
পাকিস্তান সফরকালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ছবি: আইএসপিআর
পাকিস্তানে তিন দিনের সফরে গিয়ে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং প্রভাবশালী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এমনকি ইসলামি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণের সময় মুইজ্জুকে বিশেষ পোশাক পরতেও দেখা যায়।
২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত এই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালদ্বীপ ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পুলিশি সহযোগিতা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে ২০টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। মুইজ্জু দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক-পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন। সার্কের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধানের সঙ্গে মুইজ্জুর বৈঠক এই কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন কৌশলগত মাত্রা যোগ করেছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রটি কি ইসলামাবাদের আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে? আর এর ফলে নয়াদিল্লির ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যিক পথের পাশে অবস্থিত মালদ্বীপের আশপাশের আন্তর্জাতিক জলসীমা ঐতিহ্যগতভাবে নয়াদিল্লির নিকটবর্তী কৌশলগত প্রতিবেশ এবং প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
মালদ্বীপে ভারতীয় সামরিক সদস্যরা অবস্থান করতেন। তারা মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসার জন্য রোগী সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত বিমান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে মুইজ্জুর সরকার তাদের পরিবর্তে বেসামরিক কারিগরি কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করে।
পাকিস্তানের সঙ্গে মুইজ্জুর এই যোগাযোগ এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ভারতের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে। ২০২৩ সালে ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণার ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন মুইজ্জু। তবে এরপর থেকে তিনি দুই দেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
বুধবার (২২ অক্টোবর) যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মুইজ্জু বলেন, “মালদ্বীপ সার্কের গুরুত্ব এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।”
তিনি আরও ঘোষণা করেন, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ ‘ছয় দশকের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন অংশীদারত্বের যুগ গড়ে তুলতে এবং সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে’ সম্মত হয়েছে।
অন্যদিকে, মুইজ্জুর সফরকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে নিজেদের বিরোধের বিষয়গুলোও সামনে এনেছে। পাকিস্তানের প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টের ২১ অক্টোবরের এক বিবৃতি অনুযায়ী, শাহবাজ শরিফ জম্মু ও কাশ্মির এবং সিন্ধু নদের পানিবণ্টন চুক্তি (আইডব্লিউটি) সম্পর্কে ইসলামাবাদের অবস্থান মুইজ্জুকে জানিয়েছেন। তবে মুইজ্জু প্রকাশ্যে পাকিস্তানের কোনো অবস্থানকে সমর্থন করেননি।
মালদ্বীপের কোনো প্রেসিডেন্টের ১১ বছর পর এটিই ছিল প্রথম পাকিস্তান সফর। একই সঙ্গে ১৯৬৬ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠিত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তির সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো।
২০ অক্টোবর স্ত্রী সাজিদা মোহাম্মদ এবং উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলামাবাদে পৌঁছান মুইজ্জু। ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে স্বাগত জানান। সেখানে তিনি গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন। এরপর দুই দেশের নেতাদের মধ্যে সীমিত পরিসরে এবং প্রতিনিধিদল পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
দুই নেতা প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বেসামরিক বিমান চলাচল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও কারিগরি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে ২০টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি বিনিময় প্রত্যক্ষ করেন।
দুই দেশ আগামী দুই বছরের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি ডলারে উন্নীত করতেও সম্মত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সীমিত বাণিজ্যের বাস্তবতা বিবেচনায় এই লক্ষ্য বেশ উচ্চাভিলাষী।
মুইজ্জু এসব চুক্তিকে সহযোগিতার একটি ‘নতুন যুগ’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, আলোচনায় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে।
মুইজ্জুর সঙ্গে মুনিরের বৈঠক, সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব
২১ অক্টোবর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইসলামাবাদে মুইজ্জুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং সামরিক পেশাজীবীদের মধ্যে মতবিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়।
মুইজ্জু পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারত্বের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য পাকিস্তানের ঘোষিত প্রচেষ্টারও প্রশংসা করেন।
এর আগে একই দিন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মুইজ্জুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও পর্যটনের বিষয়গুলো উঠে আসে।
সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে মুইজ্জুর প্রস্তাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের উরিতে সন্ত্রাসী হামলা এবং নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির পর সম্মেলনটি বাতিল হয়ে যায়। ওই হামলাটি পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল।
উরি হামলার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছিল, “ভারত আঞ্চলিক সহযোগিতা, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি অবিচলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ভারত মনে করে, সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশেই কেবল এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত সরকার ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত সম্মেলনে অংশ নিতে পারছে না।”
২১ অক্টোবর মুইজ্জু বলেন, মালদ্বীপ “সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে গঠনমূলক ও সক্রিয় ভূমিকা পালনে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”। তিনি আরও বলেন, যত দ্রুত সম্ভব সার্কের পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে মালদ্বীপ প্রস্তুত।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানানো প্রথম দক্ষিণ এশীয় নেতা নন মুইজ্জু। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসও পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে এক বৈঠকে সার্ক পুনরুজ্জীবনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। সে সময় দার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।
আট সদস্যের এই আঞ্চলিক জোট ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দপ্তর কাঠমান্ডুতে। সদস্যদেশগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান।
সার্কের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং সম্মিলিত স্বনির্ভরতা বাড়ানো।
আলোচনায় কাশ্মির ও সিন্ধু নদের পানি: পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি
পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে নিজেদের বিরোধের বিষয়গুলোও আলোচনায় নিয়ে আসে। শাহবাজ শরিফের কার্যালয় নিশ্চিত করেছে, মুইজ্জুর সঙ্গে বৈঠকে তিনি জম্মু ও কাশ্মির এবং সিন্ধু নদের পানিবণ্টন চুক্তি সম্পর্কে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার এক দিন পর ভারত সিন্ধু নদের পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখে। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
বুধবারের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে শরিফ সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের পানির সরবরাহে হস্তক্ষেপকে যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাশ্মির কিংবা পানিবণ্টন চুক্তি-কোনো বিষয়েই মুইজ্জু প্রকাশ্যে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে বক্তব্য দেননি।
বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যস্ততার মধ্যেই বুধবার মুইজ্জু ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তার হাতে ডিগ্রি তুলে দেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক আহমেদ সাদ আল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, মুইজ্জু এই সম্মান তার দেশের জনগণকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি একে দুই দেশের বন্ধুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
মালদ্বীপ কি পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে যাচ্ছে?
মুইজ্জুর এই সফর ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য ইঙ্গিত বহন করে।
চীনও মালদ্বীপে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় দেশটি মালদ্বীপে বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপরাষ্ট্রে চীন সেতু, আবাসন প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থায়ন করেছে। ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে এসব প্রকল্প নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে অন্তত আপাতত, পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো মালদ্বীপে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করছে না। চুক্তিগুলোর বাস্তব কার্যকারিতা ও কৌশলগত প্রভাবও এখনো স্পষ্ট নয়।
মুইজ্জুর সরকার এখনো তার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘মালদ্বীপ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে মালদ্বীপ’ হিসেবে বর্ণনা করে। একই সঙ্গে সরকার একক কোনো দেশের সঙ্গে একচেটিয়া সম্পর্কের পরিবর্তে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেয়।
ভারতের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হতে পারে, নয়াদিল্লির কৌশলগত সামুদ্রিক প্রতিবেশে ইসলামাবাদ নতুন একটি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সহযোগিতায় রূপ নেয় কি না, তার ওপরই মুইজ্জুর পাকিস্তান সফরের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব নির্ভর করবে।
পালাবদল/এসএ