শিল্প-সাহিত্য
প্রবুদ্ধ মিত্রের গল্প লালারস
প্রবুদ্ধ মিত্রের গল্প লালারস





Saturday, Sep 19, 2020, 12:39 am
Update: 19.09.2020, 12:40:53 am
 @palabadalnet

বাথরুমের দেওয়ালে আটটা পা বিছিয়ে আটকে ছিল এক মাঝারি মাপের মাকড়সা। মনটা যা নিয়ে খিঁচ খিঁচ করছিল সকালে বেরোনোর সময়।

এখন রাত। শুনশান রাস্তা দিয়ে ছুটছে তার কালো বাইক। পাশেই চলছে তার বন্ধু আর একটি বাইকে। দু’‌জনেই দৌড়চ্ছে জোগান দিতে। অর্ডার আছে। ফরমাশমতো সাপ্লাই দেওয়াটা জোগানদারের কাজ। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোম্পানির খ্যাতি। বন্ধু প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোম্পানির। দু’‌জনের মুখের অর্ধেক কাপড়ে ঢাকা। এখন কেউ কারও লালারসকে বিশ্বাস করে না। কিছুদূর সমান্তরালে চলার পর তারা ভিন্ন পথ ধরে। পরস্পরকে জানায়, ‘‌গুড নাইট’‌। 

আব্বাস ফোন করে কাস্টমারের নম্বরে। ফোনের ওপারের নির্দেশমতো সঠিক জায়গায় এসে বেল দিতেই গৃহকর্তা দরজা খুলে তার হাত থেকে অর্ডারের ডিনার প্যাকেটটি নেয়। পাঁচশো টাকার নোট হাতে নিয়ে তিরিশ টাকা ফেরত দিতে হবে বলে পকেটে হাত রাখতেই ওপাশ থেকে শোনা যায়-লাগবে না। রেখে দিন।

কৃতজ্ঞ আব্বাস গৃহকর্তাকে কুর্নিশ করে হাসিমুখে। চারশো সত্তর টাকার বিল ছিল।  প্যাকেটে রাতের খাবারে ছিল নান, চিকেন ভর্তা, স্যালাড। এটাই ছিল শেষ ডেলিভারি আজকের। যা থেকে প্রাপ্ত তিরিশ টাকা ধরে সারা দিনের পকেট টিপসের হিসেব আর বাইকের গতি বাড়িয়ে বাড়িমুখো হওয়ার মাঝে ফোন এল তার। কানে হেডফোন থাকায় ফোনটা সে ধরেছিল। ওপারের কথার জবাবে বলেছিল, ‘‌খাবার চাপা দিয়ে রাখো, দশ মিনিটে ফিরছি।’‌ ঘড়িতে তখন রাত সওয়া বারোটা। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সকালের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। বাথরুমের দেওয়ালে আট পায়ের মাকড়সা!

রাত সাড়ে বারোটার টিভি খবরের হেডলাইনে সে শুনল মৃত্যুভয় আর তা থেকে নিরাপত্তা- এ দুইয়ের মাঝখানে মানুষকে ঘরবন্দি করার হুঁশিয়ারি।

মোট একশো চল্লিশ টাকা আজ সারা দিনের উপরি আয়। এ কথা ভাবতে ভাবতে সে বাথরুমে মুখ–হাত–পা ধোওয়ার সময় খেয়াল করে দেওয়ালের কোণে এতক্ষণে সে তার জাল বিস্তার করে ফেলেছে। এমন মাপা নকশার সৃষ্টি একমাত্র মাকড়সাই করতে পারে। তার লালারসের এমনই গুণ। মানুষের লালারসের যদি এমন সৃষ্টিক্ষমতা হত তাহলে এত ভয় থাকতই না। আব্বাস রাতের খাওয়া সেরে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়।

যাই হোক, উপরির ওপর আব্বাসদের ভরসা করতেই হয়। না করে উপায় নেই। কোম্পানির সঙ্গে তাদের চাকরির চুক্তি ছিল ট্রিপ–প্রতি তিরিশ টাকা ও তেল খরচ। এখন তা পাল্টে হয়েছে দূরত্বের হিসেবে। যত কিমি সারা দিনের সফর তত রোজগার। সারা দিনে কতটা পথ পেরোলে বিধবা মা ও একটি দু’‌বছরের শিশু–সহ চারজনের পরিবার সচল থাকে সেটা একমাত্র আব্বাসই জানে। মাঝে মাঝে সে ভদ্রলোকদের আলস্যকে গোপনে সেলাম ঠোকে। রান্না করার মতো ঘরোয়া অভ্যেস ক্রমশ লুপ্তপ্রায় না হলে তাদের জীবিকার এই ন্যূনতম শিকেটা ছিঁড়ত না।

