শিল্প-সাহিত্য
আমাদের আব্বা-আম্মা
আমাদের আব্বা-আম্মা





আবদুল মান্নান সৈয়দ
Monday, Aug 3, 2020, 8:15 pm
 @palabadalnet

আমরা যে জগতে মানুষ হয়েছি, এখন মনে হয়, সেটা সেকাল। আমাদের আব্বার ইন্তিকালের পরেও ততটা বুঝিনি যেন। এখন আম্মার মৃত্যুর পর মনে হচ্ছে- একাল আর সেকাল পরিষ্কার দু'ভাগ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে : আব্বা-আম্মা যখন জীবিত ছিলেন, তখনকার আনন্দ-বেদনা ছিল অন্য-কোনো আলোয়-ধোয়া। মনে হতো যেন কোথাও একটা বরাভয় আছে, সান্ত্বনা আছে, একটি বিশাল বৃক্ষের ছায়া আছে। লোকে-যে বলে বাপ-মা'র মৃত্যুতে বৃক্ষছায়া চলে গেল- এখন মর্মে মর্মে বুঝছি তার সত্যতা। বুঝছি আমার পিতামাতার জীবিত যে সন্তানরা আছি, তারা সবাই। 

আমাদের আব্বা আলহাজ্ব সৈয়দ এ এম বদরুদ্দোজা (তিনি এভাবেই নিজের নাম স্বাক্ষর করতেন, পুরো নাম : সৈয়দ আবদুল মজিদ বদরুদ্দোজা, ১৯১০-৮ই নবেম্বর ১৯৮৯) ছিলেন শালপ্রাংশু মহাধ্বজ ব্যক্তি। আর আমাদের আম্মা আলহাজ্ব কাজী আনোয়ারা মজিদ (১৯২০-২৪শে মে ২০০৩) ছিলেন চিরকাল স্লিম। 

আব্বা ছিলেন রাশভারি, নির্জন, অসম্ভব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। আর আম্মা ছিলেন তার একেবারে উল্টো : শান্ত, অসম্ভব সামাজিক, আনন্দময়ী, আব্বাকে দেখে বোঝা যেত তিনি সৈয়দ বংশোদ্ভূত, আম্মাকে দেখে বোঝা যেত তিনি কাজী বশোদ্ভুত। 

দশ ভাই-বোন আমরা। আমরা আব্বা-আম্মার স্নেহ-আদর-ভালবাসা এক-একভাবে পেয়েছি। কিন্তু কারো চেয়ে কেউ কম না। আব্বা বাইরে কঠোর-গম্ভীর-স্বল্পভাষী হলেও ভিতরে ছিলেন শিশুর মতো কোমল। আমাদের কাছ-ছাড়া করতে চাইতেন না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যোগ দেয়ার আহ্বান আসে আমার ১৯৭৪ সালে, আমিও প্রায় রাজি হয়ে যাচ্ছিলাম, আম্মা খুশি, কিন্তু আব্বা বললেন, ‘তুই লেখালেখি করিস, তোর ঢাকার বাইরে যাবার দরকার নেই।' 

পরে বুঝেছি, এই সিদ্ধান্ত আমার জন্য ছিল একেবারে সঠিক। 

এরকম আমাদের প্রত্যেক ভাই-বোনের নিজস্ব স্মৃতি আছে আব্বা-আম্মার প্রতি তাদের ভালবাসার। আমাদের সব ভাই-বোনদের মধ্যে আমাকেই একবার বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন- যদি আমি কোনো সাহিত্যিক দরকারে, যেতে চাই। বাংলাদেশের জন্মের পরে আমাকে ‘মুনীর অপটিমা টাইপরাইটার' কিনে দিয়েছিলেন। আমার লেখালেখির সুবিধের জন্য- যদিও আমি তখন চাকরি করি, বিদ্যাদানের চাকরি করি। আমাদের কোলাহলময় বাড়ির বাইরে- শুধুমাত্র লেখালেখির জন্য- বাগানের মধ্যে একটি নির্জন ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। 

