জাতীয়
সমালোচকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ
সমালোচকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ





উইলিয়াম পেসেক, নিক্কিই এশিয়ান রিভিউ
Wednesday, Nov 25, 2020, 10:47 am
 @palabadalnet

‘ভালো’ কোভিড-১৯ সঙ্কটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সম্ভবত সবচেয়ে বিস্ময়কর দেশ।

গত মে মাসের কথাই ধরা যাক। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশের অর্থনীতি নিয়ে সুখবর ছিল না। ঘনবসতিপূর্ণ নগরী, নাজুক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থার ফলে সরকার এই বিপর্যয় সামাল দিতে প্রস্তুত নয় বলেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু তেমনটি হয়নি। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশটিতে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা হয়েছে প্রায় ৬,৩০০ জনের, নিউ ইয়র্কের কুইন্সে আমার হোমটাউনের চেয়ে এক হাজারেরও কম। চলতি বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪%-এর বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় তারা প্রতিবেশী ভারতকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

গত মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে ভারতের ওপরে রাখে বাংলাদেশকে। এটা নরেন্দ্র মোদির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়। একসময় হেনরি কিসিঞ্জার যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যায়িত করেছেন, সেই দেশই এই অর্জন করছে। আর শেখ হাসিনার অধীনে ১১ বছরে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে, তাই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর কাজটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভয়াবহ বাণিজ্য যুদ্ধের সময়।

২০১৭ সাল থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে ভিয়েতনাম। ৯৭ মিলিয়ন জনসংখ্যা-সম্বলিত ভিয়েতনামের লোকজন ও সরকারব্যবস্থার সাথে চীনের অনক মিল রয়েছে। আর এতে করে ওয়াশিংটন বনাম বেইজিং লড়াইয়ে বলা যেতে পারে মিনি চায়না লাভবান হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের নিম্নতর মজুরি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য চীন থেকে  সরিয়ে নেয়ার জন্য আকৃষ্ট করতে পারে। আপনাকে খুব বেশি দূর যেতে হবে না। ফাস্ট রিটেইলিং এর মধ্যেই শেখ হাসিনার দেশে ক্রমবর্ধমান হারে নিয়োগ করা শুরু করে দিয়েছে।

এটা তো মাত্র শুরু। বাংলাদেশ আরো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রলুব্ধ করতে পারবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন হওয়ায় বিরল সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার যদি সামাজিক সূচকগুলো অব্যাহতভাবে উন্নতি করতে পারে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়নে আরো পরিশ্রম করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ অনেক গতিশীলতা লাভ করবে, মাথাপিছু আয় বর্তমানের ১,৯০০ ডলারকে আনায়াসেই ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ যেভাবে মধ্য আয়ের মর্যাদা লাভের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে এবং আরো বেশি কোম্পানিতে প্রলব্ধ করতে পারে, তার চারটি উপায় এখানে বলে দেয়া হলো।

প্রথম, ব্যবসা করার কাজটি সহজতর করা। ভিয়েতনামকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সিইওরা পছন্দ করে ওই দেশে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কম থাকায়। ভিয়েতনাম কিন্তু মনে করে, বিদেশীদের কাছে অন্য বিকল্পও আছে। তারা যাতে অন্য দেশে চলে না যায়, তা করার চেষ্টা করে। এ কারণেই বিশ্বব্যাংকের ব্যবসায়িক পরিবেশে ভিয়েতনামের র‌্যাংক ৭০, বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮-এ। মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারের কাছাকাছি যেতে বাংলাদেশের সাথে প্রতিযোগিতায় ক্যামেরুন বা মিয়ানমার পারবে না।

বাংলাদেশের সর্বব্যাপী উপস্থিত ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন আহসান মনসুর বলেন, অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার পাশাপাশি আমাদেরকে ব্যবসা সূচকের মান ভালো করার জন্য অনেক কাজ করতে হবে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। আর এসব কাজ পরস্পরের সাথে জটিলভাবে সম্পর্কযুক্ত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন ও দক্ষতা বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক সংস্কার সাধন করতে হবে। শেখ হাসিনা উন্নয়ন খাতে অনেক কিছু করলেও তার দল ব্যাংক সুদের হার ৯ ভাগে নামিয়ে এনে বড় ধরনের ভুল করেছে। কেনিয়া থেকে গ্রহণ করা এই উদাহরণটি মন্থর হতে থাকা প্রবৃদ্ধিতে ঋণ নেয়ার ব্যয় হ্রাস করা। কিন্তু হিতে বিপরীতই ঘটতে পারে। এতে করে কুঋণে জর্জরিত দেশটির এই খাতে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে।

জুনের মধ্যে নন-পারফরমিং ঋণ মোট ঋণের ৯.২ ভাগে দাঁড়িয়েছে। এটি ভয়াবহ অবস্থা। তবে ভালো খবর হলো, হাসিনার দল করপোরেট বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে। ব্যাংক অর্থায়নের ওপর কোম্পানির নির্ভরশীলতা হ্রাস করার মধ্যে আশাবাদ নিহিত রয়েছে। তবে ভিয়েতনামকে ধরার জন্য আরো কিছু করতে হবে।

তৃতীয়ত, মানব পুঁজিতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করা। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের জন্য একটি ভালো খবর হলো, এই দেশ পাকিস্তানের মতো এবং ভারতে বাড়তে থাকা সাম্প্রদায়িক জটিলতা থেকে মুক্ত। জেন্ডার সাম্যতাও বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে।

চীন থেকে চলে যাওয়া চাকরিগুলো ভারতের বদলে যাতে বাংলাদেশে আসে তা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনশীল খাতে বাড়াতে হবে। ভিয়েতনামের এগিয়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো, তারা আগেরকার এশিয়ান টাইগারদের পথ অনুসরণ করে তাদের শ্রমের মান উন্নয়ন করেছে। পূর্ব এশিয়ার মডেলটি ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ বেশি ভালো করে অনুসরণ করছে। মানব পুঁজিতে বড় বিনিয়োগ ঢাকার উন্নয়ন বিপুলভাবে বেগমান করবে।

চতুর্থত, অর্থনীতিকে ডিজিটাল করা। ফেব্রুয়ারিতে করোনাভাইরাস সবকিছু বদলে দেয়ার আগে আমি মোবাইল ব্যাংকিং সেনশেসন বিকাশের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কামাল কাদিরের সাথে একটি দিন অতিবাহিত করেছি। ৫০ মিলিয়ন লোকের ব্যবহার করা এই খাতে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন ও জ্যাক মার অ্যান্ট গ্রুপ সহায়তা করছে।

বিকাশের দ্রুত গতিতে বিকাশিত হওয়াটা হাসিনার দলের জাতিকে ডিজিটাল করার পদক্ষেপের একটি অংশ। এর মানে হলো ব্যাংকিংয়ের সাথে যুক্ত না থাকা প্রায় ৫০ ভাগ বয়স্ক লোককে আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা। আর দিল্লীকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে ভারত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একমাত্র পরাশক্তি নয়।

উইলিয়াম পেসেক: পুরস্কারজয়ী টোকিও-ভিত্তিক সাংবাদিক ও ‘জাপানিজাইশেন: হোয়াট দি ওয়ার্ল্ড ক্যান লার্ন ফ্রম জাপান্স লস্ট ডিকেডস’ গ্রন্থের রচয়িতা

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]