মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
গোতাবায়ার জয়ে অস্বস্তিতে দিল্লি
গোতাবায়ার জয়ে অস্বস্তিতে দিল্লি





পালাবদল ডেস্ক
Monday, Nov 18, 2019, 1:47 pm
 @palabadalnet

কলম্বো: এক সময় তামিল টাইগারদের কড়া হাতে দমন করে শ্রীলঙ্কার মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন গোতাবায়া রাজাপক্ষ। রোববার দেশের মানুষ প্রমাণ করে দিলেন, সেই বিশ্বাস হারায়নি। শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন দেশের প্রাক্তন প্রতিরক্ষা সচিব এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ভাই গোতাবায়া। 

প্রাক্-নির্বাচনী একাধিক সমীক্ষায় তিনিই এগিয়ে ছিলেন। শনিবারের নির্বাচনের ফল বেরোতে দেখা গেল, ৫২.২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ৭০ বছরের গোতাবায়া। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমাদাসা ৪১.৯৯ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে। আজই গোতাবায়া শপথ নেবেন। 

শনিবার নির্বাচনের দিন একাধিক হিংসার ঘটনা ঘটলেও, ভোট দিয়েছেন প্রায় ৮০ শতাংশ দেশবাসী। জেতার পরে তাই সবার আগে শান্তি বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। টুইটারে সমর্থকদের প্রতি তার আর্জি, ‘শ্রীলঙ্কার প্রত্যেকটি মানুষ এই নতুন যাত্রায় শরিক হতে চলেছে। এ কথা ভুললে চলবে না। তাই জয়ের উদ্‌যাপন হোক শান্তিপূর্ণ। সম্মান ও শৃঙ্খলা বজায় থাকুক।’    

রাজাপক্ষের জয়ের পিছনে তার সন্ত্রাসবিরোধী কড়া অবস্থানকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন অনেকে। ইতিহাস ঘাঁটলে সে কথা আন্দাজ করাটাও খুব একটা কঠিন নয়। দেশের প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন। দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন সেনাবাহিনীতে। নব্বইয়ের দশকে এলটিটিই-র বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হয়েছিল তার হাত ধরেই। এই অভিজ্ঞতাই গোতাবায়ার লড়াইয়ে কাজ দিয়েছে। 

এ বছর ইস্টারের সকালে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। তাতে প্রাণ হারান ২৫৯ জন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগের ওই ঘটনাই রাজাপক্ষের নির্বাচনী প্রচারে মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতায় এলে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তাই গোতাবায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, দুর্নীতি এবং চীনকে সমর্থনের অভিযোগ উঠলেও শ্রীলঙ্কার মানুষ শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার আশ্বাসেই আস্থা রেখেছেন বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদরা। কট্টরপন্থী মনোভাবের জন্য সংখ্যালঘু মুসলিম ও  তামিলরা গোতাবায়ার ওপরে অসন্তুষ্ট হলেও সংখ্যাগুরু সিংহলীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। উগ্রবাদী বৌদ্ধদেরও সমর্থনও পেয়েছেন তিনি।

রোববার ভোটের ফল জানাজানি হতেই গোতাবায়াকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ইউএনপি-র মন্ত্রী এবং অন্যমত প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমদাসা। এ বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল তার প্রতিই। এ দিন গোতাবায়াকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। টুইটারে তিনি লিখেছেন, “আপনাকে শুভেচ্ছা। দুই দেশের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি এবং গোটা উপমহাদেশের নিরাপত্তার জন্য আপনার সঙ্গে একজোট হয়ে কাজ করতে চাই।” জবাবি টুইটে ধন্যবাদ জানিয়েছেন গোতাবায়াও। লিখেছেন, ‘অভ্যর্থনার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ভারতের মানুষকে ধন্যবাদ। ইতিহাস আর বিশ্বাসের নিরিখে আমাদের দু’টি দেশ এক সুতোয় বাঁধা। এই বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হবে আশা করি। আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় রইলাম।’   

তবে টুইট সম্ভাষণ যতই মধুর হোক না কেন, গোতাবায় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় সামান্য হলেও অস্বস্তিতে ভারত। কারণ চীনের কাঁটা। চীন ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে বরাবর সেতু হিসাবে কাজ করেছে রাজাপক্ষ পরিবার। অনেকের দাবি, ২০১৫-য় মহিন্দা রাজাপক্ষের নির্বাচনী প্রচারে বেইজিং প্রচুর অর্থ ঢেলেছিল। তাই গোতাবায়ার জমানায় ভারতের তুলনায় চীনকেই যে শ্রীলঙ্কা বেশি গুরুত্ব দেবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তার ওপরে আগামী বছরের শুরুতেই শ্রীলঙ্কায় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তাতে ফের প্রধানমন্ত্রীত্ব ফিরে পেতে মরিয়া চেষ্টা চালাবেন গোতাবায়ার দাদা মহিন্দা রাজাপক্ষ। তিনি জয়ী হলে, রাজাপক্ষ ভাইদের হাতেই উঠবে শ্রীলঙ্কা শাসনের রাশ। এই অঙ্কেই দুশ্চিন্তা আরো বেড়েছে ভারতের।

