মতামত
রাজার আচরণ কেমন হবে?
রাজার আচরণ কেমন হবে?





রবি ভেল্লুর
Friday, Nov 20, 2020, 9:13 pm
 @palabadalnet

থাইল্যাণ্ডের রাস্তায় যে বিক্ষোভ হচ্ছে আর রাজা মহা বাজিরালোংকোর্নের বিরুদ্ধে যে নজিরবিহনী সমালোচনা হচ্ছে, সেটার কারণে মনে হচ্ছে এই রাজতন্ত্রের, এবং পুরনো ধাঁচের সামন্ততন্ত্রের দিন পুরোপুরি চলে না গেলেও ক্ষয়ে যাচ্ছে। 

শিক্ষা ও তথ্যের গণতন্ত্রায়ন এখন প্রতিদিনের জীবনের এমন অনুসঙ্গ হয়ে গেছে যে, এটাকে আমরা স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। 

এই কয়েনের উল্টো দিকটা হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা। সত্যিই সোশাল মিডিয়া মত প্রকাশের বিষয়টিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, এটা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রায় হুমকির মতো হয়ে গেছে, এবং যেখানে অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন, অর্ধসত্য ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। 

তারপরও এখনও কিছু রাজতন্ত্র টিকে আছে। যদিও বেশির ভাগই অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে মাত্র। এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যারা রয়েছে, তারা এর যেটুকু ঐতিহ্য বাকি আছে, সাধারণ মানুষের থেকে দূরে থেকে সেটাকে সংরক্ষণ করতে শিখেছেন শুধু। 

এশিয়ার বিভিন্ন রাজতন্ত্র

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষের মতো সে সব দেশের রাজা, আমীর, এবং অভিজাতবর্গ গত সিকি শতাব্দির টালমাটাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। 

সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান, কেলেঙ্কারি এবং বয়সের কারণে অনেক সিংহাসনই ধসে পড়েছে। 

২০০১ সালে নেপালের ক্রাউন প্রিন্স এক প্রাসাদ হত্যাকাণ্ডে রাজা বীরেন্দ্র, তার স্ত্রী ও মেয়ে, এবং বেশ কিছু আত্মীয়দের হত্যা করেন। প্রিন্স নিজেও মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। সেই অবস্থাতেই তিনি রাজা হলেও তাকে কোমা অবস্থায় থাকতে হয়েছিল এবং সেই অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। কখনও আর চোখ খুলতে পারেননি তিনি। 

কম্বোডিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নাম কিংডম অব কম্বোডিয়া। সেখানকার বর্তমান রাজা রাজা নরোডম সিহানুকের ছেলে। কিন্তু তার অবস্থান খুবই নড়বড়ে। ক্ষমতাসীন কে হবে সেটা বাছাই করে রয়্যাল কাউন্সিল এবং রাজ পরিবার থেকেই যে বাছাই করা হবে সে রকম কোন নিশ্চয়তা নেই। 

জাপানের সম্রাট আকিহিতো তার স্বাস্থ্যের কারণে পদত্যাগ করেছেন। এবং গত বছর থেকে সম্রাট নারুহিতোর অধীনে নতুন জাপানি যুদের সূচনা হয়েছে। 

মালয়েশিয়ার সাংবিধানিক রাজা সুলতান মোহাম্মদ পঞ্চমও একই বছর পদত্যাগ করেন, যেটা দেশকে থমকে দিয়েছিল। 

এশিয়াতে যদিও রাজারা এখনও আছেন, কিন্তু আরব বিশ্বের বাইরে ব্রুনেই একমাত্র দেশ, যেখানে রাজার হাতে প্রকৃত ক্ষমতা রয়েছে। 

ভুটান দেশ হিসেবে ছোট হলেও সেখানকার রাজারা যেভাবে নিজেদের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছে এবং সাধারণ মানুষের সাথে নিজেদের যুক্ত করেছে, সেটা এই রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার জন্য একটা শিক্ষা হতে পারে। 

যেমন ভুটানে রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে কোন বিক্ষোভের বিষয়টি একেবারে অচিন্ত্যনীয়। 

কোভিড-১৯ এর মধ্যে রাজা জিগমে খেসার আর তার বাবা সারা দেশে ঘুরে ঘুরে রোগীদের দেখেছেন। এই সব ঘটনায় প্রায়ই রোগিদের চোখে কৃতজ্ঞতার অশ্রু দেখা গেছে। 

ভুটানের পথ

কিন্তু উচ্চ মর্যাদার সাথে দায়িত্ববোধ যুক্ত রয়েছে। ১৯৮৫ সাল থেকে ভুটান সফর করছি আমি। কে-৪ এক দীর্ঘ সাক্ষাতকারে ভুটানকে বিচ্ছিন্নতা থেকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে আসার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, যে প্রক্রিয়াটা কিছুটা তার বাবার সময়ে শুরু হয়েছিল। 

