বুধবার ১৭ জুন ২০২৬ ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার ১৭ জুন ২০২৬
 
স্পোর্টস
জোড়া গোলে পেলেকে ছাপিয়ে গেলেন এমবাপে





স্পোর্টস ডেস্ক
Wednesday, 17 June, 2026
10:30 AM
 @palabadalnet

গোলের পর উল্লাস কিলিয়ান এমবাপের। ছবি: রয়টার্স

গোলের পর উল্লাস কিলিয়ান এমবাপের। ছবি: রয়টার্স

হাত কামড়াচ্ছেন জিনেদিন জিদান। ভাবছেন, ২৪ বছর আগে তার দলের কোচের নাম যদি দিদিয়ের দেশঁ হতো, তা হলে হয়তো সেনেগালের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ যেতে হতো না তার আগের বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ২৪ বছর পরেও তো মনে হচ্ছিল, একই ছবি দেখা যাবে। আরও এক বার আফ্রিকার দলের কাছে হারবে ফ্রান্স। কিন্তু দলের মাথায় যদি বিশ্বকাপ জেতা অধিনায়ক ও কোচ থাকেন, তা হলে যা হওয়ার তাই হল। বিরতিতে দেশঁর একটি চালে সেনেগালকে ৩-১ গোলে হারাল ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপে জোড়া গোল করলেন। একই ম্যাচে ছাপিয়ে গেলেন পেলে, লিয়োনেল মেসি ও ফরাসি কিংবন্তি জঁ ফঁতেকে। ফ্রান্সের হয়ে অপর গোল ব্র্যাডলি বার্কোলার। সেনেগালের হয়ে শেষ দিকে ইব্রাহিম এমবায়ে একটি গোল শোধ করলেও তা কাজে লাগল না। সুযোগ নষ্টের খেসারত দিল তারা।

বিশ্বকাপে দ্বিতীয় বার মুখোমুখি হচ্ছিল ফ্রান্স ও সেনেগাল। আগের বারের স্মৃতি ফ্রান্সের জন্য সুখকর ছিল না। পাপা বৌবা দিওফের নাম জ়িদান অন্তত কোনও দিন ভুলবেন না। সেই দলেরই সদস্য পাপে থিয়াও এখন সেনেগালের কোচ। তিনি জানতে ফ্রান্সের সব আক্রমণের লক্ষ্য থাকবেন এমবাপে। তাই নিজের রক্ষণ সে ভাবেই সাজিয়েছিলেন তিনি। এমবাপের সঙ্গে জোঁকের মতো লেগেছিলেন কৌলিবালি। ব্যস, প্রথমার্ধে সেখানেই ঢাকা পড়ে গেলেন এমবাপে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয় বার সাক্ষাৎ হলেও ফ্রান্স ও সেনেগালের লড়াইয়ের ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরনো। ৩০০ বছর সেনেগাল শাসন করেছে ফ্রান্স। তাই এই ম্যাচে আফ্রিকার দলের কাছে স্বাধীনতার যুদ্ধের থেকে কম ছিল না। প্রথমার্ধে সাদিয়ো মানে, ইসমাইলা সার, নিকোলাস জ্যাকসনদের খেলা দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছিল। ফ্রান্সকে তাদের অস্ত্রেই থামানোর পরিকল্পনা করেছিলেন থিয়াও। তাতে সফলও হয়েছিলেন তিনি। ফ্রান্স সাধারণত প্রতি-আক্রমণের ফুটবল খেলে। বিপক্ষকে নিজেদের বক্সে ডেকে এনে এমবাপে, উসমান দেম্বেলেদের একটা লম্বা দৌড়। ব্যস, বাজিমাত। কিন্তু সেনেগালও প্রতি-আক্রমণের ফুটবল খেলছিল। ফলে ফ্রান্সের পরিকল্পনা কাজে আসেনি।

প্রথমার্ধে খুব বেশি হলে চার থেকে পাঁচ বার বল পেয়েছেন এমবাপে। তা-ও রাখতে পারেননি। প্রথম টাচ দেখে মনে হচ্ছিল, এমবাপের মুখোশ পরে হয়তো অন্য কেউ খেলছেন। যেটুকু খেললেন, মাইকেল ওলিসে। এ বার বালঁ দ্যরের দাবিদার তিনি। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে গোলের বন্যা বইয়েছেন। কিন্তু তিনি একাই খেললে কী হবে, বাকিদেরও তো সঙ্গ দিতে হবে।

