বুধবার ২২ জানুয়ারি ২০২০ ৯ মাঘ ১৪২৬
 
শিল্প-সাহিত্য
অলীক মানুষ
অলীক মানুষ





জগন্নাথদেব মন্ডল
Thursday, Dec 26, 2019, 12:51 am
 @palabadalnet

এক.

বকুলতলার ডাকাতি কালীর মন্দির ছাড়িয়ে আরও এগোলে মেয়েদের ইস্কুলের পিছনে ছাতিমের বন। তার পর বন তফাতে রেখে নাক বরাবর হাঁটলেই কাজিপাড়া শুরু। রোদের ভিতর রেলফটক দেখা যায়, চিকচিক করে।

এই ফটকের ধারেই খেজুর পাতায় ছাওয়া আমিনা মাসির বাড়ি। সে গরিব মহিলা, একা একা থাকে, সে অলীক দৃশ্য দেখতে পায় মাঝরাত থেকে ভোর অবধি, তাঁকে জিনে ধরে। রাতে চাঁদ যখন স্তব্ধ পুকুরের একেবারে মধ্যে ভাসে তখন সে দ্যাখে হিঁদুদের এক দেবী ঢেঁকি ঘাটে রেখে জলে নামে, তার পর চুল খুলে উকুন বাছে একা একা। গুনগুন করে গান গায়, কাঁদে। স্ফটিকের গাভি এসে নীল দুধে ভিজিয়ে দেয় ঢেঁকি।

মাসি ভোরে বাড়ি ফিরে বাটিভর্তি আখের গুড়ের চা খেতে খেতে এই আশায় বুক বাঁধে যে তিন দিন হল হিঁদুদেবী দেখছি, এইবার সরকার নিশ্চয় আমাকে ইঁটের দালান দিয়ে দেবে। পাকা ঘরে শোবো। দাওয়ায় এখন দু’টি মুরগি ঘুরছে। কালো মোষ এসে জল খায় নালায়। ঝিঙেফুল দোলে হাওয়ায়। নীল মশারিতে ছাওয়া কবরখানা আলো করে থাকে তিনটি খেজুরের ডাল।এই কবরখানার পাশ দিয়ে সাকিনাবিবি এসে আমিনাকে জানিয়ে যায়, সরকার থেকে নাকি বলেছে এই কাজিপাড়া থেকে বহু দূরে উঠে যেতে হবে সকলকে। ’৭১ সালের আগেকার দলিল কেউ যদি দেখাতে পারে তবেই সে থাকতে পারবে।

সাকিনা পাটখেতের ভিতর দিয়ে বাড়ি ফিরে যায় একা একা, আকাশ তখন পানাফুলের মতন শান্ত ও স্তব্ধ।মাসি সাকিনাকে বিশ্বাস করে অন্ধের মতন। মাসির হাতে স্টিলের বাটিতে মুরগির ডিম ছিল চারটে, সেগুলো সে রাগে ছুড়ে ফ্যালে। ডুকরে কেঁদে ওঠে। ক্ষোভে তিনবার লাথি মারে মাটির উনুনে। আঙিনা জুড়ে থকথকে হলুদ কুসুম ছড়িয়ে যায়। ভাঙা উনুন। ঘোড়ানিম গাছ থেকে পাতা ঝরে। মাসির কাচের চুড়িপরা হাত কপাল আঘাত করে, তার পর বলে- হায় আল্লা! আল্লা গো, আমি কুথায় যাব? মোর অক্ত দিয়ে তৈরি বাড়ি আমি ছাড়ব ক্যামন কইরে? দালানে থাইকবো যে আমি। ও ফজরের বাপ রে, তু কবর থেইকে উঠে এইসে দলিল খুঁইজে দে রে...

