প্রতিরক্ষা
মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত
মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত





এশিয়া টাইমস
Monday, Oct 5, 2020, 3:00 pm
Update: 05.10.2020, 3:01:26 pm
 @palabadalnet

মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স

মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স

১৯৮৮ সালের নভেম্বরে ভারত যখন প্রতিবেশী মালদ্বীপে প্যারা-কমান্ডোদের একটি ব্যাটালিয়ন পাঠিয়েছিলো, তখন হস্তক্ষেপকারী সেনাদেরকে দ্বীপের অধিবাসীরা মূলত স্বাগতই জানিয়েছিল। 

মালদ্বীপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুমকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য শ্রীলংকা-ভিত্তিক মালদ্বীপের এক ব্যবসায়ী ভাড়া করা সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মালদ্বীপে হামলা করেছিল। ‘ক্যকটাস’ নামে পরিচিত ভারতের ওই অভিযানের মাধ্যমে গাইয়ুমের ক্ষমতা রক্ষা পায় এবং বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মালদ্বীপের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। 

আর বর্তমান পরিস্থিতিতে মালদ্বীপের নাগরিকরা দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেছে। ভারতীয় সেনারা যাতে শর্তহীনভাবে এখনই দ্বীপ ছেড়ে যায়, সে জন্য দাবি উঠতে শুরু করেছে। 

দ্বীপে ভারতীয় সেনাদের উপস্থিতিকে মালদ্বীপের নাগরিকেরা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং এটা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় এবং রাজপথে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ভারতবিরোধী মনোভাবও চরম বেড়ে গেছে এবং সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে #ইন্ডিয়াআউট হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে পড়েছে। 

১২ সেপ্টেম্বর মালদ্বীপের প্যাট্রিওটিক ইয়ুথ মুভমেন্ট শান্তিপূর্ণ মোটরবাইক র‍্যালি বের করে। সাম্প্রতিককালের মধ্য এটা এ ধরনের দ্বিতীয় র‍্যালি। মালিদ্বীপের মাটিতে ভারতের সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে এই র‍্যালি বের করা হয়। 

শত শত তরুণ এবং কলেজ শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। সরকারের কোভিড-১৯ নীতিমালা অনুসরণ করেই এটা করা হয়েছে। পুলিশ অবশ্য বিক্ষোভকারীদের উপর দমন চালায় এবং নারী ও পথচারীসহ ৪১ জনকে গ্রেফতার করে। 

প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহের অধীনে এ রকম হওয়ার কথা নয়, যিনি ২০১৮ সালে ৫৮.৪% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত সোলিহ নির্বাচনে আব্দুল্লাহ ইয়ামিন আব্দুল গাইয়ুমকে পরাজিত করেন, যিনি চীনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু ঘটনার কারণে ভারতবিরোধী ক্ষোভ উসকে উঠেছে। 

এর মধ্যে রয়েছে মালদ্বীপে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপসহ মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বলপূর্বক হস্তক্ষেপের জন্য ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির প্রকাশ্য প্রচারণা। 

আগের ইয়ামিন সরকারের সময় দ্বীপে ভারতের ডোর্নিয়ার নৌ নজরদারি বিমান মোতায়েনের জন্য মালদ্বীপ সরকারকে দিয়ে ভারত জোর করে ‘লেটার অব এক্সচেঞ্জ’ লিখিয়ে নিয়েছিল বলে যে ধারণা রয়েছে, সেটিও ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভের একটা কারণ। 

তাছাড়া ২০১৮ সালে মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ নাশিদ মালদ্বীপের মাটিতে ভারতকে সেনা মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে তারা জরুরি অবস্থা বাতিল করে রাজনৈতিক বন্দীদেরকে মুক্তির ব্যবস্থা করে। তার সে ঘোষণাও ভারত-বিরোধী আগুন জোরালো করেছিল। 

বর্তমান নেতা সোলিহ একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন, যেটা অনুসারে মালদ্বীপে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত বিষয়ে ভারতীয় আদালতের রায় প্রযোজ্য হবে। 

এই চুক্তির কারণ হলো মালদ্বীপ যাতে অবকাঠানো উন্নয়নসহ অন্যান্য চুক্তি আগেই বাতিল করে না বসে। এর আগে মালদ্বীপ প্রশাসনে পরিবর্তনের সাথে সাথে এমনটা ঘটেছে। 

এর পরও, ভারত মালদ্বীপে তাদের কৌশলগত অবস্থানটা হারাতে চায় না। এর একটা কারণ হলো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সাথে তাদের প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। 