আব্বা ছিলেন অসম্ভব নিয়মনিষ্ঠ। সকালে উঠে বেড-টি, তাছাড়া সকালে-বিকেলে দু'বার দু'কাপ চা, দুপুরে ও রাতে যথাসময়ে আহার এবং সে আহারের আয়োজন যেমন বিচিত্র তেম্নি বিপুল- এই ব্যবস্থা ছিল আব্বার ৭৫- বছর বয়েস পর্যন্ত, যতদিন না তাঁর অসুস্থতার প্রথম প্রকোপ দেখা দ্যায়। তারপর দেখা গেল, আব্বা খাবারদাবারের যে অতিমিত নিয়ম সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন। আম্মা ছিলেন উল্টো। আমাদের নানা-নানীর (কাজী আজীজুল হক/ সৈয়দা (মূলত মীর) নাজমুননেসা) দুই সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। আমাদের মাতামহীরও ছিল পাঠাভ্যাস। তিনিই তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ একটি উপন্যাস নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের আনোয়ারা উপন্যাসের নামে আম্মার নাম রেখেছিলেন। দশ ছেলেমেয়ের মা হয়েও, অসম্ভব পরিশ্রমী হয়েও, আমাদের মাতামহীর ইন্তিকালের আগে পর্যন্ত তাঁর ওপরে পূর্ণ নির্ভরশীল। তাঁদের দশটি সন্তানের বাইরে আব্বা-আম্মার পৃথিবীতে আর কিছু ছিল না। 

কিন্তু আবার আমাদের বাড়ি ছিল সমস্ত আত্মীয়স্বজনের জন্য অবাধগতি। সারাদিন চুলো জ্বলছে, যে কেউ আসছে খেতে বসে যাচ্ছে। প্রায় সবই আম্মার আত্মীয়স্বজন, আব্বার আত্মীয়স্বজনদের কেউ কেউ, আব্বা কারো সঙ্গে তেমন মিশতেন না, কিন্তু আম্মার আতিথেয় অভ্যাসকে কোনদিন বাধা দেননি। আম্মার ব্যবহার ছিল এত আন্তরিক আর হৃদয়স্পর্শী যে, আব্বা চাকরিসূত্রে ঢাকার বাইরে যখন যেখানে থেকেছেন- পাবনায়, কুমিল্লায় বা ফরিদপুরে- সেখানেও আত্মীয়দের ভিড় হতো। এমনকি আমাদের পুরোনো কাজের লোকদেরও। প্রথম বাঙালি-মুসলমান কবি মীর আজিজুননেসার কাছে বাংলা শিখেছিলেন। আম্মা তাঁকে ‘পন্ডিত দাদি' বলতেন। বু (আমার বড় বোন) তাঁকে দেখেছে। অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন।

আব্বা-আম্মার কাছে আমরা শিখেছি সুরুচি আল শালীনতা। কলকাতার টালিগঞ্জে আমাদের পূর্বপুরুষরা থাকতেন। আব্বার মুখে একআধবার শুনেছি। আমার জন্মগ্রাম জালালপুর। তাঁর পাশের গ্রাম সাঁইপালায় ছিল আব্বাদের বসতবাটি। আমাদের এক অগ্রজ চাচাতো বোন এই ভিটে দেখেছেন। তখন বাড়িটির মাত্র কয়েকটি অবশিষ্ট সিঁড়ি ছিল। বাড়িতে আমগাছ, সুপারিগাছ ইত্যাদি গাছ ছিল অনেক। পারিবারিক গোরস্থান ছিল আমাদের। আমাদের সাত-পুরুষের কুরসিনামা আছে আমাদের বড় চাচার (আসলে মেজো চাচা) বাড়িতে। 

