মতামত
পরীমনির কান্না অথবা নিখোঁজ ইসলামি বক্তা
পরীমনির কান্না অথবা নিখোঁজ ইসলামি বক্তা





ফারুক ওয়াসিফ
Tuesday, Jun 15, 2021, 11:41 pm
 @palabadalnet

জনপ্রিয় নায়িকা পরীমনি যখন ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়ে হয়রান হচ্ছিলেন, ঠিক তখন রংপুরের এক তরুণ ইসলামি বক্তা তিন সঙ্গীসহ নিখোঁজ হন। তাদের স্বজনেরাও থানায় গিয়ে অভিযোগ দাখিল করতে ব্যর্থ হন। ওই একই সময়ে মধুপুরের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এক নারীকে বর্বরভাবে ধর্ষণ করে তিন মদ্যপ। কাছাকাছি সময়ে সাভারে ছুটির দাবিতে আন্দোলন করার সময় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালাতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে মারা যান দুই সন্তানের জননী জেসমিন। পরীমনির কান্না আমরা দেখেছি, কিন্তু জেসমিনের সন্তানদের কান্নার সামনে ক্যামেরা নিয়ে যাবে কে? কে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ওই নারীকে চিকিৎসা করাবে, সুবিচার দেবে? তরুণ ইসলামি বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের স্ত্রী ও মায়ের কাছে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কি কোনো কর্তৃপক্ষ আছে?

বোট ক্লাবের ঘটনা নিয়ে ফেসবুক সরগরম হয়ে আছে। সুন্দরী নায়িকার জন্য যে আবেগ ও আবেদন জাগে, সেটা কি একজন শ্রমিকের জন্য বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারীর জন্য বা নিখোঁজ বক্তার জন্য জাগছে? ওপরে বলা সব কটি ঘটনায় নারীরা ভুক্তভোগী। তাহলেও সবার যন্ত্রণার ওজন মাপার সমান বাটখারা আমাদের নেই। মানুষের আবেগও বাছাই করা, বিচারও বাছাই করা ব্যক্তিরাই পান। আমরা আইন ও প্রশাসনের বৈষম্যের কথা বলি, সরকারি পক্ষপাতের কথা বলি। অথচ নিজেদের হৃদয়ের আদালতে সবার কান্না সমান আলোড়ন তোলে না। আমাদের নৈতিকতার মাপকাঠি নারীর জন্য এক রকম, পুরুষের জন্য আরেক রকম। সহানুভূতির বাতাস ধনী ও মধ্যবিত্তের পালে যতটা লাগে, গরিবের ছেঁড়া পালে ততটা লাগে না।

পক্ষপাত যখন আমাদের মনে, তখন তার সুযোগ নেওয়া হবেই। পরীমনির কান্না দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে আদনানের স্ত্রীর কান্নাকে। এ সুযোগ আমরাই দিচ্ছি বলে পুলিশও বাছাই করা বিষয়ে তৎপর হবে। একজন মানুষ, তিনি যে ধর্মের হোন, যে চিন্তাভাবনা হোন, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে না পারার দেশে কিছু মানুষকে কম-মানুষ করে রাখা হয়। সুনামগঞ্জের শাল্লার ঝুমন দাস বিনা বিচারে আটক থাকবেন, রংপুরের তরুণ বক্তা আদনানকে খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকবে না, প্রভাবশালীরা দ্রুত জামিন পাবেন, মোদির সফরের প্রতিবাদকারী অজস্র তরুণ জেলের ভেতর আটকা পড়ে থাকবে।

কথায় কথায় আমরা সরকারকে দোষ দিই। কিন্তু আমরা যেমন, তেমন সরকারই আমরা পাই। যে দেশে গণপিটুনির সামাজিক বৈধতা থাকে, সেই দেশে ক্রসফায়ারও সামাজিক সম্মতি পাবে। যে দেশে নারীকে একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ও লোভনীয় ভাবাই রেওয়াজ, সেখানে তো যৌন নির্যাতনের ইস্যুকে খাটো করে দেখাই দস্তুর। তখনই দেখা যাবে, পরীমনির অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদ আটক হলেও মুনিয়া হত্যার প্রতিকার হবে না। বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাবে এবং অভিযুক্ত আসামি স্বমহিমায় খেলার মাঠে বহাল থাকবেন। নিহত মেয়েটি ঠাঁই পাবে তনুর মতো বিচারহীন হত্যার শিকারদের খাতায়। কিছু হত্যা তাই তদন্তের তলায় চাপা পড়বে, কিছু ঘাতক উঠে যাবে আইনের ঊর্ধ্বে।

আবেগকেও তাই প্রশিক্ষিত করতে হয়। তা যেন একচক্ষু হরিণের মতো এক দিকেই না ছোটে। ফেসবুকে যাঁরা পরীমনির পক্ষে, তারা বিপক্ষের যুক্তিবাদীদের সম্ভাব্য ধর্ষক বলছেন। আবার ব্যবসায়ী নাসিরকে যাঁরা ষড়যন্ত্রের শিকার বলে ভাবছেন, যাঁরা তার ব্যাপারে সহানুভূতিশীল, তারা পরীমনির পক্ষের মানুষদের অনৈতিকতার পূজারি গণ্য করবেন কেন? আদালতে দুই পক্ষের উকিলরা যখন সওয়াল-জবাব করেন, তখন কি তারা একে অন্যকে শত্রু ভাবেন? ভাবেন না।

সমাজ কথাটার মধ্যে ‘সম’-এর ধারণা আছে। সব অন্যায়কে সমান চোখে দেখা, সব মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সমান বলে ভাবাই সভ্যতা। আমরা পশ্চিমা সমাজের যতই দোষ ধরি না কেন, সেখানে মানুষে মানুষে আইনগত সমতা অন্তত অস্বীকার করা হয় না। সেসব রাষ্ট্রের আইন আগে সমতা আনেনি, মানুষের আন্দোলন ও চেতনা আগে এসেছে, তারপর রাষ্ট্র সেই চেতনাকে আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে বাস্তবায়নে নেমেছে। বাংলাদেশের আইন ও রাষ্ট্রকে মানবিক সাম্যের দিকে নিতে হলে সামাজিক ফ্যাসাদ আগে দূর করা লাগবে।

সমাজের অনাচার ও ভেদ-বৈষম্যের প্রতিবিম্বই আমাদের সরকার ও রাষ্ট্রে দেখা যায়। রাজনীতি এই ভেদের বাজার চাঙা রাখে। তাতে দমনকারী ক্ষমতার মস্ত সুবিধা হয়। এই যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর গার্ড অব অনারে নারী ইউএনও রাখার বিরুদ্ধে বলেছে সংসদীয় কমিটি। এর আগে জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ দুটি পদে একই সঙ্গে দুই নারী যাতে পদায়িত না হন, তার দাবি এসেছে। দেখা যাবে, সমাজে এ ধরনের বৈষম্যের পক্ষে জোরদার সমর্থন আছে।

পরীমনি নারী বলে বাড়তি সুবিধা না পান, আবার নারী বলে কমও যেন না পান। পোশাকশ্রমিক জেসমিন কিংবা ধর্ষণের শিকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারীর জন্যও যাতে আইন দাঁড়ায়। নিখোঁজ বক্তা আদনান যেন ‘ইসলামি’ বলে প্রশাসনিক অবজ্ঞার শিকার না হন। আমরা জানি, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলাবে না, কিন্তু নিষ্ঠা নিয়ে পরিবর্তনের কাজ করে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর উপায় কী? সেটাই বাঁচার পথ।

সূত্র: প্রথম আলো

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]