বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 
জাতীয়
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাব





বাসস
Thursday, 24 September, 2026
2:09 AM
 @palabadalnet

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনসহ এই সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন।

একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, সহিংসতা বন্ধ, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জাানান তিনি।

বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনের এ অনুষ্ঠানে সহ-আয়োজক ও অন্যান্য অংশীদারদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা চরম বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় বড় ঢল এসেছে। ১৯৮০-এর দশকেও দেশটি রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। তৎকালীন বিভিন্ন সরকারের আমলে কিছু রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির আরও মারাত্মক অবনতি ঘটে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। উপরন্তু, মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন আরেকটি প্রজন্ম। রোহিঙ্গা মায়েরা তাদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা নিজেদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামের স্মৃতি বুকে নিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন।

মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাম্পগুলোতে তাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্পগুলোতে বসবাসের পরিবেশ উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের উপযোগী কোনো আদর্শ স্থান নয়।

দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ ক্রমেই বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের মাশুল শুধু রোহিঙ্গাদেরই দিতে হচ্ছে না, কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ওপরও এর তীব্র প্রভাব পড়ছে।

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তঃদেশীয় অপরাধ রয়েছে। এমনকি অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন।

একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্যই নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন যত বাড়ছে, মানবিক সহায়তার জীবনরেখা ততই সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে; যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না’ উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের পাশে অব্যাহতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান এবং বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য কেবল বাংলাদেশই রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করে যাবে- এমনটাও প্রত্যাশা করা যায় না।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম এবং নিরাপত্তাহীনতাসহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং ‘আরাকান আর্মি’- উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন শুধুই সহমর্মিতা না দেখিয়ে সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]