বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২৬ ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২৬
 
স্পোর্টস
ফুটবল এক নিষ্ঠুর খেলা: পাঁচ মিনিটেই গুঁড়িয়ে গেল সেনেগালের স্বপ্ন





Thursday, 2 July, 2026
1:26 PM
 @palabadalnet

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। কিন্তু এই খেলার মতো নির্মমতাও খুব কম খেলায় দেখা যায়। যে ফুটবল একদিকে স্বপ্ন দেখায়, লড়াইয়ের পুরস্কার দেয়, ঠিক সেই ফুটবলই কখনো কখনো সামান্য একটি ভুল কিংবা কয়েক মিনিটের দুর্বলতার জন্য সবকিছু কেড়ে নেয়। বুধবার রাতে সিয়াটলে সেই নির্মম বাস্তবতারই সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতা হলো সেনেগালের।

ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে ফেলেছে ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’। গোছানো ফুটবল, দুর্দান্ত গতি আর অবিরাম চাপে পুরো ম্যাচজুড়েই বেলজিয়ামের ওপর আধিপত্য ছিল আফ্রিকার দলটির। হাবিব দিয়ারা ও ইসমাইলা সারের গোলে তারা এগিয়েও ছিল ২-০ ব্যবধানে। বেলজিয়ামকে তখন প্রায় বিদায়ের মুখেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত শেষ হয় না, সেটাই আবারও প্রমাণ হলো।

ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে রোমেলু লুকাকুর গোল বেলজিয়ামকে নতুন করে আশা দেখায়। এরপর মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স সমতায় ফেরান দলকে। মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের গতি। এতক্ষণ আত্মবিশ্বাসী ও সংযত থাকা সেনেগাল হঠাৎ করেই ছন্দ হারিয়ে ফেলে, আর বেলজিয়াম ফিরে পায় বিশ্বাস।

অতিরিক্ত সময়ে অপেক্ষা করছিল আরও বড় নাটক।

দীর্ঘ ভিএআর পর্যালোচনার পর লামিন কামারা টিলেমান্সকে ফাউল করেছেন বলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। সিদ্ধান্তটি ঘিরে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। সেনেগালের খেলোয়াড়রা ঘিরে ধরেন রেফারিকে, জোরালো প্রতিবাদও জানান। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায়নি। স্পটকিক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামকে নাটকীয় ৩-২ ব্যবধানের জয় এনে দেন টিলেমান্স। সেই সঙ্গে শেষ ষোলোর টিকিটও নিশ্চিত করে ফেলে ‘রেড ডেভিলস’।

ম্যাচ শেষে হতাশা লুকাতে পারেননি সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও, “ফুটবল একটি নিষ্ঠুর খেলা।”

তার এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন।

এই বিশ্বকাপে এমনিতেই মানসিক চাপ নিয়েই এসেছিল সেনেগাল। চলতি বছরের শুরুতে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে বিতর্কিত এক পেনাল্টির কারণে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙেছিল তাদের। সেই ঘটনার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। সিয়াটলের ঘটনাও যেন সেই পুরোনো যন্ত্রণা আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনল।

নির্ণায়ক পেনাল্টির পর সেনেগালের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদের কথা উল্লেখ করে থিয়াও বলেন, “আমাদের বিশ্বাস ছিল, এটি কোনো পেনাল্টি ছিল না। খেলোয়াড়রা সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে। সেটা তাদের অধিকার।”

তবে ফুটবল খুব কমই সহানুভূতি দেখায়। সিদ্ধান্ত সঠিক হোক বা ভুল, শেষ পর্যন্ত সেটিই ম্যাচের ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। তবে বিতর্কের বাইরে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। সেনেগাল নিজেদের এমন এক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে ম্যাচটি জিতে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ ধরে রাখতে পারেনি।

থিয়াও ম্যাচ শেষে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, “একটি ফুটবল ম্যাচ ৮৫ মিনিটের নয়।”

হয়তো পুরো ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষাই লুকিয়ে আছে এই কথার মধ্যেই।

শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে শুধু দীর্ঘ সময় আধিপত্য বিস্তার করাই যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো কঠিন মুহূর্তগুলো সামলে নেওয়া এবং সুযোগ এলেই সেটিকে কাজে লাগানো। বলের দখল, ম্যাচের গতি কিংবা আক্রমণের ধার সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল সেনেগাল। বারবার বেলজিয়ামের রক্ষণকে সমস্যায় ফেলেছে তারা। কিন্তু বড় টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত জেতে সেই দল, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভেঙে পড়ে না।

সেই কাজটিই করেছে বেলজিয়াম।

কোচ রুডি গার্সিয়া সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে রোমেলু লুকাকুকে মাঠে নামান এবং আক্রমণভাগের কৌশল বদলে দেন। সেই পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বেলজিয়ামের প্রেসিং আরও তীব্র হয়, আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে, আর যখন বিদায় প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল, তখন অভিজ্ঞ ফুটবলাররাই খুঁজে বের করেন ফিরে আসার পথ।

অতিরিক্ত সময়ের লড়াই নিয়ে দারুণ অর্থবহ ছিল গার্সিয়ার মন্তব্যও, “এটা যেন দুই বক্সারের লড়াই। আমরা শুধু লড়াই করেই গেছি।”

শেষ পর্যন্ত সেই অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতাই জয় এনে দেয় বেলজিয়ামকে।

অন্যদিকে এই হার দীর্ঘদিন তাড়া করবে সেনেগালকে। ডিফেন্ডার ক্রেপিন দিয়াত্তা বলেন, তারা চেয়েছিলেন সেনেগালের ফুটবল ইতিহাসে ‘সুন্দর কিছু অধ্যায়’ লিখতে। কিন্তু তার বদলে তারা বিশ্বকাপ ছাড়ছেন একরাশ আক্ষেপ নিয়ে, যে স্বপ্নটি হাতের নাগালে এসেও ধরা দিল না।

হয়তো এটাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।

এই খেলা সব সময় সেরা দলকে পুরস্কৃত করে না। পরিশ্রম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা ১২০ মিনিটের ভালো পারফরম্যান্সও সব সময় জয় নিশ্চিত করে না। কখনো কখনো জয়ী হয় সেই দল, যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রাখে এবং প্রতিপক্ষের এক মুহূর্তের দ্বিধার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

উৎসব থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট দূরে ছিল সেনেগাল। আর বিদায় থেকে পাঁচ মিনিট দূরে ছিল বেলজিয়াম। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর গল্পটা হয়ে গেল সম্পূর্ণ উল্টো। শেষ ষোলোর টিকিট নিয়ে এগিয়ে গেল ‘রেড ডেভিলস’। আর ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’ মাঠ ছাড়ল একটাই প্রশ্ন নিয়ে, এতক্ষণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ম্যাচটি কীভাবে শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়ে গেল?

ফুটবল মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, এক করে, আনন্দ দেয়। আবার এমন রাতগুলো মনে করিয়ে দেয়, গৌরব আর হতাশার ব্যবধান কখনো কখনো মাত্র কয়েক মিনিটের।

আর সে কারণেই, পাপে থিয়াওয়ের ভাষায়, ফুটবল সত্যিই একটি ‘নিষ্ঠুর খেলা’। সৌন্দর্য, আবেগ আর শৈল্পিকতার জন্য বিশ্বজুড়ে উদযাপিত এই খেলার আরেকটি মুখও আছে, যেখানে ক্ষমা নেই, নিশ্চিত বলে কিছু নেই, আর একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ইতিহাস।
 
পালাবদল/এমএম


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]