দক্ষিণ এশিয়া
কাশ্মিরের মর্যাদা বাতিলে লাদাখের বৌদ্ধরা প্রথমে খুশি হলেও এখন বিমর্ষ
কাশ্মিরের মর্যাদা বাতিলে লাদাখের বৌদ্ধরা প্রথমে খুশি হলেও এখন বিমর্ষ





আলজাজিরা
Thursday, Oct 15, 2020, 2:19 pm
 @palabadalnet

গত বছর ভারত সরকার যখন অধিকৃত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা ও আধা-স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে জম্মু-কাশ্মির এবং লাদাখকে আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করে তখন লাদাখের বৌদ্ধরা বেশ উৎফুল্ল হয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল। 

এক বছর পর লাদাখে সেই উদযাপনের উচ্ছ্বাসের জায়গায় এখন অনিশ্চয়তা ভর করেছে, দানা বেঁধেছে আশঙ্কা। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার উচ্ছ্বাসের বদলে এখন ভূমি, চাকরি আর পরিচয় হারানোর ভয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়েছে তারা। 

এই হিমালয় অঞ্চলের বৌদ্ধ এবং অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায় আরো আগে থেকেই লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, আধা-স্বায়ত্তশাসিত জম্মু-কাশ্মিরের রাজনীতিবিদ ও আমলারা তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,৭৩০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লাদাখের দুটো জেলায় প্রায় তিন লাখ মানুষ বাস করে। লেহ শহরে মূলত বৌদ্ধদের বাস, আর কারগিলে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি। 

গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে, এতে ভারত শাসিত কাশ্মির অঞ্চলকে আংশিক স্বায়ত্তশাসন দেয়া ছিল। কাশ্মিরের আরেক অংশের নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তান। দুই দেশই পুরো কাশ্মিরকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। 

এর একদিন পর ৬ আগস্ট লাদাখের বিজেপি দলীয় এমপি জামইয়াং শেরিং নামগেল এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে পার্লামেন্টে গরম বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, তার সম্প্রদায় দীর্ঘদিন থেকে এই দাবি জানিয়ে আসছিল। 

৩৫ বছর বয়সী এই নেতা বলেছিলেন, “লাদাখের আজ অনুন্নত থাকার কারণ হলো ৩৭০ অনুচ্ছেদ আর কংগ্রেস পার্টি।” মোদি তার বক্তৃতার প্রশংসা করে সেটাকে ‘অসামান্য বক্তৃতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তার বক্তৃতায় ‘লাদাখে আমাদের বোন ও ভাইদের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে’ বলে মন্তব্য করেন। 

৩৭০ অনুচ্ছেদে জম্মু-কাশ্মিরের চাকরি, ভূমি এবং সংস্কৃতির সুরক্ষা দেয়া ছিল। এর সাথে ছিল ৩৫এ অনুচ্ছেদ, যেখানে এই অঞ্চলের বাইরের কারও এখানে ভূমি কেনা বা চাকরির আবেদনের অধিকার ছিল না। এই বিশেষ মর্যাদা চলে যাওয়ায়, এমনকি লাদাখের বিজেপি নেতারাও এখন ক্ষুব্ধ। 

লাদাখের সাবেক বিজেপি প্রেসিডেন্ট চেরিং দোরগে আল জাজিরাকে বলেন, “আগে জম্মু-কাশ্মিরের মতো আমরা লাদাখের মানুষরাও ৩৫এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে বহিরাগতদের কাছ থেকে সুরক্ষিত ছিলাম। এখন রাজ্য ভাগ করে ফেলায় আমরা বাইরের মানুষের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছি, যারা এখন এখানে জমি কিনতে পারবে এবং আমাদের চাকরিও কেড়ে নিতে পারবে।”

মে মাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি থেকে পদত্যাগ করেছে দোরগে। তিনি বলেন, এই অঞ্চলকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরের পর এখানকার সরকারি জমির নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান লাদাখ অটোনোমাস হিল ডেভলপমেন্ট কাউন্সিলকে (এলএএইচডিসি) ‘দন্ত্যহীন বাঘে’ পরিণত করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, “আমাদের আশঙ্কা হলো কাউন্সিলের মতামত না নিয়েই আমাদের জমি শিল্পপতি বা সেনাবাহিনীকে এখন দিয়ে দেয়া হতে পারে।”

এ ধরনের আশঙ্কা আর উদ্বেগের প্রেক্ষিতে লাদাখের অধিবাসীরা এখন সাংবিধানিক নিরাপত্তা চাচ্ছেন। 

গত মাসে বিজেপির লেহ শাখা অনেকটা অবাক করে দিয়ে এলএএইচডিসিতে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন, যেখানে স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান, জমির অধিকার, ব্যবসায়, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষার দাবি জানানো হয়েছে। 

