
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ। কিন্তু বাস্তবে অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম (গোত্রবাদ) বেড়েছে, গোটা রাজনৈতিক বয়ান ডান দিকে সরে গেছে। অভ্যুত্থানের পর লিবারেল ও বাম পরিসর প্রায় শূন্য। তবে অনেক সমালোচনার পরও জুলাইকে ব্যর্থ বলা যাবে না।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এক সেমিনারে এ কথাগুলো বলেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশিষ্টজনেরা। ‘জুলাইয়ের অর্জন, জুলাইয়ের জিজ্ঞাসা’ শিরোনামে এ সেমিনারের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, চব্বিশের আশু লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের অবসান। আশু লক্ষ্য নিশ্চয়ই বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ও পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্র ও সরকারের দিক থেকে পত্রপত্রিকাকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে।
প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক শক্তি এবং দক্ষতা-সামর্থ্যের অভাবে বামপন্থীরা জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে নির্ণায়ক বা নির্ধারক ভূমিকা নিতে পারেননি উল্লেখ করে নূরুল কবীর বলেন, সবচেয়ে সংগঠিতভাবে ও চতুরতার সঙ্গে এই আন্দোলনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত গতি নির্ধারণ করেছে জামায়াতে ইসলামী। অন্তর্বর্তী সরকারেও তারা প্রভাব, আধিপত্য জারি রাখতে পেরেছিল।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। এতে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ। কিন্তু বাস্তবে অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম (গোত্রবাদ) বেড়েছে, গোটা রাজনৈতিক বয়ান ডান দিকে সরে গেছে। অভ্যুত্থানের পর লিবারেল ও বাম পরিসর প্রায় শূন্য। রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও সংকীর্ণ, আরও অসহিষ্ণু।
কে কতটা ডানপন্থীদের আকৃষ্ট করতে পারবে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি সেই প্রতিযোগিতায় আটকে গেছে উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, “জামায়াতের জন্য ডানপন্থার বিস্তার লাভজনক। এনসিপি জোটের কারণে চুপ। বিএনপির ভোটব্যাংক ডানঘেঁষা, তাই তারাও চ্যালেঞ্জ করছে না। এখানে অন্তর্ভুক্তির অর্জন নেতিবাচক।” তিনি বলেন, দেশে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রকল্প থেমে গেছে। তবে অনেক সমালোচনার পরও জুলাইকে ব্যর্থ বলা যাবে না।
প্রবন্ধে এ মুহূর্তের পাঁচ করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, সংস্কারকে এলিটের দর-কষাকষি থেকে জনপরিসরে ফিরিয়ে আনতে হবে; বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে টেকসই সংগঠনে রূপ দিতে হবে; লিবারেল-বাম পরিসরের শূন্যতা পূরণ ও রাজনৈতিক বয়ানকে ট্রাইবালিজম থেকে ফিরিয়ে আনা; জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং নৈতিক অর্থনীতির দিকে যাত্রা।
‘চব্বিশের পর সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে’
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের অধ্যাপক আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন একটি উদ্যাপনযোগ্য সাফল্য। অভ্যুত্থান সফল হয়েছে কি না, বোঝা যাবে ২০ বছর পর। তখন যদি দেখা যায় যে ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে আসার আর সম্ভাবনা নেই, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে, তাহলে বুঝতে হবে চব্বিশ কিঞ্চিৎ সফল হয়েছে।
চব্বিশের পর দেশে একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক। বলেন, এই যুদ্ধে উগ্র ডানপন্থীরা সরাসরি নেমেছে। এটা অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটা নেতিবাচক দিক। এই জায়গাগুলো লক্ষ করে আরেকবার ফিরে দেখা দরকার, কী করার ছিল আর কী হয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, জুলাইয়ের যে চেতনা বা আকাঙ্ক্ষার কথা বলা হয়, সেটিকে বাস্তবে দেখতে হলে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের ন্যায়বিচারের কর্মকৌশল তৈরিতে নিবিষ্টভাবে কাজ করার বিকল্প নেই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, জুলাই কী ছিল, এটি বোঝার পাশাপাশি এর পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমালোচনা হাজির করা দরকার।
বিভাজনে প্রগতিশীল রাজনীতি আটকে পড়ে
আলোচনায় অংশ নিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও লেখক ফিরোজ আহমেদ বলেন, দুর্নীতি না উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ না বিপক্ষ-আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই বিভাজনে প্রগতিশীল রাজনীতি আটকে পড়েছিল। এর ফলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সর্বাত্মক ঐক্য হয়নি। চব্বিশে প্রগতিশীলরা প্রাণপণে জনগণের সঙ্গে সাঁতার কেটেছে, কিন্তু আন্দোলনের সামনে যাওয়ার সুযোগ তাদের ছিল না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, জুলাই প্রশ্নবিদ্ধ হলে সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে, শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি অবিচার হবে। গত দুই বছরে যা যা হয়েছে, সব ভুলে গিয়ে নতুন করে এগিয়ে যেতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেটি না হলে আবারও সেই নিপীড়নের সংস্কৃতি ফিরে আসবে।
ডাকসুর সদস্য হেমা চাকমা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ডানপন্থার উত্থান হয়েছে। একের পর এক ‘মব সন্ত্রাস’ হয়েছে। এটি কখনোই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন ছিল না।
সেমিনার সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের শিক্ষক ফাহমিদুল হক। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, শিক্ষক ও গবেষক মোবাশ্বার হাসান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শরমি হোসেন, বিএনপি নেতা মীর আরশাদুল হক প্রমুখ।
পালাবদল/এসএ