বৃহস্পতিবার ১৮ জুন ২০২৬ ৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার ১৮ জুন ২০২৬
 
স্পোর্টস
আল-কায়দার হাতে খুন হন বাবা, অপহরণ করা হয় ভাইকে, বিশ্বকাপে মন জয় হুসেনের





Thursday, 18 June, 2026
2:13 AM
 @palabadalnet

আয়মান হুসেন। ছবি: রয়টার্স

আয়মান হুসেন। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘ দিন পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক। ৪০ বছর পর প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে যদিও নরওয়ের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের দলের কাছে ৪-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হতে হয়েছে তাদের। তবে এই হারের মাঝেও বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে ৩০ বছর বয়সী ইরাকি ফরোয়ার্ড আয়মান হুসেইনের নাম। ম্যাচের ২৯ মিনিটে গোল হজম করার ঠিক দশ মিনিট পর, ৩৯ মিনিটে দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে সমতায় ফেরান তিনি। আর এই গোলের পেছনের গল্পটি কোনো সাধারণ ফুটবলারের গল্প নয়; এটি এক চরম পারিবারিক ট্রাজেডি এবং প্রতিকূলতা জয় করে স্বপ্নের শিখরে পৌঁছানোর ইতিহাস।

নরওয়ের গোলকিপারকে টপকে যখন আয়মান হুসেনের হেড জালে জড়িয়ে গিয়েছিল, তখন সেটা শুধু একটা গোল ছিল না, ছিল তার জীবনের কাহিনির একটা অংশ। যে জীবন গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত, জেদ, দুঃখ-বেদনা এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে।

মঙ্গলবার নরওয়ের কাছে প্রথম ম্যাচে ৪-১ গোলে হেরে গিয়েছে ইরাক। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নজর কেড়েছেন তাদের অধিনায়ক হুসেন। আল-আমারির ক্রসে হেড করে ইরাকের হয়ে সমতা ফেরান তিনি। যদিও পরের দিকে ম্যাচে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি ইরাক।

তবে হুসেনের কাছে বিশ্বকাপে আসাটাই একটা জয়ের সমান। ইরাকের আল সাফারা এলাকায় জন্ম হুসেনের। আশেপাশে সব সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি ছিল। ছোটবেলায় বড় হয়েছেন চারদিকে বন্দুকের গুলির আওয়াজ, বিস্ফোরণ এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে। ফুটবল ছিল তার কাছে পালিয়ে যাওয়ার একটা অস্ত্র। কিন্তু ১২ বছরেই তার জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় আঘাত।

বাবা কাজ করতেন ইরাকের সেনাবাহিনিতে। নিজের বাড়ি তৈরি করার সামগ্রী কিনতে বেরোনোর সময় তিনি আল-কায়দার হাতে খুন হন। সেই বাড়ি আর কখনও তৈরি হয়নি। অতীতে এক সাক্ষাৎকারে হুসেন বলেছিলেন, “ফুটবলে আসার মূল কারণ তারকা হওয়া ছিল না। ছিল অর্থ রোজগারের একটা উপায়, যাতে বাবার তৈরি করা অসমাপ্ত বাড়ি আমি সম্পূর্ণ করতে পারি।”

কষ্ট এখানেই শেষ হয়নি। নিজের পরিবার নিয়ে চিন্তায় ছিলেন হুসেন। তার মা এবং বড় ভাই সেনাবাহিনিতে কাজ করতেন। তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেন হুসেন। কেউই রাজি হননি। এক বার তুরস্ক থেকে জাতীয় দলের একটি অনুশীলন শিবির থেকে ফেরার সময় হুসেনের কাছে সেই বিধ্বস্ত করা খবর আসে। জানতে পারেন, আইসিস নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় তার ভাইকে অপহরণ করা হয়েছে। যার খোঁজ আজও মেলেনি।  ভাইয়ের নিখোঁজে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন হুসেন। ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাই ভেবেছিলেন। বাধা দেন মা।

হুসেনকে স্বপ্নপূরণের জন্য ধাওয়া করার ব্যাপারে রাজি করান তার মা। সেটাই তার জীবন বদলে দেয়। এর পর ইরাকের বড় বড় ক্লাব থেকে প্রস্তাব পেতে শুরু করেন হুসেন। এক সময় লক্ষ লক্ষ টাকা বেতন পাওয়া শুরু করেন এবং কালক্রমে ইরাকের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠেন। ৪০ বছর পর ফিফা বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পেছনেও রয়েছে হুসেনের ভূমিকা।

আমেরিকায় এসেও তার যন্ত্রণা শেষ হয়নি। শিকাগো বিমানবন্দরে তাকে সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফোন পরীক্ষা করা হয়। এর পরে সে দেশে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। কয়েক দিন পরে হুসেন সেটাই করেছেন, যা গোটা জীবন ধরে করে এসেছেন। কঠিন পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে লোকের মুখে হাসি এনে দেওয়া। আমেরিকার মাটিতে নরওয়ের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ ইরাকির আশার প্রতীক হিসেবে নেমেছিলেন হুসেন। ইরাকের সমতা ফেরানোর গোল শুধু তার দলের নয়, আপামর ইরাকির মনেও গেঁথে গিয়েছে।

ইরাকের কাছে তিনি শুধু একজন অধিনায়কই নন। তিনি জেদের আর এক প্রতীক।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]