সেটা করতে গিয়ে রাজা জিগমে সিঙ্গে ৩০ বছরের কম বয়স থেকেই নাগরিকদের দাবির প্রতি সাড়া দিতে শুরু করেছিলেন। 

তখন পর্যন্ত টেলিভিশন নিষিদ্ধ ছিল ভুটানে। মূলত বাইরের সাংস্কৃতিক দুষণ থেকে ভুটানকে মুক্ত রাখতেই সেটা করা হয়েছিল। 

এর দুই বছর আগে, ডোর্নিয়ার ২২৮ বিমান নিয়ে ড্রুক এয়ার চালু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ভুটানের পারোর সাথে ভারতের কলকাতার যোগাযোগ তৈরি হয়। এরপর ১৯৮৮ থেকে অন্যান্য রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হয়। 

রাজতন্ত্রের জন্য সংস্কার কখনই সহজ কাজ নয়। কিন্তু শাসক নিজেই প্রজাদের উপর ভরসা রেখে সেটা শুরু করলে এটা খুবই সাহায্য করে। ভালোবাসা পেতে হলে শিকড় গভীরে থাকতে হবে, এবং সেটা তোমাকে দেখাতে হবে। ভুটানের রাজারা স্বাভাবিকভাবেই সেটা বোঝেন। 

কে-৪ হিদারডাউন প্রিপারেটোরি স্কুলে শিক্ষালাভ করেন, ভারতের দার্জিলিংয়ের নর্থ পয়েন্টে এবং ভুটানের একটি স্কুলে লেখাপড়া করেন, যেখানে ইচ্ছা করেই তাকে সাধারণ ভুটানিজদের সাথে লেখাপড়া করানো হয়েছে। তিনি প্রায় কখনই ভুটান ছেড়ে কোথাও যাননি, এমনকি ছুটিতেও নয়। 

কেন কোথাও যাননি, জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, ছুটিতে যাওয়ার জন্য তার নিজের দেশের চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথাও নেই। 

পাহাড়ে নির্মিত একটি লগ কেবিনে অধিকাংশ রাত কাটাতেন তিনি, রাজধানী থিম্পুর নদীর পাড়ের বিশাল প্রাসাদে নয়। 

কিন্তু ভুটানে রাজতন্ত্র সংরক্ষণিত থাকার সবচেয়ে বড় রহস্যটা হলো রাজারা নিজেরাই বুঝেছেন কখন রাজতন্ত্রকে চলে যেতে দিতে হবে এবং এমনভাবে তারা সেটা করেছেন যে, জনগণ নিজেরাই তাদেরকে থাকার অনুরোধ করেছে। 

২০০৮ সালে রাজা জিগমে সিঙ্গে তার ছেলের জন্য সিংহাসন ছেড়ে দেন এবং ভুটান পূর্ণ রাজতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে প্রবেশ করে। ওই বছরেই মার্চে প্রথম নির্বাচন হয় দেশে। 

ভুটানে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের দুই মাস পর, প্রতিবেশী নেপালে রাজা জ্ঞানেন্দ্রর পতন হয় মাওবাদী-নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে। 

ভুটানের পঞ্চম ও বর্তমান রাজা অনেকটাই তার বাবার মতো। তার বাবার মতোই ভুটানের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মধ্যে তার শিকড় রয়ে গেছে, যদিও তার শিক্ষাজীবনের অনেকটাই কেটেছে পশ্চিমে। এর মধ্যে অ্যান্ডোভারের ফিলিপস একাডেমি এবং ম্যাসাচুসেটসের হুইটন কলেজ রয়েছে। এছাড়া অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ম্যাগডালেন কলেজেও পড়েছেন তিনি। 

পশ্চিমা শিক্ষা পেলেও বাবা আর ছেলেকে সবসময় ভুটানের ঐতিহ্যবাহী পোষাকেই দেখা যায়। 

চলতি মাসের শুরুর দিকে রাজা জিগমে খেসার তার সিংহাসন গ্রহণের ১২তম বার্ষিকীতে দেয়া বক্তৃতায় দেশের জনগণের উদ্দেশে বলেন, “আমি কখনই তোমাদের রাজা হিসেবে শাসন করবো না। আমি পিতা হিসেবে তোমাদের সুরক্ষা করবো, ভাইয়ের মতো তোমাদের যত্ন করবো এবং ছেলের মতো তোমাদের সেবা করবো। আমি তোমাদের সবই দিয়ে দেবো এবং কিছুই রাখবো না। আমি এমন একটা ভালো মানুষের মতো এমন একটা জীবন যাপন করবো যাতে তোমরা সবাই নিজেদের সন্তানের কাছে উদাহরণ হিসেবে জীবন যাপনের চেষ্টা করো”।

সূত্র: স্ট্রেইট টাইমস

রবি ভেল্লুর: অ্যাসোসিয়েট সম্পাদক, স্ট্রেইট টাইমস। লেখক, কলামিস্ট


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]