
ইসরায়েলি প্রধামনমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের নিরন্তর অস্থিরতার মাঝে বিনা উসকানিতে কাতারের রাজধানী দোহায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।
কাতারে ইসরায়েলি হামলার এক বছর পূর্তি হতে চলেছে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর। এ সময়ে কাতার প্রসঙ্গে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
আজ রোববার এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।
সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাতারকে একটি ‘শত্রুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্র আখ্যা দেন নেতানিয়াহু। কাতারে হামলা চালানোর বিষয়টিও তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি তিনি মত দেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি নীতি কেমন হবে, সেটা কাতার নির্ধারণ করে দিতে পারে না।
শনিবার সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু কাতারে বোমা হামলা চালানোর কথা গর্ব করে বলেছেন।
গাজায় পাঠানো অর্থ মানবিক সহায়তা ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল-এমন অভিযোগও উড়িয়ে দেন নেতানিয়াহু।
সাম্প্রতিক সময়ে নিজ দেশেই এ ধরনের অভিযোগের মুখে পড়েছেন ইসরায়েলি নেতা।
নেতানিয়াহু গর্ব করে বলেন, “আমি কাতারে হামলা করেছি, সেখানে বোমা হামলাও চালিয়েছি এবং যুদ্ধের সময় তাদের ওপর হামলা করেছি। তারাও আমাকে আক্রমণ করেছে।”
সাক্ষাৎকারটি এমন সময় প্রকাশিত হলো, যখন দোহায় ইসরায়েলের হামলার এক বছর পূর্তির আর মাত্র কয়েক দিন বাকি।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গাজায় যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য অনুষ্ঠিত বৈঠকের সময় দোহায় হামলা চালায় ইসরায়েল।
ওই বোমা হামলায় হামাসের পাঁচ সদস্য ও কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাতে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে কাতার।
দেশটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ২০১২ সাল থেকে তারা হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়কে দোহায় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে এসেছে।
গত বছর দোহা ওই হামলাকে ‘সব আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা করেছিল।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এটিকে ‘কাপুরুষোচিত’ হামলা বলে অভিহিত করেন।
ইরান ও পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশও হামলার নিন্দা জানায়।
সংহতি প্রকাশ করতে এরপর জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতারা কাতার সফর করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ওই হামলাকে কাতারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ আখ্যা দেন।
ওই মাসের শেষ দিকে হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠক করার সময় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানিকে ফোন করে ওই হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
গাজার সহায়তায় কাতার লাখো ডলার পাঠিয়েছে-এ বিষয়টি আই২৪নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করে নেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যেই এই অর্থ পাঠানো হয়েছিল এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সুপারিশে ইসরায়েল এই অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করেছিল।
নেতানিয়াহু বলেন, “কাতারের কাছ থেকে আসা অর্থ গাজায় প্রবেশ করা মোট অর্থের মাত্র দুই শতাংশ।”
নেতানিয়াহুর সমালোচকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার প্রস্তুতিতে হামাসকে সহায়তা করতে এই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওই হামলার পরই গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু হয়।
কাতার অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটি বলেছে, হামাসকে অর্থায়নের দাবি ভিত্তিহীন।
কাতারের সহায়তা পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর তদারকির ব্যবস্থাও রয়েছে।
গত বছরের দোহা ফোরামে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজ তারা (ইসরায়েল) দাবি করছে, এভাবে আর্থিক সহায়তার নামে হামাসের অর্থায়ন করছে কাতার। এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই।”
“আমাদের সব সহায়তা গাজায় গেছে। গাজার মানুষের কাছে গেছে। এটি অত্যন্ত স্বচ্ছ একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অবগত,” যোগ করেন তিনি।
২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে এসব মন্তব্য করলেন নেতানিয়াহু।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গাজা যুদ্ধ, অর্থনীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশে ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছেন নেতানিয়াহু।
এসব ইস্যুই নির্বাচনী প্রচারের প্রধান বিষয় হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মতে, নির্বাচনের আগে জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন আদায়ে নেতানিয়াহু বারবার অন্য দেশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন।
পালাবদল/এসএ