আব্বারা ছিলেন ছয় ভাই। এঁদের মধ্যে দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন তিনজন। জাকারিয়া, দাউদ এবং ইয়াহিয়া- তাঁরা সবাই অকলে মৃত্যুবরণ করেন। বাকি তিনজন- খানসাহেব সৈয়দ মোহাম্মদ ইলিয়াস, সৈয়দ মোহাম্মদ জেরজিস (মৃত্যু ১৯৭২) আর আমাদের আব্বা। আব্বা ছিলেন সবচেয়ে ছোট। আব্বার অতি অল্প বয়সে আমাদের দাদা-দাদি মারা যান। দাদা : সৈয়দ মুসাররাত হোসেন, আর দাদি : কুদসিয়া খাতুন। দাদিদের বাড়ি ছিল সাতক্ষীরার বাঁশদহে-সেখানে একবার বেড়াতে গিয়েই তখনকার দিনের এক অনারোগ্য অসুখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন আব্বার বয়স ছিল মাত্র দু'বছর। আমার স্ত্রী রানুর মাতামহ কাজী তৌহিদুননবী সাহিত্যিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর জানাযার নামাযে ইমামতি করেছিলেন। বাঁশদায় অর্থাৎ ইছামতী নদীর এপারে-ওপারে আমাদের স্বজনেরা থাকতেন। আমাদের পরদাদা সৈয়দ মোহাম্মদ ফিরোজ বসিরহাটে সুপ্রচুর বিষয়সম্পত্তি করেছিলেন। আব্বা এঁর প্রতি সশ্রদ্ধ ছিলেন। স্কুলে আমাদের বড় ভাই-বোনের (বোধহয় আমার পর্যন্ত) নামের শেষে ‘ফিরোজী' যুক্ত হয়েছিল, পরের ভাইবোনদের বাদ যায়, আমারও পরে লিখতাম না। সৈয়দ মুসাররাত হোসেন তাঁর পিতার ঐশ্বর্য অতিদ্রুত খুইয়ে ফেলে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। 

আব্বা অল্প বয়সে এতিম হয়ে যান। সেজন্যে এতিমদের জন্য ছিল তাঁর সবসময় দরদ। আলিয়া মাদরাসায় পড়েছেন। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়েছেন। বিএ (অনার্স) পাস করেন। বিষয় ছিল আরবি। আব্বা এমএ-ও পড়েছিলেন, অর্থাভাবে পড়া শেষ করতে পারেননি। আব্বাদের এক নিঃসন্তান চাচা-চাচি তাঁদের অপত্য স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন। আম্মার এক পূর্বপুরুষ ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। আমাদের মাতামহের এক বোন তাঁর নামও জানিয়েছিলেন, এটা আমি টুকে রেখেছি কোথাও। আম্মার কথাই ছিল অনেকটা কবিতার মতো। খাঁটি দেশজ ভাষা। অনেক সুশব্দ সুবাক্য হারিয়ে ফেলেছি। আম্মা ছিলেন অসম্ভব পড়ুয়া। সারাক্ষণ পড়তেন। মোড়ায় বসে রান্না করেছেন আম্মা, এক হাতে খুন্তি, আর-এক হাতে বই- এ দৃশ্য মনে গাঁথা রয়েছে আমার। গভীর সাহিত্যবোধ ছিল। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের বউ গল্পগ্রন্থটি পড়ে আম্মা বলেছিলেন : এ তো আশ্চর্য লেখক, এতগুলো বউ-এর মনের কথা জানল কি করে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর অকালবিয়োগের সংবাদ পড়ে আম্মা বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তো দুঃখী মানুষ। এই দুঃখী মানুষটিকে অনেকে ভুল বুঝেছে। আমাদের বাড়িতে বিষাদ-সিন্ধু (মীর মশাররফ হোসেন), নকশী কাঁথার মাঠ ও সোজনবাদিয়ার ঘাট (জসীমউদদীন) এরকম কিছু বই না থাকলেই আম্মা আমাকে বলতেন কিনে আনতে। 

আম্মাই আমাকে মুসলমান লেখকদের নিয়ে লিখতে বলেন। আব্বা কথাটা একটু অন্যভাবে বলেছিলেন : মুসলমান লেখকরা তাদের লেখকদের নিয়ে আলোচনা করে না। আমি যে বাঙালি-মুসলমান লেখকদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করি, তার প্রধান প্রেরণাদাতা ও দাত্রী আমার আব্বা-আম্মা। আম্মা অনেকদিন আমাকে টিভি নাটক লিখতে বলেছেন, সময় করে উঠতে পারিনি। একবার, যদ্দুর মনে হচ্ছে, পাকিস্তান আমলের শেষদিকে, বাড়ি ফিরতেই আম্মা বললেন : টিভির সাহিত্য-আলোচনায় সবাই দেখি তার নামই বলছে। আমি তখন তরুণ লেখক। স্বভাবতই খুব খুশি মা'র মন! পত্র-পত্রিকায় আমার লেখা কম দেখলে আম্মার মন খারাপ হয়ে যেত। আবার বেশি লেখা দেখলে আম্মা বলতেন- এত লেখার দরকার নেই।

