নয়, সবদিক থেকে ইরানকে কাবু করতে হবে। যাতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের খনিজসমৃদ্ধ এই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে কোনো রকম প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।

তিনি মনে করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে হবে। তবে, তার বিশ্বাস ‘ফিনিশ দ্য জব’ বলতে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প আরও বেশি কিছু বোঝাতে চাচ্ছেন।
তার মতে, ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই শব্দগুচ্ছের অর্থ খোলাসা করেননি। তিনি বিষয়টিকে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে মনে করছেন-এই শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে ট্রাম্প আরও বহুদূর এগিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের পুনর্গঠনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

অ্যাডমিরাল রবার্ট হার্ভার্ডের ভাষ্য: ‘ফিনিশ দ্য জব’ বলতে ট্রাম্প শুধু ইরানে আরও বোমা ফেলাকে বোঝাচ্ছেন না; তিনি ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করার কথা বলছেন।

ওয়ার অ্যান্ড পিস?

লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ নয়। এটি যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। কেননা, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ইরানে যুদ্ধ ও শান্তি-উভয়ই সমানভাবে চালিয়ে যেতে চান। শনিবার ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে জানা যায়-হোয়াইট হাউস বলেছে যে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প কূটনৈতিক পথ খোলা রেখেছেন। তবে ইরান যদি মার্কিন সেনা, মিত্র অথবা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোয় হামলা চালাতেই থাকে, তাহলে তেহরানকে এর জন্য ‘মূল্য চুকিয়ে যেতেই হবে’। অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধ যে এখনই থামছে না-এমন কথা খোলাসা করে দিয়েছেন খোদ মার্কিন রাষ্ট্রপতি।

ফক্স নিউজ থেকে আরও জানা যায়, শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন যে মার্কিনিদের উচিত ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হামলায় ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরানিরা যখন প্রতিহামলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, তখন তারা নতি স্বীকার করবে।

ট্রাম্পের বক্তব্য: “আমরা জিততে চাই। আমরা ভালো কাজ করছি। ভালো ব্যবহার করছি। তারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।”

“ইরানের নৌবাহিনী নেই; বিমানবাহিনী নেই; তাদের বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা নেই। তবে ইরানিদের যে ক্ষমতা নেই, তা নয়। তাদের যে ক্ষমতা আছে, তা খুবই সামান্য”-এসব কথা ট্রাম্প আবারও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

তবে ফক্স নিউজের প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়-যুদ্ধক্ষেত্রের এখনকার বাস্তবতা ট্রাম্প প্রশাসনের আগের দাবিগুলোকে জটিল করে ফেলেছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়টি ওয়াশিংটন বারবার দাবি করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এতে আরও বলা হয়-গত এপ্রিলেই হোয়াইট হাউস দাবি করেছিল যে ওয়াশিংটনের ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’ নামের ইরান হামলাটির সব লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের দাবি অনুসারে, ইরানের নৌবাহিনীর পাশাপাশি দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় হামলা তো দূরের কথা, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতাও তেহরানের নেই। কিন্তু, বাস্তব পরিস্থিতি কী, তা বুঝতে কিছু বাকি নেই, বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকেই।

এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে-ট্রাম্প ক্রমশ ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন। আর ট্রাম্প বলছেন: ‘ইরানিরা শুধু আমাকে রাগিয়ে দিতেই পারে।’ তাই তিনি যেন গত ৫ মাস ধরে যুদ্ধের পাশাপাশি শান্তির পথেও নিরন্তর হেঁটে চলেছেন!

বাঘের পিঠের সোয়ারি?

গত ২ এপ্রিল চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের শিরোনামে ‘রাইডিং অ্যা টাইগার’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই শিরোনামে এটাও বলা হয়েছিল যে, বিশ্লেষকরা বলছেন ট্রাম্প কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার পথ খুঁজছেন। সুতরাং বলা যেতে পারে-সিএনএন ‘ইরান যুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের সরে আসার পথ খোঁজার’ বিষয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা অন্তত সেই এপ্রিল থেকেই চলে আসছে।

চীনা সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনটিতে গত এপ্রিলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল-বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অথবা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন। সিজিটিএনের প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে দেখাতে পারছেন না।

চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজের গবেষক সু শাওহুই আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছে।” ‘ইরান যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার পথ ওয়াশিংটনের হাতে নেই’ বলেও মনে করেন তিনি।

তার মতে, “বাঘের পিঠে সোয়ারি হলে যেমন অবস্থা হয়, তেমন অবস্থাই হয়েছে। এখন আর বাঘের পিঠ থেকে নামা যাচ্ছে না।” তার এমন মন্তব্য যে মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
 
সু শাওহুই মনে করেন, ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যতই চেষ্টা করছে, ততই যেন আটকে পড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। ইরান দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ কাজে আসছে না বলেও মন্তব্য করেন এই গবেষক। ‘ওয়াশিংটনের হিসাবে গোল বেঁধেছে’ উল্লেখ করে চীনা গবেষক সু শাওহুই আরও বলেন, “ওয়াশিংটন নিজের তৈরি চোরাবালিতে নিজেই আটকা পড়েছে।”

চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর?

ফিরে আসা যাক সিএনএনের সেই প্রতিবেদনটিতে। গত শুক্রবার প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়-ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার রাস্তা খুঁজলেও তার কাছে পরস্পরবিরোধী বার্তা আসছে। এতে আরও জানানো হয়, সবার জন্য হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ এখন পাহাড়প্রমাণ। আবার ইরানের ওপর বাড়তি শক্তি নিয়ে হামলা চালানোর সুযোগও ট্রাম্পের হাতে এসেছে।

শুক্রবার ট্রাম্প এমন ইচ্ছার কথাই প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা ইরানে আরও বড় পরিসরে হামলা চালাতে যাচ্ছি।” তিনি দাবি করেন, “ইরানে ইতোমধ্যে বড় মাপের হামলা চালানো হয়েছে।”

সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়-গত সপ্তাহে ক্যাপিটল হিলে এক শুনানিতে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছিলেন যে, ইরানে শুধুমাত্র বোমা ফেলে লাভ হবে না। ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণ হবে না। ‘বিমানবাহিনীরও সীমাবদ্ধতা আছে’ বলে মন্তব্য করেন এই মার্কিন সেনাপতি।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, সেনাপতির এমন সতর্ক বার্তায় ট্রাম্প দমে যান। এর মধ্যে খবর আসে অস্ত্রভাণ্ডারে টান পড়ার।

কিন্তু, হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, “আমি ইরানে সাধারণ মানুষদের হত্যা করতে চাই না।”

শনিবার ফক্স নিউজ জানায়-সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজের তথ্য বলছে, ইরান যুদ্ধের আগে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ইনভেন্টরির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩০০টি। এখন তা কমে হয়েছে ৮২৭টি। একইভাবে, থার্ড ইন্টারসেপ্টর ইনভেন্টরির সংখ্যা ৪৫২ থেকে কমে হয়েছে ২৭৮টি।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]