
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব’ হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, দলটি কখনো স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি। ভবিষ্যতে কেউ আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করতে চাইলে তাদের পরিণতিও ভিন্ন হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পরিবর্তন চায়। গণভোটে জনগণ সংবিধানে কেবল সংশোধন বা ঘষামাজার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মাল্টিপারপাস হলে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘২৮ অক্টোবর পল্টন ট্র্যাজেডি দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটা ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব।”
আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থেকে বিদায়ের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, “আওয়ামী লীগ তার জীবনে কখনো স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি। সব সময় লাঞ্ছিত হয়ে, অপমানিত হয়ে, বিকৃত হয়ে বিদায় নিয়েছে।”
ভবিষ্যতে কেউ একই পথ অনুসরণ করলে তাদের পরিণতিও একইরকম হবে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, “সেই রাস্তা এখনো যদি কেউ অবলম্বন করতে চান, তাদের পরিণতি নিশ্চয়ই ভিন্ন হবে না। একই পরিণতি হবে।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, মানুষ ফ্যাসিবাদের পরিবর্তন চায় বলেই পরিবর্তনের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছে। তবে সেই রায়কে শুধু সংবিধানে সংশোধন বা ঘষামাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “গণভোটের রায় দিয়েছে রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য। যে রাজনীতি হবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে, যে রাজনীতি আর কাউকে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো ধরনের সুযোগ দেবে না, সেই পরিবর্তনটাই মানুষ চেয়েছে।”
সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদের যন্ত্রণা ভোগ করার পরও যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তারা সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেছেন। তিনি বলেন, “বন্ধুরা, ভুলে গেলে লাভ হবে না।”
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা এখনো অনুরোধ করব, ফিরে আসুন, ফিরে আসুন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করুন।”
সরকার এই প্রত্যাশা পূরণ না করলে জামায়াত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, “অতীতেও আমরা কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি, এখনো করব না। লড়ে যাব জনগণের জন্য, ন্যায়-ইনসাফের জন্য, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য এবং সকল হত্যাকাণ্ডের খুনিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য।”
২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লগি-বৈঠা নিয়ে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ওই ঘটনায় জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তার অভিযোগ, ওই দিনের হত্যাকাণ্ডের পর মামলা হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলার নথিপত্র গায়েব করে এবং মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিচার চাই না। অন্যায়ভাবে কাউকে ফাঁসি দেওয়া তো দূরের কথা, তার একটা লোম ধরে টান দেওয়া হোক—তাও আমরা চাই না। আমরা নিশ্চিত, ন্যায়বিচার হলে প্রত্যেক অপরাধীর ফাঁসি হবে।”
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এবং বিশেষ করে জুলাইয়ে যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ রাখতে হবে। তাদের রক্তের ঋণ পরিশোধে কোনো আপস করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনীতির নামে সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটিয়ে মানবিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করবেন, তাদের জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
আলোচনা সভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি গণ–আকাঙ্ক্ষার অংশীজন হিসেবে নির্বাচনের আগে যে কথা দিয়েছিল, সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও আবদুল হালিম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন।
আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম), ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় নিহত গোলাম কিবরিয়ার বাবা তাজুল ইসলাম, সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামছুন নাহার, মুজাহিদুল ইসলামের মামা মিজান আহমেদ, হাবিবুর রহমানের ছেলে রুবেল মৃধা প্রমুখ।
পালাবদল/এসএ