 পড়ার ব্যাপারে আব্বার কিছু অভ্যেস ছিল নিজস্ব। অনেক সময় আব্বা জোরে জোরে পড়তেন। আর একই বাক্য বা অনুচ্ছেদ বারবার আওড়াতেন। আব্বা একবার অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিনুর বই প্রবন্ধগ্রন্থের প্রশংসা করেছিলেন আমার কাছে। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় বাংলা আকাদেমি'র এক অনুষ্ঠানে অন্নদাশঙ্কর রায়কে সেকথা আমি জানিয়েছিলাম। আব্বা সাহিত্য নিয়ে আমাকে দু'তিনবারের বেশি কথা বলেননি। ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা সম্পাদনার সময় কেন-যেন ড্রইংরুম থেকে উঠে গিয়ে, প্রস্তাবক দুই তরুণ সেখানে বসেছিল, আব্বাকে জিজ্ঞেস করতে আব্বা বলেছিলেন : এটা তোর সবচেয়ে ভালো কাজ হবে। 

আব্বা প্রথম যৌবনে উর্দু ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন। এটা আমি জানি আম্মার মারফত। আম্মার মাধ্যমেই আব্বার সঙ্গে কথা হতো আমার অনেক সময়। আব্বা আম্মাকে বলেছিলেন : ও কবিতা লিখবে না কেন, আমি তো একসময় কবিতা লিখতাম- তবে লিখতাম উর্দুতে। আব্বা একবার আমাকে বলেন : গালিব পড়িসনি, কি কবিতা লিখিস? আব্বার শিয়রের কাছে টেবিলে সবসময় গালিবের উর্দু কবিতা সংগ্রহ থাকত- মূলে। আরো ছিল ইকবালের শিকোয়া ও জওয়াবে-শিকোয়া-মূলে। চাকরি-জীবনের শেষদিকে আব্বা ইংরেজি ডিটেকটিভ বই পড়তেন। আব্বার অভ্যেস ছিল ডায়েরি লেখার- বাংলা ও ইংরেজিতে। আব্বার অনেকগুলো ডায়েরি আমার কাছে রয়েছে। 

যৌবনে আব্বা নিজে খেলোয়াড় ছিলেন, মোহামেডান, স্পোর্টিং-এ খেলতেন, বাড়িতে আমরা আব্বার খেলার জার্সিও দেখেছি। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রাবস্থায় আব্বা একবার খেলার জন্য করাচিতে গিয়েছিলেন। ১৯৩১/৩২ সালে ঢাকায় এসেছিলেন একবার ফুটবল খেলতে, আর একবার হকি খেলতে। ফুটবল ক্রিকেট খেলার নাড়িনক্ষত্র জানতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকতেন খেলা দেখার জন্যে। এক সময় খেলার খবর ভালোমতো পরিবেশন করে বলে মর্নিং নিউজ কাগজ রাখতেন। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার ‘ক্রসওয়ার্ড পাজল' নিয়েও একটি আগ্রহ ছিল। এম্নিতে কথা বলতেন না, কিন্তু জ্বর হলে অনর্গল কথা বলতেন। আর জোরে জোরে বারবার আবৃত্তি করতেন ‘বালাগাল উলা বিকামালিহি/কাশাফুদ্দুজা বিজামালিহি/হাসিনুত জামিয়ু খিসালিহি/ সাল্লু আলায়হি ওয়া আলিহি।' এভাবেই শেখ সাদী'র এই অজর-অমর নাতটি মুখস্থ হয়ে যায় আমার। টেলিভিশন নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখতেন, উপভোগ করতেন। একমাত্র তখনই দেখতাম আব্বা হো হো করে হাসছেন। 

আম্মা একবার তাঁর দশ ছেলেমেয়েদের কার কি গুণ আছে সেটা বর্ণনা করেছিলেন। শুধুমাত্র গুণ। আব্বা একবার পাবনা থেকে পাঠানো আম্মাকে লেখা চিঠিতে তাঁর দশ ছেলেমেয়ের বিশেষত্ব সম্পর্কে মজা করে লিখেছিলেন। আমার সম্পর্কে মজা করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেছিলেন ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর।' সেই চিঠির প্রাসঙ্গিক অংশ আম্মা আমাদের পড়ে শুনিয়েছিলেন। 