সেনেগালের বিশ্বকাপের দলের ১০ জনের জন্ম ফ্রান্সে। বেশির ভাগ খেলোয়াড় অবলীলায় ফরাসি ভাষা বলতে পারেন। সেনেগাল জানত, নিজেদের মধ্যে কথা বলতে গেলে ফরাসিতে বললে চলবে না। তাই সেনেগালের আদিবাসীদের ভাষা ওলফ-এ কথা বলা শুরু করল তারা। কর্নারের সময়, বা নিজেদের মধ্যে পাস দেওয়ার সময অদ্ভুত একটা ভাষা বার হচ্ছিল মানেদের মুখ থেকে। ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের মধ্যে দেম্বেলের মতো কয়েক জন সেই ভাষা জানলেও বাকিরা জানেন না। তাই ধরতে পারছিলেন না। প্রথমার্ধে দু’বার গোলের সুযোগ পেয়েছিল সেনেগাল। এক বার জ্যাকসনের বাঁ পায়ের শট পোস্টে লেগে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানের পায়ে লেগে বেরিয়ে যায়। পায়ে লেগে গোলও হতে পারত। দ্বিতীয় বার ডান পায়ের টোকা মারলেই গোল করতে পারতেন জ্যাকসন। কিন্তু বার উঁচিয়ে বল চলে যায়। ধারাভাষ্যকারের মজা করে বলছিলেন, দেখে মনে হচ্ছে খেলতে নামার আগে পুজো দিয়েছেন মাইগনান।

বিরতিতে একটিই বদল করেন দেশঁ। প্রথমার্ধে দলের নম্বর ১০ পজিশনে খেলছিলেন এমবাপে। ফলে তাকে বল দিতে হলে সেন্টার অফ দ্য পার্ক দিয়ে খেলতে হচ্ছিল। সেই কারণে এমবাপে বল পেলেই কৌলিবালি তাকে আটকে দিচ্ছিলেন। দ্রুত তিন থেকে চার জন ঘিরে ধরছিলেন ফরাসি ফুটবলারদের। ফাঁকা জায়গা পাচ্ছিলেন না তারা। দেশঁ এমবাপেকে প্রান্তে আনলেন। কখনও ডান, কখনও বাঁ প্রান্ত থেকে উঠলেন তিনি। নম্বর ১০ পজিশনে নিয়ে গেলেন ওলিসেকে। প্রথমার্ধে এমবাপেকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন সেনেগালের সেন্টার ব্যাক কৌলিবালি। কিন্তু এমবাপে প্রান্তে চলে যাওয়ায় কৌলিবালির নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। ওলিসের গতি কৌলিবালিকে সমস্যায় ফেলল। এই এক চালেই খেলার ছবি বদলে গেল।

দ্বিতীয়ার্ধে অনেকটা ফাঁকা জায়গায় বল পেতে শুরু করলেন এমবাপে। দেখা গেল তার পরিচিত দৌড়। সেই দৌড়ের সাহায্যে পেনাল্টিও প্রায় আদায় করে ফেলেছিলেন তিনি। সাদিয়ো মানে বক্সের মধ্যে ট্যাকল্‌ করেন। এমবাপে পড়ে যান। রেফারি আলিরেজা ফাঘানি প্রথমে কর্নার দেন। ফ্রান্সের ফুটবলারেরা পেনাল্টির আবেদন করছিলেন। ভার-ও রেফারিকে পরামর্শ দেন রিপ্লে দেখার। গ্যালারিতে তখন চিৎকারে কান পাতা দায়। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের মধ্যে ৭৫ হাজারই ছিলেন ফরাসি সমর্থক। আমেরিকার অভিবাসন নীতির কারণে সেনেগালের খুব কম দর্শকই যেতে পেরেছেন। সকলে ভাবছিলেন, পেনাল্টি হবে। সকলকে অবাক করে রেফারি ফাঘানি জানালেন, এমবাপেই ইচ্ছা করে মানের পায়ে পা লাগিয়েছেন। তাই কর্নার নয়, তার বদলে গোল কিক দেওয়া হল।

