মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 
বিদেশ
ইস্তান্বুলে মক্কা জোটের প্রথম বৈঠক থেকে যা জানা গেল





পালাবদল ডেস্ক
Tuesday, 1 September, 2026
4:59 PM
 @palabadalnet

জোটের প্রথম বৈঠক শেষে তিন দেশের প্রতিনিধিরা ছবির জন্য পোজ দেন। ছবি: রয়টার্স

জোটের প্রথম বৈঠক শেষে তিন দেশের প্রতিনিধিরা ছবির জন্য পোজ দেন। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে নতুন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত ৭ আগস্ট ৩ মুসলিমপ্রধান দেশের এই চুক্তি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা জন্ম দেয়।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় গতকাল সোমবার তুরস্কের প্রধান বাণিজ্যিক শহর ইস্তান্বুলে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জোটের আনুষ্ঠানিক নাম জানা যায়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে জোটটির সচিবালয় স্থাপনে সম্মত হয়েছে সদস্যদেশগুলো। প্রথম মহাসচিব পাকিস্তান থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। এক যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশ এ তথ্য জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, দেশগুলো তাদের যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও নিজ নিজ সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে কাজ করবে। গত ৭ আগস্ট সই হওয়া “মক্কা চুক্তি’র লক্ষ্য হলো যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চুক্তির উদ্দেশ্য কী

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, “এই জোট এই অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্যে) আরও বেশি স্থিতিশীলতা আনবে এবং অনিশ্চয়তা কমাতে ভূমিকা রাখবে।”

“এই চুক্তির মাধ্যমে আমাদের অঞ্চলে নতুন একটি নিরাপত্তা ও সহযোগিতা কাঠামো পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে,” যোগ করেন তিনি।

নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর এখন জরুরি ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার হামলা-পাল্টা হামলা শুরুর প্রেক্ষাপটে মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, পরবর্তী সময়ে আর কারা এই জোটে যোগ দিতে পারে।

পরমাণু ক্ষমতাসম্পন্ন পাকিস্তান, খনিজসমৃদ্ধ সৌদি আরব ও সামরিক শক্তিধর তুরস্ক তাদের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম দিয়েছে “মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট’। তিন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর ইস্তান্বুলে এ নাম ঘোষণা করা হয়।

গতকাল বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, “রিয়াদে সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং এর প্রথম মহাসচিব পাকিস্তান থেকে নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “জোটটি  আন্তর্জাতিক নীতির ভিত্তিতে গঠিত। যেমন, অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।”

তার মতে, এই জোটে ‘যেকোনো দেশের যোগ দেওয়ার সুযোগ’ আছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর এক মাসের বিরতি ভেঙে ওয়াশিংটন ও তেহরান হামলা-পাল্টা হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রথম বৈঠকে মিসর যোগ দিতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য নয়, বরং ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা চার দেশের একটি দলের অংশ হিসেবে মিশর যোগ দেয়।

বৈঠকে যা আলোচনা হলো

গতকাল সোমবারের বৈঠকে মিসর বা অন্য কোনো দেশ নয়, বরং চুক্তিতে সই করা তিন দেশের ওপরই ছিল পাদপ্রদীপের আলো। গত ৭ আগস্ট পবিত্র নগরী মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সই করা প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি এখন জোটের ঘোষণা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। ঘোষণাটিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তবে এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কীভাবে কাজ করবে এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ধারা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তুরস্কের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন ফিদান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের ও চিফ অব জেনারেল স্টাফ সেলজুক বায়রাকতারুগলু। সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ও চিফ অব জেনারেল স্টাফ ফাইয়াদ আল রুওয়াইলি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুসারে, বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, যৌথ সামরিক মহড়া, যৌথ উৎপাদন ও গবেষণাসহ প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে সমন্বয়।

বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল সচিবালয় গঠন।

জোটটির পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ধারাকে কেউ কেউ ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করলেও অনেক স্বাধীন বিশ্লেষক এ তুলনার বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, ন্যাটোর মতো এই চুক্তির কোনো সমন্বিত কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী বা যৌথ সামরিক কাঠামো নেই।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক সিনেম চেঙ্গিস সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “অনুমোদনের জন্য চুক্তিটি তুরস্কের পার্লামেন্টে পাঠানোর আগে এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।”

তার মতে, ওই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তির পূর্ণ শর্তাবলী প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা কম।

ইস্তান্বুলের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকসম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই ওই তিন দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কয়েক দশকের পুরোনো নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং তুরস্কের নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, প্রকৃত পরীক্ষা হবে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর।

“যদি যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সচিবালয় এবং শিল্প খাতে যৌথ উদ্যোগ বর্তমান সময়ের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পরও টিকে থাকে, তাহলে তা প্রমাণ করবে যে এই চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মৌলিক পুনর্বিন্যাস ঘটাতে সক্ষম,” যোগ করেন তিনি।

নবগঠিত এই জোটে আর কোন কোন দেশ যোগ দেবে তা এখনো নিশ্চিত না হলেও বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে।

পালাবদল/এমএম


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]