আমি ছোটবেলা খুব অসুখে ভুগতাম। আব্বা-আম্মা আমার জ্ঞানোদয়ের আগে আমার শরীর ভালো থাকার জন্য মধুপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সপরিবারে গিয়েছিলাম আমরা। খুব স্মৃতির ভিতরে আমার আজো আবছা মনে পড়ে, পাহাড়ের ধূসর ছবি। আরো প্রাণঘাতী নানা অসুখে ভুগি। ফাইভে পড়বার সময় মরণান্তিক টাইফয়েডে ভুগি। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। মনে আছে আমার, আমি যেন গভীর এক শান্তির স্থানে চলে গিয়েছিলাম। আশ্চর্যভাবে ভালো হয়ে উঠে চিরকালের মতো আমার সঙ্গী হলো দু'জন- সিঃসঙ্গতা আর শিল্পসাহিত্যচর্চা। 

সত্তর দশকের শেষদিকে বেশ কয়েক বছর আমাদের বাড়ির ড্রইংরুমে দীর্ঘ সাহিত্যিক আড্ডা হতো। আব্বা কোনোদিন সেখানে আসেননি। শুধু ১৯৭৬ সালে ২৯ আগস্ট ড্রইংরুমে এসে বললেন,তোরা শুনেছিস নজরুল ইসলাম মারা গেছেন। টিভিতে বলল এইমাত্র। আব্বা কবি নজরুলের জানাযার নামাযে শরিক হয়েছিলেন। 

আমার ছোট ভাই-বোনের কাছে, আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে আব্বা অনেক খোলামেলা হয়ে গিয়েছিলেন। রোজার দিনে ইফতারের সময় টেবিলে বা মেঝতে দস্তরখান বিছিয়ে সম্রাটের মতো বসতেন। নাতি-নাতনি সমেত। ঈদের দিন গাড়িতে নাতি-নাতনি নিয়ে মেয়েদের বাড়িতে যেতেন। আম্মা তো বরাবর একইরকম। আম্মা নাতি-নাতনির বিয়ে, এবং তাদের সন্তানও দেখে গেছেন। আমাদের অতিপরিচিত আব্বা-আম্মা যখন একসঙ্গে হজ্ব করতে গেলেন, তখন তাদের সাদা পোশাকে মনে হয়েছিল অচেনা। ফিরে এলেন যখন, তখন আবার আমরা আমাদের চেনা আব্বা-আম্মাকে ফিরে পেলাম। 

আজ ছায়া সরে গেছে মাথার উপর থেকে। কিন্তু সরে গেছে কি? আমাদের দশ ভাইবোন-সৈয়দা সালমা হোসেন, সৈয়দ আবদুল মঈন, সৈয়দ এ মমিন, আমি সৈয়দা নার্গিস আলি, সৈয়দা শিরিন কবির, সৈয়দ আবদুল মাবুদ, সৈয়দ আবদুল মাসুদ, সৈয়দা শাহিন খালেদ আর সৈয়দ আহমদ মাসুম- আমাদের ভাইবোনদের কাছ থেকে আব্বা-আম্মার বৃক্ষছায়া কখনো সরেনি। সরতে পারে না। আমরা আজো ঘননিবিড় একটি সবুজ গাছের ছায়ার নিচে বসে আছি।

(আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্মদিন আজ। ৩ আগস্ট ১৯৪৩। ইন্তেকাল করেন  ৫ সেপ্টেম্বর ২০১০। বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্য-সম্পাদক। কলেজে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’ ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর ষাট দশক থেকে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে তার গবেষণাধর্মী অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশের ওপর তার উল্লেখযোগ্য গবেষণা কর্ম রয়েছে। তিনি  ফররুখ আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে,  সমর সেন,  বেগম রোকেয়া,  আবদুল গনি হাজারী,  মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, প্রবোধচন্দ্র সেন প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদককে নিয়ে গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যমহলে তিনি 'মান্নান সৈয়দ' নামেই পরিচিত ছিলেন।)


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]