মতামত
ট্রাম্পের অভিশংসন ও মার্কিন রাজনীতি
ট্রাম্পের অভিশংসন ও মার্কিন রাজনীতি





মোঃ হাসান তারেক
Saturday, Dec 7, 2019, 1:47 am
 @palabadalnet

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে এখন সবচেয়ে চাপের মুখে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে চতুর্থ প্রেসিডেন্ট হিসাবে অভিশংসন তদন্তের মুখোমুখি এখন তিনি। 

অবশ্য তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের সমালোচনা ও আলোচনার মধ্যেই আছেন। মার্কিন নির্বাচনে তাকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ইস্যু নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলা দুই বছরব্যাপী তদন্ত শেষ হয় গত গ্রীষ্মে। এই ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুরোপুরি এখনও দায়মুক্তি দেয়া হয়নি। 

এই ঘটনা থেকে উত্তরণের আগেই ২৫ জুলাই একটি বেফাঁস টেলিফোন কলকে কেন্দ্র করে আবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে গত ২৫ জুলাই টেলিফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। যেখানে আলোচ্য বিষয় ছিল, আগামী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন প্রত্যাশী জো বাইডেনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য তার ছেলে হান্টার বাইডেনের অতীত ব্যবসার ব্যাপারে তদন্তের জন্য জেলেনস্কিকে চাপ প্রদান। বিরোধীদল ডেমোক্রেটিক পার্টি মনে করছে ট্রাম্প এর মাধ্যমে তার প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। 

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে এখন অভিশংসনের মুখোমুখি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিত্তশালী এই প্রেসিডেন্ট। এই অভিশংসন প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য প্রতিনিধি পরিষদের তিনটি কমিটি তদন্তের কাজ করছে। কমিটি তিনটি হচ্ছে- ফরেন অ্যাফেয়ার্স, , ইন্টেলিজেন্স ও ওভারসাইট। এই তদন্তের অংশ হিসেবে প্রথমে রুদ্ধদ্বার সাক্ষ্য নেওয়া হয়। নভেম্বরে সাক্ষীদের প্রকাশ্য শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে অংশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গর্ডন সন্ডল্যান্ড অভিযোগের সত্যতা স্বীকারের সঙ্গে সঙ্গে আরো এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনসহ আরো কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। অভিযোগ আছে যে, কিভাবে ট্রাম্পের অনুরোধে সাড়া দিতে হবে, সে ব্যাপারে জেলেনস্কিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন এই গর্ডন সন্ডল্যান্ড। 

গর্ডন সন্ডল্যান্ড ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ট্রাম্পকে ব্যাকফুটেই ফেলে দিয়েছে। তাহলে কি অভিশংসিত হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সিনিয়র? 

অবস্থা দৃষ্টে, এরকম মনে হলেও বাস্তবতা কিন্তু তা বলে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, দুইজন রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসন করা হয়েছিল। তবে, কাউকেই অভিশংসনের মাধ্যমে সরানো হয়নি। কারণ, মার্কিন সংবিধান এমনভাবে লেখা যে কোনো রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা কংগ্রেসের পক্ষে খুবই কঠিন। 

মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ দুই, ধারা চারে অভিশংসন সম্পর্কে বলা হয় যে, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সকল অসামরিক কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা উৎকোচ গ্রহণ অথবা অন্যগুরুতর অপরাধ ও অসদাচারণের জন্য অভিশংসিত এবং দন্ডিত হওয়ার কারণে পদ থেকে অপসারণ করা হবে”। 

সবশেষ খবর হলো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট ‘অভিযানের’ গতি আরও বাড়াতে চাইছেন ডেমোক্র্যাটরা। তাদের সাফ কথা, হাতে আর বেশি সময় নেই। গোটা দেশের জন্য ট্রাম্প এতটাই বিপজ্জনক যে, যা করার দ্রুত করে ফেলতে হবে। 

বৃহস্পতিবার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি মার্কিন কংগ্রেসে বলেছেন, ইউক্রেন কেলেঙ্কারিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলি নথিভুক্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হোক। ক্যাপিটল হিলে এক সাংবাদিক বৈঠকে আজ পেলোসি বলেছেন, ‘‘তথ্যগুলি চ্যালেঞ্জ করার কোনো জায়গাই নেই। স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তদন্ত করানোর জন্য ইউক্রেনকে অনৈতিক চাপ দিয়েছেন।’’

