শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
মতামত
সৌদি-ভারত সম্পর্ক নিয়ে মিথ ও বাস্তবতা
সৌদি-ভারত সম্পর্ক নিয়ে মিথ ও বাস্তবতা





এম কে ভদ্রকুমার
Friday, Nov 8, 2019, 4:21 pm
 @palabadalnet

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিদেশ সফরে গেলেই তাকে কোনও না কোনওভাবে প্রশংসা করার বাধ্যবাধ্যকতা অনুভব করেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা। সফরের ফলাফল যাই হোক না কেন, কিছু যায় আসে না। সম্প্রতিক সৌদি আরব সফরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বাস্তবতা হলো গত দেড় দশক ধরে, এমনকি ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে মরহুম বাদশাহ আব্দুল্লাহকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি করে নিয়ে এসেছিলেন তখনও ভারত ও সৌদি আরবকে ইংরেজ কবি কিটসের বিখ্যাত কবিতা ‘ওডি অন এ গ্রিসিয়ান উর্ন’ (এক গ্রিক সমাধির গাঁথা) – এ উল্লেখিত সাহসী দুই প্রেম পিয়াসীর মতো মনে হয়েছে
 
আবেগটি স্বতঃসিদ্ধ হলেও পরিণতি অধরাই থেকে গেছে। ভারতীয় বিশ্লেষকরা মোদির সৌদি সফরকে এমনভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলে ধরেছেন যেন এমনটাই স্বাভাবিক।

আসল কথা হলো রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন যোগ দিতে সৌদি আরবের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন মোদি। আর সেই সুযোগে তিনি ভারত-সৌদি অর্থনৈতিক সম্পর্কে গতি আনার চেষ্টা করেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দিল্লি সফরকালে বলেছিলেন যে আগামী দুই বছরে ভারতে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে সৌদি আরব। আমরা প্রায় আধাআধি সময় পার করতে যাচ্ছি।

অতিকায় রিফাইনারিতে ৪৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা ছাড়া আর কোন কথা শোনা যায়নি। এই স্থাপনা তৈরি হবে রত্নগিরিতে, যেখানে সৌদি আরামকো বিনিয়োগ করছে বলে জানানো হয়েছিল।

মুকেশ আম্বানি গত আগস্টে বলেছিলেন যে সৌদি আরামকো তার রিলায়েন্স শিল্পে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। তাই নিশ্চিত করেই বলা যায় যে সৌদি সফরে আরামকো-কে তাড়া দেয়া একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল মোদির।

চূড়ান্ত বিচারে, সৌদি-ভারত সম্পর্ক এসে দুটি প্রধান নিয়ামকে থিতু হয়েছে: সেখানে ৪০ লাখ ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায়, যাদের পাঠানো রেমিটেন্স ভারতীয় অর্থনীতিকে বেশ ভালোভাবে ঠেকা দিয়ে রেখেছে এবং দ্বিতীয়ত, বিপুল তেল দরকার ভারতের। আসলে এই দুটি নিয়ামকই দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত রূপ দিয়েছে।

ভারতের সব সরকারের মাথায় এই দুটি বিষয় কাজ করেছে। ২০০৬ সালে বাদশাহ আব্দুল্লাহ’র দিল্লি সফর বা ২০১০ সালে মনমোহন সিংয়ের সৌদি সফরের সময় দেয়া ঘোষণাগুলো স্মরণ করা যায়। মনমোহনের মতো কোন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের প্রতি এতটা মনযোগী হননি। তখন প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে বাদশাহ আব্দুল্লাহ দু’বার ভারত এসেছিলেন।

মোদ্দা কথা, মোদি সরকার সৌদি-ভারত সম্পর্কে কোনো নতুনত্ব যোগ করতে পারেনি। গত সপ্তাহে মোদির সফররের পর দেয়া যৌথ বিবৃতি অতীত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি মাত্র।

