মতামত
বাংলাদেশে সহিংসতা নিয়মিত ও বৈধ হয়ে উঠেছে যেসব কারণে
বাংলাদেশে সহিংসতা নিয়মিত ও বৈধ হয়ে উঠেছে যেসব কারণে





আফসান চৌধুরী
Tuesday, Jan 14, 2020, 1:04 pm
 @palabadalnet

ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের খবরটি মিডিয়ার পূর্ণ মনোযোগ পেয়েছে। মেয়েটি বাড়ি যাওয়ার পথে বাস থেকে ভুল বাস স্ট্যান্ডে নেমে পড়েছিল। হতভম্ব মেয়েটি এক ‘সিরিয়াল ধর্ষকের’ নজরে পড়ে যায়, যে তাকে টেনে হিঁচড়ে ঝোপের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। হতভাগা মেয়েটি পরে কোন রকমে এক বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছায় এবং পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই দিন পর ধর্ষক গ্রেফতার হয়। কর্তৃপক্ষের মতে সে একজন ‘সিরিয়াল ধর্ষক’। রাস্তায় ফেরি করে বেড়ায় এবং এর আগে অনেক বার সে মেয়েদের শিকার করেছে। ধর্ষণের ব্যাপারে মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে বিশাল, যে কারণে বিষয়টি বিশদভাবে খতিয়ে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষের উপর চাপ অনেক বেড়ে গেছে।

মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে চার্জ গঠিত হয়

বৈশ্বিক বিচারে বাংলাদেশের যৌন নির্যাতনের পরিস্থিতি উচ্চ পর্যায়ে যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশ সম্ভবত ধর্ষণ করার জন্য পৃথিবীর নিরাপদ জায়গাগুলোর একটি। খুব অল্প মানুষই এখানে সাজা পেয়েছে এবং মামলায় সংখ্যাও নিতান্তই সামান্য। ধর্ষণের সাথে যখন খুন হয়, তখন মামলার সংখ্যা হয় আরও কম।

“মামলাগুলোর ফলো আপ করার মতো কেউ নেই। পরিবারগুলোর সামর্থ থাকে না মামলাগুলো এগিয়ে নেয়ার। আইন প্রয়োগকারীদের হাতে আরও বহু মামলা রয়েছে এবং কোন চাপ বা অনুপ্রেরণা থাকায় তারা মামলা বাতিল করে দেয়”, এভাবেই পরিস্থিতির পর্যালোচনা করলেন বহু দিন ধরে ধর্ষণ আর অপরাধের সংবাদ সংগ্রহকারী এক সাংবাদিক।

ধর্ষণের ঘটনাগুলো নিয়ে যারা কাজ করে সেই ট্রাইব্যুনালগুলোর দেয়া তথ্য মতে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে চার্জ গঠিত হয়। এই মামলাগুলো দেখাশোনা করে উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন রিপ্রেশান প্রিভেনশান ট্রাইব্যুনাল। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় বলে জানালেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ড. আয়েশা আফরোজ চৌধুরী।

পরিবারগুলোই বড় অত্যাচারী

একটা সমস্যা হলো ভুক্তভোগী নারীর পরিবারের মধ্যে এবং পরিচিতদের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা অস্বীকারের প্রবণতা। তাছাড়া অনেক ঘরের মধ্যেই শিশু গৃহকর্মীরা ধর্ষিত হচ্ছে কিন্তু সেগুলো নিয়ে কোন রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে না।

তবে, মানুষের আসল আগ্রহ হলো প্রকাশ্য ধর্ষণের ব্যাপারে। সে কারণে, বন্ধ ঘরে এবং ব্যক্তিগত অঙ্গনে ঘটে যাওয়া বহু যৌন নির্যাতনের ঘটনা অজানাই থেকে যাচ্ছে এবং সেখানে সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া নারীদের যৌন নির্যাতনের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার কারণে পুরুষ নির্যাতনকারীরা নিরাপদে থেকে যাচ্ছে।

প্রকাশ্যে ধর্ষণের ঘটনায় জনগণ ক্রুদ্ধ হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঘটনাগুলো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে না, কারণ এ ধরনের ঘটনাগুলোকে গোপনীয় বিবেচনা করা হয়। ফলে সামাজিক রীতির আড়ালে যৌন নির্যাতনকারীরা এক ধরনের সুরক্ষা পেয়ে আসছে।

এর ফল হলো প্রচুর আলোচনা, প্রকাশ্য বিক্ষোভ সমাবেশ এবং সোশাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশের পরও ধর্ষণের ঘটনার উপর কোন প্রভাব পড়ছে না বা খুবই সামান্য প্রভাব পড়ছে আর অভিযুক্ত হওয়ার ঘটনাতো আরও কম। এমন কোন তথ্য-প্রমাণ নেই যে ধর্ষণের ঘটনা হ্রাস পাচ্ছে।