মালদ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা গ্রিডের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। দুই দেশ যৌথ রেডার নেটওয়ার্ক, মহড়া সক্ষমতা ও সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। 

দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে হুমকি চিহ্নিত করা এবং প্রতিকারের সক্ষমতার জন্য ভারত মালদ্বীপে স্থায়ীভাবে দুটো হেলিকপ্টার ও একটি ডোর্নিয়ার নজরদারি বিমান মোতায়েন রেখেছে। 

কিন্তু ভারতের নজরদারি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন, এবং এগুলো পরিচালনার জন্য মোতায়েন ভারতীয় সেনা ও সরঞ্জামাদির বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে মালদ্বীপ। এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ছড়িয়েছে যে, মালদ্বীপের কিছু অংশকে ভারত নিজেদের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। 

তবে এমনটা সবসময় ছিল না। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাকটাস অভিযানে প্যারাশুট নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিনোদ ভাটিয়া। তিনি বললেন, ১৯৮৮ সালে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপারে মালদ্বীপে একটা সুধারণা ছিল। 

ভাটিয়া বলেন, “এক বছরের মতো মোতায়েন থাকাকালে আমরা সঠিক আচরণের মাধ্যমে, তখনকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি সার্ভিসকে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে এবং নিজেদের উপস্থিতিকে নিম্ন পর্যায়ে রাখার মাধ্যমে মালদ্বীপের মানুষের সুধারণা অর্জন করেছিলাম। তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনটা নিশ্চিত করেছিলাম আমরা”।

তবে, মালদ্বীপের সাবেক এক সরকারী কর্মকর্তা বলেন, ভারতের সামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে হতাশার গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। 

তিনি বলেন, যে, ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ সেনা প্রত্যাহারের পর কোন বাইরের শক্তিকেই মালদ্বীপের কৌশলগত কোন দ্বীপের কোন সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থান করতে দেয়া হয়নি। কিন্তু একমাত্র ভারতই তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা অব্যাহত রেখেছে। 

মালদ্বীপের একজন বিমান পরিচালনা বিশেষজ্ঞ, যিনি আগে সরকারের সাথে কাজ করেছেন, তিনি এশিয়া টাইমসকে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভারত প্রথম যখন ২০১৩ সালে মালদ্বীপে হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছিল, তখন নয়া দিল্লি সেটাকে উপহার হিসেবে বর্ণনা করেছিল, এবং মালে সে সময় সেটাকে স্বাগত জানিয়েছিল। 

সে সময় মালদ্বীপের পাইলটটা প্রশিক্ষণ না পাওয়া পর্যন্ত হেলিকপ্টারগুলো পরিচালনার জন্য রাজি হয়েছিল ভারতের পাইলটরা।

দেশের পাইলটদের প্রশিক্ষণ শেষ করে ভারতের পাইলটদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের সরকারকে দায়ি করেন সাবেক প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী আদম শরিফ উমার। 

ভারত মহাসাগরে ৮০০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ১০০০ এর বেশি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত মালদ্বীপের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র পথের উপরেই, আর সে কারণেই নয়া দিল্লি আর বেইজিং উভয়ের কাছেই মালদ্বীপের গুরুত্ব অনেক। 

১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ সময় ধরেই ভারতের সাথে সুসম্পর্ক ছিল মালদ্বীপের। চীনের সাথে যোগাযোগের রাস্তাও খোলা ছিল। 

অতি সম্প্রতি চীন মালদ্বীপে বড় অবকাঠামো প্রকল্প নির্মানের মাধ্যমে নতুন পথ তৈরি করে নিয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর সাথে অন্য দ্বীপকে সংযোগকারী বড় ব্রিজও রয়েছে। এসব কারণে সেখানে ভারতের আগের অবস্থানটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। 

মালদ্বীপে এখন যে ভারত-বিরোধী মনোভাব দেখা দিয়েছে, সেটা থেকে বড় কিছু হবে কি না, সেটা এখনও স্পষ্ট না। তবে, এরই মধ্যে গুঞ্জন রটেছে যে, সোলিহের সরকার গোপনে চীনের সাথে সম্পর্ক পুনস্থাপনের চেষ্টা করছে যাতে কোভিড-আক্রান্ত দেশটিকে তারা অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে। 

মালদ্বীপের হয়তো সম্পদের ঘাটতি রয়েছে, তবে ভারত মহাসাগরে চীন আর ভারতের আধিপত্য বিস্তারের গ্রেট গেমের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে কৌশলগত শক্তিটা ঠিকই রয়েছে মালদ্বীপের। 

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]