শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 
বিদেশ
মক্কাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ হুতিদের





পালাবদল ডেস্ক
Friday, 18 September, 2026
1:29 PM
 @palabadalnet

আল-জাওফে হুতিদের হামলায় সামরিক যানবাহনে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

আল-জাওফে হুতিদের হামলায় সামরিক যানবাহনে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

পবিত্র মক্কাকে রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে উসকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইয়েমেনের হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি।

সৌদি আরবের অভিযোগ, হুতিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে গোষ্ঠীটি। আল-হুতি বলেছেন, মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ ‘ভয়াবহ মিথ্যা’ এবং এটি সৌদি আরবের ‘প্রচারণা’। তার দাবি, সৌদি আরব নিজেদের যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে মক্কার নাম ব্যবহার করছে।

আল জাজিরা জানিয়েছে, এক ঘণ্টার এক টেলিভিশন ভাষণে আল-হুতি বলেন, মক্কার পবিত্রতা ইয়েমেনের মানুষের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব মক্কাকে নিজেদের ‘নিপীড়নের প্রতীক’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মুসলিম বিশ্বকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারও আহ্বান জানান এই হুতি নেতা।

আল-হুতি বলেন, সৌদি আরবের ‘আগ্রাসনের’ এটি ১২তম বছর। তার দাবি, সৌদি আরব সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সামরিক অভিযান চালানোর মধ্য দিয়ে বর্তমান সংঘাতের এই পর্ব শুরু করেছিল। এরপর মোখা দখল এবং আনসার আল্লাহর অগ্রযাত্রার ঘটনা ঘটে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সানা বিমানবন্দরে ওই অভিযানই পরবর্তী ঘটনাগুলোর সূত্রপাত করে। এর ধারাবাহিকতায় আনসার আল্লাহ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে মোখা, ধুবাব ও বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

আল-হুতি আরও বলেন, সৌদি আরব ইয়েমেনকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করেছে। তার দাবি, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের কর্মকাণ্ড মূলত এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অংশ, যে ইয়েমেনকে নিপীড়ন ও অধীনস্থ করে রাখতে চায়।

সৌদি আরবের সামরিক কর্মকাণ্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই হুতি নেতা। তার দাবি, এসব পক্ষই সৌদি আরবের ওপর রাজনৈতিক নীতি চাপিয়ে দিচ্ছে এবং দেশটিকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।

সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি অবশ্য জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত করে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ড্রোনটি পবিত্র শহরের নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয়। মক্কা ও দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে সৌদি জোট।

হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিও মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ নাকচ করেছেন।

পাল্টাপাল্টি হামলায় বহু নিহত

মক্কা নিয়ে এই উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইয়েমেন সরকারের অন্তত ২৩ সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হুতিদের সামরিক সূত্র দাবি করেছে, সৌদি বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধে তাদের ৪০ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, হুতিদের হামলা শুরুর পর সৌদি ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো একজন নিহত হয়েছেন। তায়েফ গভর্নরেটে একটি ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ওই ইয়েমেনি নাগরিক নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও দুজন। কয়েকটি ভবন ও যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে হুতিরা অভিযোগ করেছিল, সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে তিনটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে। হুতিদের পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের দাবি, আবস শহরে ওই হামলায় একজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন।

লোহিত সাগরের উপকূলে হুতিদের অগ্রগতি

সংঘাতের নতুন পর্যায়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে হুতিরা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোষ্ঠীটি সম্প্রতি মক্কা ও বাব আল-মান্দেবের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাগুলো দখলে নিয়েছে। এতে কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।

বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। এই পথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে সেখানে হুতিদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এরইমধ্যে ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব-মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ একই সময়ে আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ইরানকে হুতিদের থামাতে বলল চীন

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব চীনের কাছে সহায়তা চেয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। এরপর চীন ব্যক্তিগতভাবে ইরানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে হুতিদের সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছে বলে তিন ইরানি সূত্র জানিয়েছে।

প্রকাশ্যেই চীন আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়া কারও স্বার্থে নয়।

তবে ইরানের অবস্থান, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন। তেহরান চীনের আহ্বানে হুতিদের ওপর কতটা প্রভাব প্রয়োগ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তি অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তিটির আনুমানিক মূল্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

সৌদি দূতাবাস বলেছে, এই চুক্তি দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারত্বের অগ্রগতির প্রতিফলন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদির নিরাপত্তা জোরদার করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

মক্কাকে ঘিরে সৌদি-হুতি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার সৌদি অভিযোগ ও হুতিদের তা অস্বীকার, অন্যদিকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবে হুতিদের অগ্রগতি-দুই দিক থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও পড়তে পারে।

পালাবদল/এমএম


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]