মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬ ২ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬
 
বিদেশ
কেন চীনকে সমঝে চলেন ট্রাম্প





পালাবদল ডেস্ক
Sunday, 26 April, 2026
2:46 PM
 @palabadalnet

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

আমেরিকাকে প্যাঁচে ফেলতে চোরাপথে ইরানকে সাহায্য। আমেরিকার সেনাঘাঁটিতে হামলায় তেহরানকে প্রয়োজনীয় তথ্যপাচার! মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে একের পর এক অভিযোগে  চীনকে বিদ্ধ করার চেষ্টা ওয়াশিংটনের। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বেইজিংকে নিয়ে সেভাবে সুর চড়াচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উল্টো মান্দারিনভাষীদের সন্ধির বার্তা দিতে দেখা যাচ্ছে তাকে। তবে কি ওয়াশিংটনের ‘প্রাণভোমরা’কে মুঠোবন্দি করে ফেলেছে ড্রাগন? না কি নেপথ্যে আছে বড় কোনও ষড়যন্ত্র? কোমর বেঁধে তার জবাব খুঁজছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, আমেরিকার ওই ‘প্রাণভোমরা’ হলো বিরল খনিজ বা আরইই (রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস)। বর্তমানে এর সিংহভাগ চীন থেকে আমদানি করছে ওয়াশিংটন। আমেরিকার সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণ শিল্পে সংশ্লিষ্ট ধাতুগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। উদাহরণ হিসাবে মার্কিন বিমানবাহিনীর গর্বের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেল্‌থ’ শ্রেণির লড়াকু জেট ‘এফ-৩৫ লাইটনিং টু’-র কথা বলা যেতে পারে। এর এক একটি ইউনিট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে কমবেশি ৪০০ কেজি আরইই। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে এই সংক্রান্ত কোনও তথ্য দেয়নি নির্মাণকারী সংস্থা ‘লকহিড মার্টিন’।

‘এফ-৩৫’ লড়াকু জেটের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও রেডার-সহ অন্যান্য অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্যও মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলির চাই বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ। এ ছাড়া আমেরিকার বৈদ্যুতিন গাড়ি, মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ-কম্পিউটার শিল্পে এর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, চীনকে বাদ দিলে আরইই-র কোনও বিকল্প উৎস আমেরিকার হাতে নেই। ফলে ইরান যুদ্ধে বেইজিংয়ের ভূমিকা জানা সত্ত্বেও, ট্রাম্পকে নীরবে সব কিছু হজম করতে হচ্ছে বলেই মনে করে ওয়াকিবহাল মহলো।

গোদের উপর বিষফোড়ার মতো মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নতুন সামরিক আইন, আগামী বছরের (২০২৭ সাল) ১ জানুয়ারি থেকে আমেরিকায় যা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আইন মোতাবেক, চীন থেকে বিরল খনিজের আমদানি কমাবে আমেরিকা। শুধু তা-ই নয়, সামরিক সরঞ্জামে বেইজিংয়ের আরইই প্রায় ব্যবহার না করার নিদান রয়েছে সেখানে। বিশ্লেষকদের দাবি, সে ক্ষেত্রে বিরল খনিজের অভাবে ‘এফ-৩৫’ লড়াকু জেটের উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে লকহিড মার্টিনকে। ফলে ট্রাম্পের উপর যে ক্রমশ চাপ বাড়ছে, তা বলাই বাহুল্য।

বর্তমানে বিশ্বের ৯০ শতাংশ বিরল খনিজ উৎপাদন করে থাকে চীন। আরইই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি জটিল সমস্যা রয়েছে। সেটা হলো, খনি থেকে উত্তোলনের পর সরাসরি একে কাজে লাগানো যায় না। বিরল খনিজকে বদলাতে হয় অ্যালয় বা ধাতু-সংকরে। সেই পরিশোধনাগারের প্রায় পুরোটাই আছে বেইজিংয়ে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার জেরে গত বছর (২০২৫ সাল) হঠাৎ করেই আরইই-র চুম্বক সরবরাহ বন্ধ করেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যা নিয়ে হুঙ্কার ছেড়েও তেমন সুবিধা করতে পারেননি ট্রাম্প।

গত বছরের (২০২৫ সাল) অক্টোবরে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন মার্কিন সরকারের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ‘ফক্স নিউজ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বিরল খনিজের লড়াইটা চীন বনাম বাকি বিশ্বের। আমরা বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলছি। আমেরিকা কখনওই ড্রাগনভূমিকে আরইই-র উপর আধিপত্য বিস্তার করতে দিতে পারে না।” এ ব্যাপারে ভারত ও পশ্চিম ইউরোপ-সহ একাধিক ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী স্কট।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তির ‘স্বর্গরাজ্য’ মার্কিন আমেরিকা বিরল খনিজের চুম্বক একেবারেই তৈরি হয় না, তা ভাবলে ভুল হবে। আমেরিকার ওহায়ো প্রদেশে রয়েছে ‘আরই অ্যালয়’ নামের একটি সংস্থা। বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের কারণে গত তিন দশক ধরে ওয়াশিংটনের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের অন্দরে বেশ যাতায়াত রয়েছে তাদের। চীনের বাইরে আরইই পরিশোধনের সবচেয়ে বড় কারখানা তৈরিতে তারা হাত লাগিয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।