একুশ দিন কোনও কাজ থাকবে না শোনার পর মাথায় হাত পড়েছিল। 

প্রায় মধ্যরাতে ঘুমিয়ে থাকা দু’‌বছরের টিপুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তানিয়া বলে ফেলে-
একুশ দিন পরে সব খুলে যাবে।
- কী করে জানলে?‌
- তদ্দিনে এটা চলে যাবে।
- এত সহজ নয় তানি।

অনেক রাত পর্যন্ত ওরা জেগে থাকে। আব্বাস রাত করে ফেরার কারণে ওদের কথার অন্য কোনও সময় নেই।

একুশ দিন তালাবন্ধ মানে অন্য সব কিছুর সঙ্গে হোটেল–রেস্তোরাঁর ঝাঁপও বন্ধ। স্মার্টফোনের পর্দায় ওদের কোম্পানির অ্যাপ জানিয়ে দিয়েছে, এই অবস্থায় সবরকম অর্ডার বন্ধ। সে জানে না ফোনের ওপর সামান্য হাতের আঙুল ছুঁইয়ে মুখের সামনে স্বাদ–গন্ধের এই বাহারি আয়োজন হঠাৎ বন্ধ হলে ওদের বাঁধা কাস্টমারদের হেঁশেলে আবার দু’‌হাত ব্যস্ত রাখার পুরোনো অভ্যেস ফিরে আসবে কি না।

ব্যাধি আর কাজ হারানো- এ দুই ভয়ের মধ্যবর্তীতে চলছে এক অবিশ্রান্ত ঘূর্ণি। সেই ঘূর্ণিতে কান পাতলে কাড়ানাকাড়াহীন এক মৃদু পায়ের শব্দ টের পাওয়া যায়। মানুষের ব্যস্ত জীবনে আচমকা কেন শোনা যাচ্ছে তার পায়ের শব্দ, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে শিশুপুত্রকে মাঝে রেখে অনেক রাত পর্যন্ত আব্বাস ও তানিয়া জেগে থাকে। ঘুমোলেও ওই একই শব্দের সঙ্গে যোগ হয় অসংখ্য মানুষের একটানা কাশির আওয়াজ। মৃত্যুর শব্দে যে ভয়, তার কোনও দিন–রাত হয় না।
 
দুই

একুশ দিন পেরিয়ে আরও উনিশ দিন, এরপর আরও চোদ্দো দিনও শেষ হতে চলল। তানিয়ার আশ্বাস মেলেনি। সব কিছু ঠিক হওয়ার বদলে কীভাবে গোলমাল হয়ে যাচ্ছে সব। আব্বাস খুব সকালে উঠে চা করে এক চুমুক দিয়ে ভাবতে থাকে একের পর এক সম্ভাবনার কথা। তার ভাবনায় এক এক করে উঁকি মারে ভয়। দেড় মাস হতে চলল কাজ নেই। রোজ এই সময়ে তার মনে হয় এটা আর একটা কর্মহীন দিনের শুরু। নীল ঝকঝকে আকাশের নীচে কোনও ধুলোর আস্তরণ নেই। এত দূষণহীন পরিবেশেও সে বাইরে বেরিয়ে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে না। তার মুখ ঢাকা থাকবে এক টুকরো আবরণে। কারণ, ব্যাধির ভয়।

তার কুখ্যাত লালারসের কারণে যদি ভবিষ্যতে খাদ্যরসিক ভদ্রলোকেরা তাদের খাবারের জোগান পেতে আগ্রহী না হয়!
সে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ে। খোলা জানলা দিয়ে সকালের আলোয় বাড়ির উল্টো দিকের কদমগাছে তার চোখ চলে যায়। কদম ফুল দেখে তার মনে হয় ভয়ঙ্কর ভাইরাসের মতো তা দেখতে। পাশেই বসেছিল এক বসন্তবৌরি। তার ডাক যে এত মধুর তা আগে কোনও দিন সে উপলব্ধি করেনি।

ততক্ষণে তানিয়া পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

খাবারের হোম ডেলিভারি চালু হচ্ছে।

তানিয়ার কথায় সে এতটাই অবাক ও উত্তেজিত হয় যে, তার খেয়াল থাকে না কখন সে তানিয়াকে কাছে টেনে জাপটে ধরেছে। তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিশ্চিত হতে চায় আব্বাস।

- কে বলল?‌ কোত্থেকে জানলে?‌

খবরের কাগজের নির্দিষ্ট পাতাটা তার দিকে এগিয়ে দেয় তানিয়া।

বেরোনোর আগে সে বাথরুমে লক্ষ করে চুয়ান্ন দিনে তার বেড়ে ওঠা সাম্রাজ্য। দেওয়ালে মাকড়সার নিখুঁত শিল্পে গড়ে ওঠা বিস্তৃত জালে আটকে আছে গোটা কয়েক মৃত্যুচিহ্ন। সেদিনের থেকে আজকের সকালটা তাই অন্যরকম।