সহিংসতার অনুমোদন

সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনাগুলোর ব্যাপারে জনগণের প্রতিক্রিয়া বেশ তীব্র হয়েছে এবং অনেকেই সহিংসতাকে শাস্তি হিসেবে প্রস্তাব করছে। সোশাল মিডিয়া বিস্ফোরক মন্তব্যে ভরে গেছে যেখানে পুরুষত্বহীন করে দেয়া, পাথর মেরে হত্যা, ধর্ষণ করে হত্যা এবং এ ধরনের সহিংস শাস্তির কথা বলা হচ্ছে। ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারে হত্যার বিষয়টি এখন খুবই স্বাভাবিক এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে এবং কাঙ্ক্ষিত শাস্তির তালিকার শীর্ষে রয়েছে এটা। ফল হলো: বাংলাদেশের সমাজ সাধারণভাবে খুবই সহিংসতা-প্রবণ হয়ে উঠেছে।

বেশ কিছু গবেষণাতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এখন খুবই বেশি। অনেকেই প্রকাশ্যে চলাচলের ব্যাপারে শঙ্কিত এবং যাদেরকে এটা করতে হয়, তারা চরম উদ্বেগের মধ্যে থাকে। ফলে হিজাব, নিকাব ও বুরকার মতো পোষাকের ব্যবহার বেড়ে গেছে, যেটা নারীদেরকে শিকারীদের চোখ থেকে লুকিয়ে রাখে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, অধিকাংশ মানুষ সামাজিক ও জনতার পিটিয়ে হত্যার মতো বিষয়গুলোকে সমাধান মনে করছে। জনগণের মধ্যে সহিংসতার অনুমোদের বিষয়টি খুবই পরিস্কার। তবে অধিকাংশ সহিংস ঘটনা ঘটে প্রাইভেট পর্যায়ে, কিন্তু এটা মূলত সাধারণের নজরের বাইরেই থেকে যায়।

সহিংসতা কি প্রতিরোধক?

এমন কোন প্রমাণ নেই যেখানে দেখা গেছে সহিংসতা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। তবে, বাস্তবতা হলো সামাজিক ও ব্যক্তিগত অপরাধের মাত্রা বেড়ে গেছে, ব্যবস্থাপনা মেকানিজম দুর্বল, এবং এখানে সহিংস মেকানিজমের উপরে সামাজিক ও জনগণের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এর চুড়ান্ত ফল হলো সমাজ ব্যাপকভাবে এমন এক দিকে যাচ্ছে যেটি দাঁড়িয়ে আছে সহিংসতা বিনিময়ের মাধ্যমে।

অন্যভাবে বললে সহিংসতা একটি কাঠামোগত ফ্যাক্টর কোন ঘটনানির্ভর সমস্যা নয়, যেটা সমাজবিরোধী অপরাধী ও বিপথগামীরা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা একটা সমন্বিত বিষয়, যেটার সাথে সবাই যুক্ত।

এটা রাষ্ট্রের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছে। অপরাধ দমন অভিযান নিয়ে সরকার কতদূর যেতে পারবে, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। সম্প্রতি যে জুয়ার আখড়া বিরোধী অভিযানের প্রচারণা শুরু হয়েছিল, সেটি এখন থমকে গেছে এবং কিছু ক্যাসিনো মালিক এখন প্রকাশ্যেই চলে এসেছে। দুর্নীতি-দমন অভিযান এখনও স্থবির হয়ে আছে এবং ব্যাংকগুলোও ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুঁজি বাজার কখনও স্বচ্ছতা দেখায়নি এবং ক্ষতির অঙ্ক যে বিলিয়নের দিকে যাচ্ছে, সেটাও তারা দেখায় না। মনে হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরগুলোর সেভাবে কাজ করছে না, যেভাবে সেগুলোর করার কথা, এমনকি বাংলাদেশের ঢিলেঢালা স্ট্যান্ডার্ডেও সেগুলো চলছে না।

তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি

বখতিয়ার নাজমুল হুদা নামের এক গবেষক – যিনি এখন অস্ট্রেলিয়াতে আছেন – তিনি ধর্ষণের ঘটনা এবং সহিংসতার প্রচার নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন: “জনগণ এখন আর বিদ্যমান সহিংসত বিচার ব্যবস্থার উপর বিশ্বাস বা ভরসা করতে পারে না, যেটা দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা আক্রান্ত। সে কারণে বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে জনগণ তাৎক্ষণিক বর্বর তৃপ্তি পেতে চায়”।

বাস্তবতা যদি সেটাই হয়, তাহলে বাংলাদেশ একটা সিস্টেমেটিক পতনের মুখোমুখি হয়েছে, যেখান থেকে সহসাই মুক্তি মিলবে না। সরকারের বহুল প্রচারিত মাদক-বিরোধী প্রচারণা ছিল বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উপর নির্ভরশীল, যেটা অব্যাহতভাবে চলছে। কিন্তু মাদকের প্রাপ্যতার উপর সেটা কোন প্রভাব ফেলেনি। আর বিচার বহির্ভূত হত্যার ব্যাপারে জনগণের অনুমোদনের মাত্রাও কমেনি। সহিংসতা নিজেই বাংলাদেশের ‘প্রধান সিস্টেম’ হয়ে উঠছে।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

আফসান চৌধুরী: বিশিষ্ট সাংবাদিক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]