আমেরিকার গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর (২০২৭ সাল) থেকে ৬০০ টন বিরল ধাতুর প্রক্রিয়াকরণ শুরু করবে ‘আরই অ্যালয়’। প্রথম দফায় তিন হাজার টন পর্যন্ত আরইই চুম্বক সরবরাহ করতে পারে তারা। তবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বেশ কয়েক বছর। ওহায়োর সংস্থাটির পরিশোধিত বিরল ধাতুর উৎপাদন ১৮ হাজার টন পর্যন্ত যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পেন্টাগনের জন্য এই অঙ্ক পর্যাপ্ত নয়, বলছেন সাবেক সেনাকর্তা থেকে শুরু করে মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশ।

মজার বিষয় হলো, গত কয়েক বছরে আমেরিকার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে বৈদ্যুতিন গাড়ির চাহিদা। ফলে আগামী দিনে একটি অর্থবর্ষে আমেরিকা ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩০-৪০ লাখ। বিরল খনিজ ছাড়া বৈদ্যুতিন গাড়ি নির্মাণ সম্ভব নয়। ওহায়োর কারখানায় তৈরি হওয়া পরিশোধিত আরইই-র পুরোটাই সেখানে ব্যবহার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষাশিল্পের কোনও সুবিধা হবে না বলেই জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তারা। এর জেরে গত নভেম্বর থেকে শি-র প্রতি নরম মনোভাব নিতে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্পকে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতার আসার পর প্রাথমিক ভাবে চীনকে নিয়ে একটা ‘যুদ্ধংদেহী’ মনোভাব ছিল ট্রাম্পের। মাত্র চার মাসের মাথায় এপ্রিলে বেইজিংয়ের সঙ্গে শুল্ক সংঘাতে নেমে পড়েন তিনি। যদিও অক্টোবর আসতে না আসতেই ১৮০ ডিগ্রি বেঁকে যায় তার বাণিজ্যনীতি। ওই সময় বেইজিংয়ের পণ্যে কর হ্রাস করে ৪৭ শতাংশে নামিয়ে আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, একসময় যা ছিল ১৪২ শতাংশ। ওই সময় আমেরিকার সামগ্রীতে ১৩৪ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছিল মান্দারিনভাষীদের প্রশাসন।

গত ৩০ অক্টোবর রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকের (দক্ষিণ কোরিয়া) বুসান শহরে চীনা রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিঙের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় দু’ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার আলোচনার পর নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন ‘প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’, অর্থাৎ পোটাস। সেখানে তিনি লেখেন, বাণিজ্য নিয়ে কেটেছে জট। ফলে বিরল খনিজ পেতে আর কোনও সমস্যা হবে না।

বুসানে ওই বৈঠকের মুখে প্রথম বার ‘জি-২’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন ট্রাম্প। এর পরই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় হইচই। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ‘জি-২’র মাধ্যমে চীনকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক ভাবে বিশ্ব জুড়ে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছেন পোটাস, যাকে স্বাগত জানাতে অবশ্য একেবারেই দেরি করেনি বেইজিং।

দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে বৈঠকের পর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লেখেন, “জি-২র বৈঠক আমাদের দুই দেশের জন্যই দুর্দান্ত ছিল। এটা আমাদের চিরস্থায়ী শান্তি এবং সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে। ঈশ্বর চীন এবং মার্কিন আমেরিকা উভয়কেই আশীর্বাদ করুন!”

এর পরই বিষয়টি নিয়ে পাল্টা বিবৃতি দেয় বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, “আমেরিকার সঙ্গে আমরা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করব। বিশ্বের কল্যাণের জন্য মহান এবং সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তার জন্য একসঙ্গে পথ চলার ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি নেই।”

ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক হুসেন ওবামার আমলেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টায় ত্রুটি করেনি আমেরিকা। বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়ে বেইজিংকে বিস্তারবাদী নীতি থেকে সরিয়ে আনতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে আমেরিকার বাজারের একটা বড় অংশ দখল করে ফেলে ড্রাগনের বিভিন্ন সংস্থা।

আমেরিকার কুর্সিতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথম কার্যকালের মেয়াদে অবশ্য চীনকে নিয়ে ট্রাম্পের চীন্তাভাবনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই সময় বেইজিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধে জড়ান তিনি। ২০১৭ সালে ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত ‘চতুর্ভুজ নিরাপত্তা সংলাপ’ বা কোয়াডকে (কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়লগ) পুনরুজ্জীবিত করেন তিনি। পরবর্তী বছরগুলিতে এই তিন দেশের সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে ওয়াশিংটন। শুরু হয় যৌথ সামরিক মহড়া এবং নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলার কাজ।

একসময় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনা প্রভাব হ্রাসে কোয়াডকে মজবুত করতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তার উত্তরসূরি জো বাইডেনের আমলেও সেই নীতি থেকে সরে আসেনি আমেরিকা। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর চতুর্দেশীয় জোটটিকে সে ভাবে গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে না তাকে। নেপথ্যে কি বেইজিংয়েরই চাপ? উঠছে সেই প্রশ্নও।

চলতি বছরের মে মাসে চীনসফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে বৈঠকে অবশ্যই বিরল খনিজের সমস্যা মিটিয়ে নিতে চাইবেন তিনি। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বেইজিং ব্ল্যাকমেলিংয়ের রাস্তায় গেলে কী করবেন পোটাস? উত্তর দেবে সময়।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]