শেষ দুপুরের বুনো ঝোপ থেকে গন্ধ ওঠে। কান্না খানিক ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে এসেছিল মাসির। আবার চটকা ভেঙে নাল ভরা মুখে শুরু হয় ক্রন্দনবিলাপ- তু ক্যানে আমারে এই খারাপ খবর দে গেলি? ওরে ভাতারখাগি সাকিনা রে, ওরে নাংলাচানি মাগি রে...আজ বিকেলের পর থেকে জিন এসে দাঁড়িয়ে আছে বেড়ার ধারে যেখানে পোঁতা আছে ছাগলের গর্ভফুল। জিন আজ ভয়ে এগোতে পারছে না মাসির দিকে। হাঁসের ছাগুলো সন্ধ্যাবেলার জল থেকে উঠে লি লি করে কাঁপছে। আমিনা তাদের ঘরে তুলতে ভুলেছে। নামহারা ফুল ফুটছে। কার্তিকমাসের ঘরছাড়া হাওয়া বইছে এ মাথা থেকে ও মাথা...

দুই.

আমাদের বাড়ির বেড়াল ছা নিয়ে চলে গ্যাছে দূরে। কিছু দিন পরে নাকি শ্রীকৃষ্ণ কলোনির সকলকেই জামা, ধুতি, কাঁসার থালা গুছিয়ে চলে যেতে হবে বাংলাদেশে। এই ভয়ে রাতের বেলায় চায়ের দোকানের বাঁশে চুপিচুপি গলায় দড়ি দিয়ে মরল গিয়াস চাচা। ওদের বাড়ি এখন শোকের বাড়ি হয়ে আছে। শরৎকাল সেখানে ঢোকেনি। আশ্বিনের আকাশ মেঘে ছেয়ে অন্ধকার এখন। চাচার পোষা মোরগটি ইচ্ছে করে ভিজছে বাঁশবনে। কুয়ো থেকে কেবলই আনমনে উদাস ভঙ্গিতে জল তুলে চলেছে লক্ষ্মী মাওইমা। ওদের শিউলিগাছ এবার ফুলহীন। মাওইমার পেতলের চুড়িতে ক্ষয়ে আসা সেফটিপিন। ওনার বাড়ি ছিল বরিশালে। এখন কেবল জল তোলার একটানা শব্দ।

আমার সত্তর বছরের মেজদাদু আজ পুজোয় বসেছেন এই ভিটে থেকে যাতে ঠাঁইনাড়া না হতে হয় তার কামনায়। আতা-ক্ষীর দিয়ে দেবীমূর্তি গড়া হয়েছে, দুটো কুঁচফল লেগেছে, একটা রাজহাঁসের ডিম, সন্ধ্যায় বউনি হওয়া দোকান থেকে খরিদ করা পানসুপারি, আর অপরাজিতার ১০৮টি ডাল। হোম হবে। কেউ এই পুজো দেখতে পাবে না। দরোজা বন্ধ।

আমি মন্দিরের গায়ে কান লাগিয়ে শুনি দাদু কাঁদছেন। বলছেন- মা, পাটকাঠির মতন দেহ লইয়া আমি কই যামু? এই বাড়ি আমি ছাড়ুম না কিসুতেই। চক্ষু দুইখান তরে উপড়াইয়া দিমু, আমাগো সিন্দুকে একাত্তর সালের আগেকার নথি আইনা দে তোর অলৌকিকে। এ কোন সাউয়ামারানির দ্যাশে জনম দিছিস মা। আমাগো বাঁচা! মা মা রে। এরপর বুঝতে পারলাম দাদু কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে মন্দিরের ঠান্ডা মেঝেয়। এমনি সময়ে ধানখেত পার করে, জিওল গাছের পাশ দিয়ে, মঠ, কাজিপাড়া পেরিয়ে টর্চ হাতে মৃত্যুসংবাদ দিতে আসছে কেষ্টদা। সুদেব দাদু কোম্পানিপুকুরে জলে ডুবে মরেছে, ভিটে ত্যাগের আতঙ্কে। কান্নার রোল উঠছে হাওয়ায়, কাল ভোরে মহালয়া!

কলকাতার দৈনিক এই সময় থেকে


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]