জাতীয়
বাংলাদেশ ক্রমেই স্বৈরশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে
বাংলাদেশ ক্রমেই স্বৈরশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে





সুমিত গাঙ্গুলি, ফরেন পলিসি
Monday, Nov 30, 2020, 1:39 pm
Update: 30.11.2020, 1:54:19 pm
 @palabadalnet

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালিন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন। বাংলাদেশ আর দারিদ্র সমার্থক হয়ে ছিল বহুদিন। বহু দশক দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির দারিদ্র বিমোচনের হার আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই শ্লথ। বহু স্কলার আশঙ্কা জানিয়েছিলেন এই দেশটি বিদেশী সহায়তার উপরই নির্ভরশীল থেকে যাবে। অনেকে এমনকি এই আশঙ্কাও জানিয়েছিলেন যে, জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় খাদ্য সঙ্কটে পড়ে যাবে বাংলাদেশ। 

কিন্তু বিরূপ শঙ্কা, ১৯৭৫, ১৯৮২, এবং ২০০৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থান, এবং ধারাবাহিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও বাংলাদেশ আসলে দারিদ্র বিমোচনে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। গত মাসে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফাণ্ড ইঙ্গিত দিয়েছে যে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতকে ছাপিয়ে যাবে। 

আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী খুবই জোরালো। তারা বলেছে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি মূলত করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ১০.৩ শতাংশ হ্রাস পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। 

যে দেশটিকে দরিদ্র আর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সমার্থক হিসেবে দেখা হতো, সেই দেশটি কিভাবে এই নাটকীয় অর্জন করলো এবং এমনকি অন্তত মাথাপিছু জিডিপির হিসেবে হলেও ভারতকে পর্যন্ত তারা হুমকিতে ফেলে দিয়েছে? এর তাৎক্ষণিক উত্তর হলো গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং একই সময়ে ভারতের পারফর্মেন্স উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গেছে। কিন্তু ঢাকার এই সাফল্য থেকেই প্রশ্নটা উঠছে: ঠিক কিভাবে তারা এই অর্থনৈতিক অলৌকিক অর্জন করলো?

প্রশ্নের উত্তরটা জটিল। একদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ধারাবাহিকভাবে বিদেশ থেকে দেশে রেমিটেন্স পাঠিয়েছে, যাদের অধিকাংশই থাকে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে। ১০ মিলিয়নের বেশি বাংলাদেশি বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছে। একই সাথে প্রবাসীরা দেশে বেকারত্ব হ্রাসেও সাহায্য করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় রাজ্যের আকারের একটা ভূখণ্ডে ১৬০ মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস করছে। তাছাড়া ধারাবাহিকভাবে আসা এই রেমিটেন্স দেশের ভেতরে দারিদ্র বিমোচনেও একটা বড় ভূমিকা রাখছে। 

কিন্তু বিদেশী রেমিটেন্সই বাংলাদেশের সাফল্যের একমাত্র কারণ নয়। সাফল্যের আরেকটি প্রধান কারণ হলো দেশের গার্মেন্টস শিল্পে অসামান্য অর্জন। এই শিল্পে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ শুধু কাজই করছে না, একই সাথে দেশের পুরো রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসছে এই খাত থেকে। বাংলাদেশ সতর্কতার সাথে এই খাতে মনোযোগ দিয়েছে। এই শিল্প বাংলাদেশের নারীদের কর্মসংস্থানের একটা দেশের আয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। 

এই দুটোর বাইরে দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের আরেকটি উৎস রয়েছে। বাংলাদেশ মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে দারুণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এতে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, অপুষ্টি অনেকটাই দূর হয়েছে, এবং রোগব্যাধির প্রকোপ কমেছে। 

কিন্তু ঢাকার স্মার্ট পরিকল্পনা সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সবসময় উদ্বেগের কারণ ঘটিয়েছে। ক্ষমতাসীন শক্তির সহযোগীদের হাতে নিয়ন্ত্রণহীন রাজনৈতিক শক্তি থাকায় সময়ের সাথে সাথে স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতি দারুণভাবে বেড়েছে – যে বিষয়টি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। 

আরো বেশ কিছু দেশের মতোই বাংলাদেশ ক্রমেই স্বৈরশাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী আছেন, এবং পার্লামেন্টের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিই তার নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০১৮ সালের যে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সবশেষ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, সে নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক কারচুপি আর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি উদযাপন করার মতো। কিন্তু কতগুলো সমস্যা এখানে রয়ে গেছে। গার্মেন্টের মতো একটি মাত্র খাতের উপর নির্ভরতা অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য ভালো নয়। আমদানিকারক দেশগুলোতে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর পড়বে। তাছাড়া রেমিটেন্সের উপরও অতিমাত্রায় নির্ভর করাটা যুক্তিসঙ্গত নয়। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এই দুটো বিষয়ই স্পষ্ট হয়েছে। 

তাছাড়া, দারিদ্র জনগোষ্ঠিকে ক্ষমতায়নের যে অগ্রগতি হয়েছে, স্বৈরাচারি শাসনের কারণে সেটা হারিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে সেই গোড়ার মূলনীতিতে ফিরে যেতে হবে, সেটা হলো: গণতন্ত্র। 

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]