
ভূমধ্যসাগরের ইসরায়েল উপকূলে ক্ষুদ্র শৈবাল প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে । ছবি: সংগৃহীত
অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ ইসরায়েল। তবে ৭৮ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম দেশটি সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে।
মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ভূমধ্যসাগর উপকূলে মাইলের পর মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র শৈবালের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ইসরায়েলের অধিকাংশ পানি শোধনাগার।
দেশটির জাতীয় পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেকোরোটের’ তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর উপকূলে থাকা ছয়টি লবণ পানি শোধনাগারের মধ্যে পাঁচটি গত রোববার বন্ধ হয়ে যায়।
বেসরকারিভাবে কয়েকটি শোধনাগার আংশিক চালু করা হলেও দুয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো আবার বন্ধ হয়ে যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র একটি বেসরকারি শোধনাগার পূর্ণ সক্ষমতায় চলেছে বলে জানিয়েছে মেকোরোট।
আজ শুক্রবার সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপেয় পানির জন্য পুরোপুরি লোনা পানি শোধনের ওপর নির্ভরশীল ইসরায়েল। শুষ্ক জলবায়ুর এই দেশে বড় কোনো নদী নেই, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতও হয় না।
তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানি ব্যবস্থাপনায় বেশ এগিয়েছে ইসরায়েল। বর্তমানে তাদের মোট সুপেয় পানির অন্তত ৬৫ শতাংশ আসে ভূমধ্যসাগর উপকূলে অবস্থিত ছয়টি শোধনাগার থেকে। ক্ষুদ্র শৈবালের বিস্তারের কারণে এখন পাঁচটিই বন্ধ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন মেকোরোটের মুখপাত্র লিওর গুটম্যান।
তিনি বলেন, “ইসরায়েলে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।”
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েল উপকূলের প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই ক্ষুদ্র শৈবাল।
ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণাবিষয়ক অধ্যাপক ইদো বার-জিভ বলেন, “সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের উপকূলজুড়ে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ দূষিত উপাদান দেখা যায়। পরে আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পাই, সেগুলো আসলে মাইক্রোঅ্যালগি বা অতি ক্ষুদ্র শৈবাল। এগুলো সূর্যের আলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানিতে থাকা পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে।”
তার ধারণা, এই ক্ষুদ্র শৈবালের বিস্তার মিশরের নীল নদের বদ্বীপ এলাকা থেকে শুরু হয়েছে। পরে স্রোতের সঙ্গে ভেসে ইসরায়েল উপকূলে ছড়িয়ে পড়ে।
গত ২০ বছর ধরে উপকূলের পানি পরীক্ষা করছেন বার-জিভ। তিনি বলেন, “আমার পুরো কর্মজীবনে এত বড় পরিসরে এমন ঘটনা এই প্রথম।”
পানি পরিশোধনের জন্য ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসরায়েল। এ প্রক্রিয়ায় প্রথমে পানিকে প্রাক-পরিশোধনের মাধ্যমে বড় বড় দূষিত পদার্থগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর বিশেষ ঝিল্লির মধ্য দিয়ে উচ্চচাপে পানি প্রবাহিত করা হয়। এসব ঝিল্লি লবণ, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ আটকে দেয় এবং পরিষ্কার পানি আলাদা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, ‘শৈবাল এবং এ থেকে নিঃসৃত পদার্থ শোধনাগারের মেমব্রেন বা ঝিল্লিগুলোকে নষ্ট করে ফেলে। পানিতে ভাসমান উপাদানের পরিমাণ বেড়ে গেলে শোধনাগারের পক্ষে তা সামলানো সম্ভব হয় না।’
অন্যদিকে, এ সংকট আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ গ্রীষ্মকাল।
এ সময়ে ইসরায়েলে পানির চাহিদা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি থাকে বলে জানিয়েছেন মেকোরোটের মুখপাত্র গুটম্যান।
তার মতে, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কৃষকদের ওপর, যারা সেচের জন্য পানি ব্যবহার করেন।
সংকটের পরিধি দেখে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।
বার-জিভ বলেন, “ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা ইসরায়েলকে খুঁজে বের করতে হবে।”
একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি জীবনে একবারই ঘটবে, এমন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।”
উন্নত প্রযুক্তির এই পানি শোধন ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিমুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সামরিক হামলা বা সাইবার হুমকির ঝুঁকিও রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এমনকি সাইবার হামলার শিকারও হয়।
এছাড়া যুদ্ধের মধ্যে তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বার-জিভ বলেন, সামুদ্রিক শৈবালের চেয়ে শোধনাগারের আশপাশে তেল ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নেবে। পুরোপুরি অচল হয়ে পড়তে পারে শোধনাগারগুলো, যা শৈবালের চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগের।
পালাবদল/এসএ