মোদি সরকারের সাফল্য এ ক্ষেত্রে সম্ভবত তার মুসলিম বিরোধী রাজনীতি থেকে সম্পর্কটিকে আলাদা করতে পারা। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বড় কৃতিত্ব সৌদি শাসকদের। কারণ ধর্ম ও রাজনীতি ইস্যুতে তারা দ্বিমুখি বক্তব্য দিতে পারঙ্গম।

আসলে তেলের টাকার কারণেই মোদি সরকারের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছে সৌদি আরব। সৌদি আরামকো-কে যদি মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে রিলায়েন্সে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করানো যায় বা রত্মগিরি প্রকল্প যাত্রা শুরু করে – তাহলে কেন নয়?

কিন্তু মাঠের বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দেয় অতি উৎসাহ, যা একসময় ভুল ধারণার দিকে চালিত করে। মোদিকে তোষণ করতে গিয়ে ভারতীয় বিশ্লেষকরা এমন অদ্ভুদ সিদ্ধান্তে পৌছেন যে রিয়াদ নাকি কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের পক্ষে ‘ইতিবাচক অবস্থান’ গ্রহণ করেছে এবং ‘সংকট চরমে না নিতে পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়েছে’।

কোনো বাস্তব প্রমাণ ছাড়াই এ ধরনের মাত্রাজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তান ও সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে কি ধরনের বোঝাপড়া হয়েছে তা আমরা জানি না। আর সে কারণেই মোদির সৌদি সফর নিয়ে পাকিস্তানকে অযথা বিচলিত হতে দেখা যায়নি।

একইভাবে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে ভারত ও সৌদি আরবকে একই পৃষ্ঠায় দেখানো হয়। কিন্তু এটা সৌদি আরবের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাবের পরিপন্থী। বিশ্বের নানা অংশে সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের ক্ষেত্রে সৌদি আরব সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে গত সোমবার ফক্স নিউজকে বলেছেন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ও ডেমক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রত্যাশী তুলসি গ্যাবার্ড।

৯/১১ হামলায় সৌদি আরবের হাত থাকার বিষয়ে ‘সত্য গোপন’ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেন তিনি।

মোদ্দা কথা হলো, ভারতের কাছে রেয়াতি মূল্যে তেল বিক্রি করছে না সৌদি আরব। আমরা চাচ্ছি যেন সৌদি সরবরাহ ব্যাহত না হয়। ভারতীয় বাজারে তেল রফতানির মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার ব্যাপারে সৌদি আরব সচেতন। এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা ও অন্যান্য ভারতমুখি তৎপরতার মাধ্যমে বিক্রেতা-ক্রেতা সম্পর্কটিকে আরো গভীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে রূপ দেয়া। বাস্তবতার সকল ক্ষেত্রেই আমরা ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে অবস্থান করছি।

মোদি দিল্লি ফিরে আসা মাত্রই রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ব সৌদি আরামকো’র বহুল প্রত্যাশিত ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) শুরু করে। বিদেশী শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কোন ইচ্ছা বর্তমানে এই কোম্পানির নেই। সৌদিরা মনে করছে এই শেয়ার বিক্রির টাকায় ক্রাউন প্রিন্সের পরিকল্পনা মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা এবং ১০ শতাংশের বেশি বেকারত্বকে মোকাবেলা করা যাবে।

আরামকো শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ শুরু হবে ১৭ নভেম্বর। চূড়ান্ত মূল্য ঠিক হবে ৪ ডিসেম্বর এবং ১১ ডিসেম্বর শেয়ার কেনাবেচা শুরু হবে। এর সহজ মানে হলো রিলায়েন্সকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে এবং ‘রত্মগিরি’ আর জাগছে না।

ভারতের বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে সৌদিরা উৎসাহ বোধ করছে বলে মনে হয় না। নিকট ভবিষ্যতে নিজেদের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটানোই অগ্রাধিকার দেবে তারা।

সূত্র: ইন্ডিয়ানপাঞ্চলাইন ডটকম

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতীয় কূটনীতিক



  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]