বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 
বিদেশ
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে কয়টা মিথ্যা কথা বললেন ট্রাম্প





সিএনএন
Wednesday, 23 September, 2026
3:10 PM
 @palabadalnet

গতকাল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

গতকাল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বসেছে। প্রথম দিন গতকাল মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩৭ মিনিটের ভাষণে ইরান যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড, জলবায়ু পরিবর্তন, ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশ্বশান্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতিসংঘে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষণটি গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম বিস্ফোরক ছিল। তবে এবারও তিনি নানা বিষয়ে ‘মিথ্যা’ বলেছেন। আসুন, সেসব বিষয়ে জেনে নিই-

যুদ্ধ বন্ধের দাবি

ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি করে আসছেন। দাবিটি পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণে তিনি বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আটটি যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছি। এটা আমার জন্য বড় সম্মানের।”

এ আটটি যুদ্ধ ও সংঘাত হলো কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড, কসোভো ও সার্বিয়া, রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, ভারত ও পাকিস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান, ফিলিস্তিনের গাজা, ইসরায়েল ও ইরান এবং মিসর ও ইথিওপিয়া।

তবে ট্রাম্পের বলা এ ‘আটটি যুদ্ধের’ সংখ্যা স্পষ্টতই অতিরঞ্জিত। কেননা, ট্রাম্পের তালিকায় এমন দুটি ঘটনা আছে, যেগুলো তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আদৌ ‘যুদ্ধ’ ছিল না। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বিরোধটি ছিল একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ।

সার্বিয়া ও কসোভোর পরিস্থিতিও যুদ্ধ ছিল না। সেখানে কী ধরনের যুদ্ধ ট্রাম্প বন্ধ করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সেখানে একটি শান্তি চুক্তি হয়েছে। সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

গাজার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দাবি নিয়ে প্রশ্ন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সেখানে যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েল এখনো উপত্যকাটিতে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে।

গত বছর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের সঙ্গে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এক সময় মানুষকে আক্রমণ করতে পারে বা হত্যা করতে পারে-এ সতর্কবার্তা নিয়ে ভাষণে ঠাট্টা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, এসব সতর্কতা দিচ্ছেন ‘সেই একই লোকেরা’, যারা বলেছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে।

ট্রাম্প দাবি করেন, পরে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শব্দটি বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা জলবায়ু পরিবর্তন করা হয়েছে। কারণ, পৃথিবী নাকি উষ্ণ হওয়ার বদলে ঠান্ডা হচ্ছিল। আর এ কারণে কেউ মারাও যায়নি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে অন্তত চারটি ‘ভুল’ আছে। প্রথমত, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ শব্দটি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটিও প্রচলিত। দুটি শব্দের অর্থ এক নয়। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা দুটি শব্দই ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বোঝাতে তারা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলেন। আর এর ফলে পৃথিবীতে যে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, সেগুলো বোঝাতে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প কোন সময়ের কথা বলেছেন, সেটা স্পষ্ট নয়। তবে পৃথিবী ঠান্ডা হচ্ছে, এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই; বরং পৃথিবী আরও উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) গত জানুয়ারিতে জানায়, রেকর্ড রাখা শুরুর পর সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর হলো সর্বশেষ ১১ বছর। এর মধ্যে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি বছর।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘কেউ মারা যায়নি’-এমন দাবির সঙ্গেও বিশেষজ্ঞরা একমত নন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঠিক কত মানুষ মারা গেছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন হিসাবে এ সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।

চতুর্থত, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে আমরা সবাই মারা যাব’-জলবায়ু বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিবেদনে এমন কথা বলা হয়নি। ২০১৮ সালে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পৃথিবীর উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। এ সীমা অতিক্রম করলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন।

বিনিয়োগ নিয়ে বিভ্রান্তি

ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, “পুরো বিশ্ব থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আমরা নিশ্চিত করেছি।” এ দাবির স্পষ্ট কোনো ভিত্তি নেই। এর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব দিতে পারেনি হোয়াইট হাউস।

ট্রাম্পের ভাষণের সময় হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে বলা হয়, তার দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের। ট্রাম্পের বলা ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির তুলনায় এ অঙ্ক বেশ কম।

২০২৫ সালে সিএনএনের এক বিশদ পর্যালোচনায় হোয়াইট হাউসের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, তালিকায় কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের অস্পষ্ট বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ধরা হয়েছে।

মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি

ইরানের সঙ্গে টানা যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে টান পড়েছে, এমন দাবির কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কোনো ঘাটতি নেই।

ট্রাম্প বলেন, “কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতকেরা বলতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কমে গেছে, তা সত্য নয়। আমাদের কাছে এত বেশি অস্ত্র আছে, তা কখনো ব্যবহার করার কথাও ভাবতে পারি না। আমরা এমন মাত্রায় অস্ত্র তৈরি করছি, যা আগে কখনো করিনি।”

মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ঠিক কত অস্ত্র আছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, হয়ও না। তাই ট্রাম্পের দাবি পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব নয়। ‘কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক’ বলতে ট্রাম্প কাদের বোঝাচ্ছেন, সেটিও স্পষ্ট নয়।

তবে শুধু সিএনএনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) ওপর নজরদারি করা সরকারি পরিদর্শক সংস্থা এবং নির্দলীয় কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস বলেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্রের মজুত কমে গেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পৃথক দুটি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে পেন্টাগন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। তবে অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের ‘উল্লেখযোগ্য সময়’ লাগবে।

পেন্টাগন বরাবর বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কোনো ঘাটতি নেই। গত সপ্তাহেও একই দাবি করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অপরাধ কমার হার নিয়েও বাড়িয়ে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, গত বছরের ২০ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাজধানী ওয়াশিংটন অপরাধে জর্জরিত ছিল। এখন সেখানে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে। তাঁরা শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

ট্রাম্পের বলা ‘৮৭ শতাংশ’ অপরাধ কমার হার সঠিক নয়।

ওয়াশিংটনের পুলিশ গত সোমবার পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। ট্রাম্প যে ৮০ শতাংশের বেশি কমার দাবি বারবার করছেন, তার সঙ্গে এ হিসাবের মিল নেই।

ওয়াশিংটন পোস্টে গত আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে অপরাধ ‘৮১, ৮৮ বা ৯২ শতাংশ’ কমেছে, ট্রাম্পের এমন দাবির পক্ষে কোনো তথ্য দিতে পারেনি হোয়াইট হাউস।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]