
ছেলে প্রিয়মকে কোলে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তী, তার ডান পাশে মেয়ে আগামী এবং বাম পাশে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত
রংপুর মহানগরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় ওই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেফতার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। সম্পর্কে তারা আত্মীয় এবং দুজনেরই বাড়ি নগরের কোতোয়ালি থানার মাছুয়াপাড়া এলাকায়। আজ রোববার ভোরে পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আজ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে এবং ইয়াবা সেবন করতে থাকে।
পুলিশ কমিশনার জানান, ছাদে মানুষের আনাগোনার শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান। তিনি ছাদে দুই যুবককে দেখতে পেয়ে তাদের উপস্থিতির কারণ জানতে চান।
মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই এলাকারই বাসিন্দা এবং তারা ওই শিক্ষককে 'স্যার' বলে ডাকত। ধরা পড়ে যাওয়ায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। গণপতি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে সেখানে ধস্তাধস্তি ও গোঙানির শব্দ হয়। এই শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেন। খুনিরা তখন সিঁড়িতেই কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে। বাবা-মায়ের চিৎকারের শব্দে তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৩) ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়মকে (১২) হত্যাকারীরা চিনত। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে প্রিয়ম খেলাধুলা করত। খুনিরা বুঝতে পারে, প্রিয়ম বেঁচে থাকলে তাদের চিনে ফেলবে। তাই সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মিলে শিশুটিকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শেষে তারা বালিশ চাপা দেয়।
খুনের পর ইয়াবা সেবন
পুলিশ কমিশনার জানান, টানা চারটি খুনের পর খুনিদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। খুনের পর তারা প্রথমেই ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়। এরপর ছোট ছেলে প্রিয়মকে যে রুমে মারা হয়, সেই রুমের বাথরুমে গিয়ে প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ গোসল করে।
গোসল শেষে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে। সেখানে রাখা বয়াম থেকে খেজুর বের করে খায় এবং সঙ্গে থাকা ইয়াবা সেবন করে।
তিনি আরও জানান, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে খুনিরা পুরো ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করে। তারা ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে ফেলে। যেহেতু সিদ্ধার্থ আট বছর ধরে পিকে পাল জুয়েলার্সে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করছে, তাই সে সহজেই আসল ও নকল স্বর্ণ চিনতে পারে। লুটপাটের সময় সে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে একটি চুড়ির স্বর্ণ যাচাই করে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ যেন না পাওয়া যায়, সে জন্য তারা বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ওই বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানির বালতিতে ভিজিয়ে রাখে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত তারা এই কাজ করে। এরপর জুমার নামাজের সময়, যখন রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে, তখন তারা লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পথে মন্দিরের পেছনের একটি পরিত্যক্ত জায়গায় তারা স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখে, যা পরে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, শুরুতে এটি ডাকাতি নাকি খুন, তা নিয়ে পুলিশ বেশ দ্বিধায় ছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলে পাওয়া ইয়াবা সেবনের আলামত, অর্ধেক খাওয়া শসা এবং আগুন দিয়ে পোড়ানো স্বর্ণের চুড়ি দেখে বুঝতে পারেন, এই ঘটনায় স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত আছে। তিনি বলেন, সিদ্ধার্থ স্বর্ণকারের দোকানে কাজ করতেন। তাদের সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনাস্থলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করে আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
পালাবদল/এসএ