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ইমপিচমেন্টের জন্য অভিযোগ নথিভুক্ত করার ক্ষমতা রয়েছে হাউসের বিচারবিভাগীয় কমিটির হাতে। তারা সেটা করে হাউসেই ভোটাভুটিতে ফেলতে পারেন। গোটা হাউস যদি তাতে সায় দেয়, তার পরে তা যাবে হাউস ফ্লোরে। যা থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ট্রাম্পকে ইমপিচ করা শুরু হবে। তার পরেই আসল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সেনেটে। সেখানে শুনানিতে ঠিক করা হবে, ট্রাম্পকে আদৌ পদচ্যুত করা যাবে কি না।

সব দেখেশুনে চুপ বসে নেই রিপাবলিকানরাও। নয়া আক্রমণ শানিয়ে তারা বোঝাতে চাইছেন, প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার জন্য ডেমোক্র্যাটদের তাড়াহুড়ো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তাদের অভিযোগটা কতটা সারবত্তাহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। 

বুধবার ইমপিচমেন্ট নিয়ে হাউসের বিচারবিভাগীয় কমিটির প্রথম শুনানি থেকে বিতর্কের সূত্রপাত। ট্রাম্প কী কী ভুল পদক্ষেপ করেছেন, সে প্রশ্ন থেকে সাত ঘণ্টার শুনানিতে উঠে আসে ট্রাম্পকে তার কাজের জন্য সাংবিধানিক দিক থেকে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। রিপাবলিকানদের প্রবল প্রতিরোধের মুখেও শুনানিতে উঠে এসেছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করে ট্রাম্প যে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেছেন, তা ইমপিচ করার মতোই বিষয়। শুনানিতে চারজন সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞের মধ্যে তিন জনই এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। 

এই বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার মুখ খুলেছেন খোদ প্রেসিডেন্ট। লন্ডনে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন থেকে ফিরে এসেই ডেমোক্র্যাটদের উদ্দেশে তিনি টুইটে লিখেছেন, ‘‘আপনারা যদি আমাকে ইমপিচ করতে চান, তা হলে এখনই করে ফেলুন।’’ তার সংযোজন, ‘‘ইমপিচমেন্ট শুনানির ফলে রিপাবলিকানরা একজোট হয়েছেন। আমরাই জিতব।’’

প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ‘‘নিষ্কর্মা ডেমোক্র্যাটরা হাউসে ঐতিহাসিক ভাবে খুবই খারাপ দিন কাটিয়েছেন। তাদের হাতে ইমপিচমেন্ট করার মতো কোনো মালমশলা নেই, দেশকে ছোট করে চলেছেন ওরা। কিছুতেই কিছু এসে যায় না ওদের। ওরা পাগল হয়ে গিয়েছেন। তাই বলছি, যদি আমাকে ইমপিচ করতে হয়, দ্রুত করে ফেলুন। যাতে আমরা সিনেটে একটা স্বচ্ছ বিচার দেখতে পাই এবং আমাদের দেশ রোজকার কাজেকর্মে ফিরতে পারে।’’

আমেরিকায় বাস্তবে অভিশংসনের প্রয়োগ দেখা যায় কদাচিৎ। প্রকৃতপক্ষেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থায় সরকারের তিনটি বিভাগের মধ্যে পারস্পারিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নীতি সুপ্রতিষ্টিত করার জন্য এই অভিশংসন ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়। কংগ্রেস ও মার্কিন রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য এই ব্যবস্থার আর্বিভাব হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগে ১৮৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডু জনসন, ১৯৭৪ সালে ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রির্চাড নিক্সন এবং ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এই অভিশংসন প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হন। এদের মধ্যে রির্চাড নিক্সন নিজেই পদত্যাগ করেন। কিন্তু বিল ক্লিনটন বা অ্যান্ডু জনসন তাদের কাউকেই সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। 

অতএব, অভিশংসন অর্থ এটা নয় যে, এর প্রক্রিয়া শুরু হলেই প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। মোটা দাগে বলা যায় যে, হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভ ও সিনেটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্য সংখ্যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দল ডেমোক্র্যাট পার্টির সদস্য সখ্যার চাইতেও বেশি। ফলে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসন করতে গেলে প্রচুর রিপাবলিকানকে মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষে তাদের নিজ নেতার বিপক্ষে ভোট দিতে হবে। এ কারণে বলা যায় যে, ট্রাম্পেরও অভিশংসন হচ্ছে না। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট মূলত চাইছে আসন্ন মধ্যবতী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জয়ের পথ কণ্টকাবৃত করতে । এই কথা তাই হলফ করে বলা যায় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনটি নেহাত কোনো ছেলেখেলা নয় বরং একটি অলিখিত অগ্নিপরীক্ষা। 

মোঃ হাসান তারেক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ডক্টর মালিকা কলেজ, ঢাকা।


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]