তারা বলেছেন, ভারতীয় সংবিধানের সিক্সথ শিডিউলের অধীনে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই আইনে দেশের উপজাতিদের বিশেষ অধিকার দেয়া হয়েছে। অথবা ৩৭১ অনুচ্ছেদ সম্প্রসারিত করতে হবে, যেখানে মূলত ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের উপজাতীদের জন্য কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী লাদাখের জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশই হলো উপজাতি। 

লেহ বাজরে একটি মসজিদ (সাদা গম্বুজওয়ালা)। লাদাখের জনসংখ্যার ৪৬.৪ শতাংশ মুসলমান

লেহ বাজরে একটি মসজিদ (সাদা গম্বুজওয়ালা)। লাদাখের জনসংখ্যার ৪৬.৪ শতাংশ মুসলমান

কারগিলের ভিন্ন গল্প

লেহতে যখন সিক্সথ শিডিউল এবং অন্যান্য সাংবিধানিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে দাবি যথেষ্ট গতি পেয়েছে, তখন এ অঞ্চলের কারগিলে আন্দোলনের প্রতি কোন সমর্থন দেখা যাচ্ছে না। 

ভারতের মধ্যে যদিও এই ধারণা রয়েছে যে, কাশ্মির মূলত মুসলিম প্রধান অঞ্চল, তবে এ অঞ্চলের মধ্যে জম্মুতে হিন্দুদের এবং লাদাখে বৌদ্ধদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। লাদাখের জনসংখ্যার মধ্যে বৌদ্ধ ৩৯.৭ শতাংশ এবং হিন্দু ১২.১ শতাংশ। 

অন্যদিকে লাদাখে মুসলিমরা হলো জনসংখ্যার ৪৬.৪ শতাংশ, যাদের একটা বিরাট অংশ হলো শিয়া। 

গত বছর কারগিলে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল লাদাখ আলাদা হয়ে গেলে মুসলিমদের দাবি সেখানে গ্রাহ্য করা হবে না। 

কারগিলের সাবেক এমপি এবং জেলার স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের দুইবারের চেয়ারম্যান আসগর আলী কারবালাই আল জাজিরাকে বলেন, লেহ’র বৌদ্ধরা সিক্সথ শিডিউল বা সাংবিধানিক নিরাপত্তার যে দাবি জানাচ্ছে, কারগিল সেটাকে সমর্থন করবে না। 

কারবালাই বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কোন অধিবাসী আইন বা কোনকিছুরই পক্ষে নয়। আগে লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দিতে হবে।”

‘বিকেন্দ্রীকরণের চেয়ে কেন্দ্রীকরণ বেশি’

সম্প্রতি লাদাখে সিক্সথ শিডিউল বাস্তবায়নের দাবিতে লেহর বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংগঠন একজোট হয়ে এগিয়ে এসেছে। 

২২ সেপ্টেম্বর এই গ্রুপ একটি প্রস্তাব পাস করে। সিক্সথ শিডিউলের অধীনে তাদের সাংবিধানিক নিরাপত্তা ঘোষণা দেয়া না হলে ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য লাদাখের কাউন্সিল নির্বাচন বয়কটের হুমকি দিয়েছে তারা। 

পিপলস মুভমেন্টের প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে লেহর উত্তেজনা কমানোর জন্য সেখানে সিনিয়র বিজেপি নেতা রাম মাধবকে পাঠাতে বাধ্য হয় নয়া দিল্লি। 

কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বর বনধ ডেকে লাদাখে মাধবকে স্বাগত জানানো হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি নেতা অশোক কাউল পিপলস মুভমেন্টের প্রস্তাবকে ‘ননসেন্স’ হিসেবে মন্তব্য করার কারণে ওই বনধের ডাক দেয়া হয়। 

আল জাজিরার সাথে আলাপকালে কাউল দাবি করেন যে, লেহ’র মানুষ গত বছরের সিদ্ধান্তে ‘খুবই খুশি’ এবং সামান্য কিছু মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। 

তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার আশ্বাস দিয়েছে যে, লাদাখের সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে যেটা হবে সিক্সথ শিডিউলের চেয়ে বেশি।”

রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক সিদ্দিক ওয়াহিদ আল জাজিরাকে বলেন যে, লাদাখের মানুষ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের দাবি জানিয়েছে তবে একই সাথে তারা নির্বাচিত আইনসভারও দাবি জানিয়েছে। 

তিনি বলেন, “লাদাখের মানুষ যে বিষয়টিতে অবাক হয়েছে, সেটা হলো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বলতে তারা যেটা ভেবেছিল, বাস্তবে সেটা তারা দেখছে না। এখানে বিকেন্দ্রিকরণের চেয়ে কেন্দ্রীকরণ হয়েছে বেশি।”

কাশ্মিরের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক শেখ শওকত আল জাজিরাকে বলেন, “লাদাখের মানুষ ভেবেছিল তারা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পেলে নিজের ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব পাবে। কিন্তু এটা তাদের কাছে দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে, কারণ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ক্ষমতা খুবই সামান্য এবং এখানকার অধিকাংশ সিদ্ধান্তই নেয়া হয় নয়া দিল্লিতে।”

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]