---------

গোতাবায়া রাজাপক্ষের পরিচয়

৭০ বছর বয়সী গোতাবায়া রাজাপক্ষ শ্রীমিল টাইগারদের বিচূর্ণ করার ব্যাপারে তিনি মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। রাজাপক্ষে ভূতপূর্ব সেনা কর্মকর্তা। তার ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে যখন শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি ছিলেন তখন তিনি ছিলেন গোতাবায়া ছিলেন প্রতিরক্ষা সচিব। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলমের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এই অভিযানের ফলেই টাইগারদের পরাজয় ঘটেছিল এবং টাইগার নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ নিহত ছিলেন।

রাজাপক্ষ ভাইরা সন্ত্রাসবাদের পরাজয় ঘটানোর কৃতিত্ব দাবি করেছেন বারবার এবং একই সঙ্গে তাদের দাবি ছিল পৃথিবীর মধ্যে শ্রীলঙ্কাই একমাত্র দেশ যে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে।

রাজাপক্ষরা চার ভাই। গোতাবায়া এবং মাহিন্দ ছাড়া অন্য এক ভাই হলেন বাসিল রাজাপক্ষে। মহিন্দা রাজাপক্ষে ২০০৫-১৫ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা ছিলেন এবং ২০০৭ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ছিলেন সাংসদ। চামাল রাজাপক্ষে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা সংসদের অধ্যক্ষ ছিলেন।

নির্মম বলে গোতাবায়ার পরিচিত রয়েছে, এবং এলটিটিই-র বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার বিরুদ্ধে মানবতা লঙ্ঘনকারী অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। এলটিটিই বিরোধী যুদ্ধে কয়েক হাজার সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বৌদ্ধদের আধিপত্য স্বীকৃত হয়ে গিয়েছে তামিল বিদ্রোহীদের পরাজয়ের জেরে।

শ্রীলঙ্কার মুসলিমবিরোধী বৌদ্ধ উগ্রপন্থী শক্তি বলে পরিচিত বদু বালা সেনার মূল শক্তি হিসেবে ধরা হয় গোতাবায়া রাজাপক্ষকে। দেশে ২০১৪ সালের মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার পিছনে ছিল এই সংগঠন। মনে করা হয়, ২০১৮ সালের ক্যান্ডিতে মুসলিম-বিরোধী সন্ত্রাসের পিছনেও ছিল এই সংগঠন।

শ্রীলঙ্কা, ইউরোপ এবং আমেরিকায় গোতাবায়া মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত। একদা তিনি মার্কিন নাগরিক ছিলেন এবং তার সেখানে একটি বাসস্থানও ছিল। দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন গোতাবায়া।

এ বছরের শুরুতে আমেরিকায় গোতাবায়ার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়। তাতে অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে এক সাংবাদিককে অত্যাচার ও খুনের অভিযোগও ছিল। দেশে রাজাপক্ষের শাসন চলাকালীন বহু বিক্ষুব্ধদের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে স্বাধীন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলারও।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে তার অবসেশন লুকোনোর খুব একটা চেষ্টা করেন না তিনি এবং নিজেকে সাধারণ একজন প্রেসিডেন্টের বদলে জাতীয় নিরাপত্তা সম্রাট বলেই দেখতে চাইবেন তিনি।

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনের সময়ে বেশ কয়েকজন বলেছেন, গোতাবায়ার জয় দেখিয়ে দিয়েছে ভোটাররা নাগরিক অধিকারের উপর কাটছাঁট মেনে নিতে রাজি।

রাজাপক্ষ ক্ষমতায় ফেরার জেরে শ্রীলঙ্কা ও চিনের আলোচনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ভারত। মহিন্দা যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন চিন ব্যাপক সুযোগসুবিধে দিয়েছিল, ঋণ দেওয়া হয়েছিল কয়েক বিলিয়ন ডলার। শ্রীলঙ্কায় বন্দর ও হাইওয়ে বানাবার সময়ে সে দেশকে ঋণভারে জর্জরিত করে দেওয়া হয়েছিল।

এই ঋণের জেরে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিও ডুবতে বসে। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কা যখন ঋণ শোধ দিতে ব্যর্থ হয়, সে সময়ে হামবানটোটা বন্দর এবং সংলগ্ন ১৫হাজার একর জমি চিনকে লিজ দিতে বাধ্য করা হয়।

মাহিন্দা জমানার শেষ দু বছরে একেবারেই না-জানিয়ে একাধিকবার শ্রীলঙ্কার সামরিক সাবমেরিন এবং যুদ্ধজাহাজ কলম্বোর বন্দরে পৌঁছে যায়, যা ভারতের পক্ষে অতীব উদ্বেগের।

নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রথম দফায়, গোতাবায়া যখন শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষামন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন, সে সময়ে শ্রীলঙ্কায় চিনা সাবমেরিনের নোঙর ফেলা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ভারত। কলম্বো সে সময়ে জানিয়েছিল, এ ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। বহু বছর ধরেই জ্বালানি ভরার জন্য এবং নাবিকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দেশের সামরিক জাহাজ আসে শ্রীলঙ্কায়।- সংবাদসংস্থা

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]