দিন পার করে রাতে তার বাইক ছুটছে হু–হু করে। ক্যাশ অন ডেলিভারির বদলে অনলাইন পেমেন্ট হয়ে গেছে। রাত পৌনে দশটার মধ্যে মিক্সড ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন আর প্রন পকোড়া নিয়ে সে দরজায় বেল দেয়। একবারে কোনও সাড়া পাওয়া যায় না। আবার বেল দেয়। এবারেও কেউ দরজা খোলে না। তৃতীয় বার বেল বাজতেই ওপার থেকে ভেসে আসে জনৈকের কণ্ঠস্বর-দরজার হ্যান্ডেলে প্যাকেটটা ঝুলিয়ে দিয়ে যান। আমরা পরে স্যানিটাইজ করে নেব।

আচমকা এরকম জবাবে বেশ থমকে যায় আব্বাস। খদ্দের পরিচিত। খাবারের অর্ডারও চেনা। শুধু অচেনা হয়ে গেছে আচরণ। হ্যঁা, বন্দিত্বের চুয়ান্ন দিন পরে এটাই এখন ‘‌নর্মাল’‌। 
সে গৃহকর্তার আদেশমতো কাজ করে। ডিনারের প্যাকেটটা সযত্নে দরজার হাতলে ঝুলিয়ে দেয়। আজ কত বিল হয়েছিল তা তার খেয়াল আছে। কত ফেরত হত একটা পাঁচশো টাকার নোটে তাও তার মাথায় ছিল। কিন্তু, এখন যে এটাই নব্য স্বাভাবিক। খুশি হয়ে কাস্টমার আর হাত বাড়িয়ে দেবে না। তাকে অভ্যস্ত হতে হবে।

নব্য স্বাভাবিক বা নিউ নর্মালে তার কাজ আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু এখন অনলাইনে বিল মিটিয়ে কাস্টমার নিশ্চিন্ত থাকছে। আব্বাসদের মত বাইরের কারও হাতের ছোঁয়াচের ঝুঁকি থেকে বাঁচতেই এই নয়া ফিকির। এতে উপরি আদায় বন্ধ হওয়ায় ভয় চেপে ধরে তাকে।

ফিরে আসার সময় আব্বাসের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। প্রতিদিনের মতো তার হাতে আর খাবারের গন্ধ সে পাচ্ছে না। বাইক ছুটছে শুনশান রাস্তা ধরে। কী ছিল যেন শেষ অর্ডারের মেনুতে?‌ সে ক্রমশ খেয়াল করে রাইস বা চিকেনের স্বাদ সে আর মনে করতে পারছে না।

বাইকের স্টিয়ারিং চেপে ধরে সে। গত চুয়ান্ন দিনে ভাবনায় কখনও চিকেন ছিল না। ‘‌রাইস’‌ও নয়। স্বাদ ও গন্ধ ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। জিভের স্বাদে যদি ভিন্নতা না থাকে তাহলে লালারস তার চরিত্র বদলাবে। তফাত হবে আব্বাস আর তার কাস্টমারদের লালারসে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে মুখের অভ্যন্তরে নিজের লালারসকে যাচাই করতে। বাইকের অ্যাক্সিলেটারে চাপ দিতেই তার মনের জোর দুরন্ত গতি পেয়ে যায়।

রাতে বাড়ি ফিরেই সে টের পায় আগের চুয়ান্ন দিনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিবেশ। টিপুকে কোলে নিয়ে তার বৃদ্ধা মা ও তানিয়া মুখোমুখি বসে হাসছে। সম্পূর্ণ ভয়ডরহীন। আব্বাস অবাক হয়ে লক্ষ করে এদের মুখনিঃসৃত লালারস থেকে তৈরি হয়েছে এক সুদৃশ্য শৃঙ্খল। 

শাখা–প্রশাখায় বিস্তৃত। দূরত্ব কমিয়ে কাছে যেতেই তার লালারসও যুক্ত হয় ওই শৃঙ্খলে। অনেক দিন পর প্রাণ খুলে সে হাসে বাকিদের সঙ্গে। আব্বাস বুঝতে পারে অর্ধপেটের মানুষের এই শৃঙ্খলটাই সব। তাদের লালারসে তৈরি অপূর্ব এক নকশার জাল।

যে ভাইরাস আসলে ‘‌ভয়’‌, তা নিশ্চিত আটকে পড়েছে সেই জালে। তাদের লালারসের জালে দেখা যাচ্ছে অনেক ভয়ের মৃত্যুচিহ্ন। দেখেশুনে মাকড়সার ঈর্ষা হওয়া অনিবার্য। 


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]