
শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে’
চট্টগ্রাম: চাঁদা না পেলেই প্রকাশ্যে গুলি ছোড়েন তিনি। রয়েছে নিজস্ব ‘টর্চার সেল’। মাদক বিক্রি ও চাঁদাবাজির টাকা দ্রুত গুনতে তার ‘আস্তানায়’ রাখা গণনার যন্ত্রও উদ্ধার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রকও তিনি। তার নাম শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা। অস্ত্র-গুলিসহ গত বছরের ২১ ডিসেম্বর র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া এই ‘সন্ত্রাসী’ ১১ দিনের মধ্যেই তিনটি মামলায় জামিন পেয়েছেন।
চান্দগাঁও থানার দুটি অস্ত্র মামলায় ২ জুলাই এবং সর্বশেষ ১২ জুলাই পাঁচলাইশ থানায় হওয়া একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান শহীদুল। তবে তার বিরুদ্ধে অন্তত ৩২টি মামলা রয়েছে বলে কারাগার কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
শহীদুল তিনটি মামলায় জামিন পাওয়ার বিষয়টি চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, চান্দগাঁও থানার দুটি অস্ত্র এবং পাঁচলাইশ থানার একটি মামলাসহ মোট তিনটি মামলায় জামিননামা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসে। এরপর যাচাই করে এসব জামিননামা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ সৈয়দ শাহ শরীফ বলেন, “বন্দী শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক আইনের ৩২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় জামিন পেয়েছেন। শেষ দুটি অস্ত্রসহ তিন মামলায় জামিননামা কারাগারে এসেছে। কিন্তু আরও মামলা থাকায় এখন তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই।”
শহীদুল জামিনের খবরে চান্দগাঁও, পাঁচলাইশসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরের বাদুরতলা এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, “এই সন্ত্রাসী বেরিয়ে এলে এলাকার কেউ আর শান্তিতে থাকতে পারবে না। তাকে ধরাও কঠিন হবে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, চুরি-ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধে হাতেখড়ি শহীদুলের। গায়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়ে জটলা পাকিয়ে লোকজনের জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতেন। পরে তিনি জড়িয়ে পড়েন মাদকের কারবারে। নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী।
শহীদুল ভোলার দৌলতখান উপজেলা সদরের মোহাম্মদ আলীর ছেলে। পড়াশোনার তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সমাবেশে দলবল নিয়ে যোগদানের ছবি ও ভিডিও রয়েছে তার। নিজেকে ওই সময় পরিচয় দিতেন নগর ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতা হিসেবে। তবে কোনো পদে ছিলেন না।
চাঁদা না পেলেই গুলি
শহীদুল ও তার বাহিনীর লোকজন চাঁদা না পেলেই গুলি ছোড়েন। গত বছরের ৪ অক্টোবর তার সহযোগী মুন্না পাঁচলাইশ বাদুরতলা এলাকায় একটি গ্যারেজের সামনে গুলি ছোড়েন। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, বিজয় চৌধুরীর গ্যারেজের সামনে এসে মুন্না হুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তার কোমর থেকে পিস্তল বের করে গুলি করতে থাকেন। তবে কেউ আহত হননি। পরে গ্যারেজের মালিকসহ আশপাশের লোকজন ‘ডাকাত’ ‘ডাকাত’ চিৎকার করলে মুন্না গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যান।
গত বছরের ১০ নভেম্বর চান্দগাঁও থানার পাশে একটি মোটর গ্যারেজে চাঁদা না পেয়ে গুলি করেন শহীদুল। গ্যারেজের মালিক মারুফ খান জানান, তাদের কাছে ফোন করে প্রথমে ২০ লাখ টাকা, পরে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। কিন্তু চাঁদা না দেওয়ায় গুলি করা হয়েছে। একই বছরের ১৯ অক্টোবর শহীদুল ও তার সহযোগীরা মনিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করেন।
নগরের চান্দগাঁও বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকার একটি ভবনের তৃতীয় তলার একটি বাসাকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন শহীদুল। গত বছরের ২১ জুলাই সেখানে অভিযান চালিয়ে তার ১১ সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু দেশি অস্ত্র, গুলি ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে থানা থেকে লুট হওয়া গুলি ও গুলির খোসা রয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
মেশিনে চাঁদাবাজির টাকা গণনা
গত বছরের ১০ অক্টোবর নগরের শুলকবহর এলাকায় অভিযান চালিয়ে শহীদুলের তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে একটি বাসার ভেতর থেকে মাদক, অস্ত্রের পাশাপাশি টাকা গণনার যন্ত্রও উদ্ধার করা হয়। ব্যাংকে ব্যবহৃত এই যন্ত্র দিয়ে চাঁদা ও মাদক বিক্রির টাকা গোনা হতো বলে জানায় পুলিশ।
দুই মামলায় জামিন পেয়েছেন আরেক ‘সন্ত্রাসী’
নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এহতেশামুল হক ওরফে ভোলাও দুটি মামলায় ১৪ মে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। জামিননামা ৭ জুলাই কারাগারে পৌঁছায়। সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম হত্যা মামলারও আসামি তিনি।
পুলিশ জানায়, নগরের বাকলিয়া এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত এহতেশামুল। সেখানে তার একটি বাহিনী রয়েছে। সবশেষ চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা অঞ্জলী রানী দেবী হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি নগরের পাঁচলাইশ থানার তেলিপট্টি এলাকায় নিজের বাসার সামনে অঞ্জলী রানী দেবীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অঞ্জলী রানীর স্বামী রাজেন্দ্র চৌধুরী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি শুরুতে পুলিশ ও পরে গোয়েন্দা পুলিশ তদন্তের দায়িত্ব পায়। এর পরের বছর ২০১৬ সালের ৫ জুন নগরের ও আর নিজাম সড়কে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় খুন হন পুলিশের এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম। সে সময় তার স্বামী বাবুল আক্তার এসপি পদে পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছিলেন। ওই হত্যাকাণ্ডের ২৩ দিনের মাথায় মো. মনির নামের এক সহযোগীসহ ভোলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ সৈয়দ শাহ শরীফ বলেন, এহতেশামুলের বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টিতে তিনি জামিন আদেশ পেয়েছেন। শেষ দুটি মামলায় জামিননামা আসে। কিন্তু তাকে নতুন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট (গ্রেফতার) দেখানোর আবেদন করে পুলিশ। পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ছয় মামলায় জামিন হলেও নতুন মামলা থাকায় জামিনে মুক্তি পাননি।
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, “সন্ত্রাসীদের ওপর পুলিশের নজরদারি অব্যাহত আছে। তারা যাতে নতুন করে চাঁদাবাজিসহ কোনো অপরাধে জড়াতে না পারেন।”
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, “দুর্ধর্ষ এসব সন্ত্রাসীর বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অবগত করা হবে।”
পালাবদল/এসএ