রেফারি ফাঘানি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হলেও জন্মসূত্রে তিনি ইরানের। সে দেশের ফুটবল দলকে আমেরিকা ছাড়তে হলেও দিব্যি গোটা ম্যাচ পরিচালনা করলেন তিনি। কথায় কথায় ফাউল দিলেন না। ইরানের বাকিদের মতো তিনিও বেশ ‘টাফ’। টেনে খেলালেন। ফুটবল যে ‘বডি কনট্যাক্ট গেম’ তা বুঝিয়ে দিলেন। একটা সময় তো মনে হচ্ছিল, আদৌ কোনও ফাউল কি তিনি দেবেন? তবে এমবাপের পেনাল্টির আবেদন নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। খালি চোখে দেখে মনে হয়েছিল, মানে বলে পা লাগাতে পারেননি। আর ওই পরিস্থিতিতে যে কোনও স্ট্রাইকার ডিফেন্ডারের পা জড়িয়ে পড়বেন। ফুটবলে এ রকম পেনাল্টি হামেশাই দেখা যায়। কিন্তু ফাঘানি দিলেন না।

পেনাল্টি না পেয়ে সম্ভবত ফ্রান্সের ফুটবলারেরা কিছুটা চাগিয়ে উঠেছিল। ১০ মিনিটের একটা ঝড় উঠল। সেখানেই ভেঙে গেল সেনেগালের রক্ষণ। তার আগে দু’বার এডুয়ার্ড মেন্ডিকে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি এমবাপে ও ওলিসে। চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা সেনেগালের গোলরক্ষক প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু ৬৬ মিনিটের মাথায় ওলিসের পাস ধরে মেন্ডির পায়ের পাশ দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন এমবাপে। এগিয়ে যায় ফ্রান্স।

গোল খেয়ে আক্রমণ করা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না সেনেগালের। তখনই আরও একটি চাল চাললেন দেশঁ। দেম্বেলেকে তুলে নামালেন বার্কোলাকে। তিনি জানতেন, সেনেগাল আক্রমণে উঠলে রক্ষণে অনেক ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাবে। সেখানে বার্কোলার গতি কাজে লাগবে। হলও তাই। ৮২ মিনিটের মাথায় ডিফেন্ডারদের গতিতে পরাস্ত করে গোল করলেন বার্কোলা।

তার পরেও আক্রমণ ছাড়েনি সেনেগাল। অবশ্য তখন রক্ষণ করেও কোনও লাভ হত না। সংযুক্তি সময়ে একক দক্ষতায় একটি গোল করেন এমবায়ে। এমবাপে যে শহরে জন্মেছেন সেই বন্ডিতেই জন্ম এমবায়েরও। তার গোলের পর মনে হয়েছিল, শেষ চার মিনিট চেষ্টা করবে সেনেগাল। কিন্তু তার পরেই আবার এমবাপের জাদু। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে ডান পায়ের জোরালো শটে গোল করে সেনেগালের সব আশা শেষ করে দিলেন তিনি। মেন্ডি বলের নাগাল পেয়েছিলেন। কিন্তু তার হাত ঠিক জায়গায় ছিল না। এমবাপে অবশ্য বরাবরই দ্বিতীয়ার্ধের ফুটবলার। বিশ্বকাপে করা তার ১৪ গোলের মধ্যে ১৩টিই দ্বিতীয়ার্ধে করা।

প্রথম ম্যাচে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের সর্বাধিক গোলের লড়াই জমিয়ে দিলেন এমবাপে। একই ম্যাচে পেলে, মেসি ও ফঁতেকে টপকে যান এমবাপে। যদিও কয়েক ঘণ্টা পরেই মেসি আবার টপকে যান এমবাপেকে। এমবাপে এখন গার্ড মুলারের সঙ্গে ১৪ গোলের মালিক। সামনে ব্রাজ়িলের রোনাল্ডো, মেসি ও জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজ়ে। তবে জোড়া গোল কেন, একটি গোলও হয়তো এমবাপে করতে পারতেন না। যদি না মোক্ষম চাল দিতেন দেশঁ। যে চালে ২৪ বছর আগের দুঃস্বপ্ন ভুলে জয় দিয়ে শুরু করল ফ্রান্স। সত্যিই, হাত কামড়াচ্ছেন জ়িদান। ভাবছেন, যদি তার দলে সে দিন দেশঁ থাকতেন।

পালাবদল/এমএম 


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]