বুধবার ১৩ নভেম্বর ২০১৯ ২৯ কার্তিক ১৪২৬
 
মতামত
গণতন্ত্র থেকে পুলিশি রাষ্ট্রের পথে ভারত!
গণতন্ত্র থেকে পুলিশি রাষ্ট্রের পথে ভারত!





স্বাতী চতুর্বেদী
Wednesday, Nov 6, 2019, 1:37 am
 @palabadalnet

ইতিহাস অতি নির্মম বিচারক। এই বিচারে আবেগের স্থান নেই। আবেগ, কূটকৌশল আর হেডলাইন বদলিয়ে এই বিচার পরিবর্তন করা যায় না। দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়া হিন্দুত্ববাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি নিজেকে ইতিহাসের এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চান, যেখানে তিনি ভারতের পুনরুদ্ধারকারী হিসেবে এবং দেশকে হ্যাশট্যাগ নিউইন্ডিয়া হিসেবে গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে বিবেচিত হবেন।

মোদি ইতিহাসে জায়গা পাবেন ঠিকই, কিন্তু এমন নেতা হিসেবে যিনি বহু-সাংস্কৃতিক ও বহু-বিশ্বাসের একটা সভ্যতাকে দ্রুত বদলে দিতে চেয়েছেন, যেখানে আসলে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী সমাধান কখনও কার্যকরী হবে না।
 
মোদি কিছু সাহসী কিন্তু সমস্যাপূর্ণ সমাধান বেছে নিয়েছেন, যেটা ভারতের গণতন্ত্রের প্রতি বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। শরীরের অঙ্গ কেটে ফেলা নিঃসন্দেহে সাহসী সিদ্ধান্ত কিন্তু এটা শরীরের কোন উপকার করবে কি?

মোদি আর তার সহযোগী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একতরফাভাবে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা দেয়া ছিল। মোদি আর শাহ এমনকি জম্মু ও কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটো আলাদা ইউনিয়ন অঞ্চল গঠন করেছেন।

প্রায় একশ দিন ধরে কাশ্মীরের সাবেক তিনজন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহ, ওমর আব্দুল্লাহ আর মেহবুবা মুফতি বাকি কাশ্মীরীদের সাথে বন্দি হয়ে আছেন। অবরুদ্ধ অবস্থার পাশাপাশি সেখানে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।

ভারতীয় নাগরিকদের অবরুদ্ধ করে রাখাটা কিভাবে গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ – সে প্রশ্নটা মোদি সরকারের কাছে করছে উদ্বিগ্ন বিশ্ব। ক্রমেই মনে হচ্ছে যে, ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটিকে নিয়ে মোদির সরকারের খেলা শেষের কোন পরিকল্পনা নেই।

সরকারের বড় ধরনের এই পদক্ষেপের পর কাশ্মীর ইস্যুটি এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে, যেটা কোন ভারতীয় সরকারই আগে চায়নি।

এই পরিস্থিতিটা আরও কুৎসিত হয়ে গেছে, যখন সংবাদের শিরোনাম বদলের অদক্ষ চেষ্টা চালানো হয়েছে। ইউরোপিয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের এক ডজনের বেশি কট্টর ডানপন্থী সদস্যদের সম্প্রতি কাশ্মীর সফরে নিয়ে যাওয়া হয় যেটার সমাপ্তি হয় শিকারাতে আনন্দ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। এই ‘ভ্রমণের’ আয়োজন করেছিল ‘আন্তর্জাতিক বিজনেস ব্রোকার’ মাদি শর্মা, যার পেছনে মোদি সরকারের আশীর্বাদ রয়েছে।

এই ডানপন্থী সদস্যদের ভ্রমণের বেলুনটি অবশ্য পুরোটাই ফেটে গেছে যখন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল চলতি সপ্তাহে ভারত সফরের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেন। মার্কেল বলেন, “কাশ্মীর পরিস্থিতি অস্থিতিশীল” এবং সেখানে “অবরুদ্ধ অবস্থাটি সঠিক নয়”।

নজরদারি

গণতন্ত্রের ওপর সর্বসাম্প্রতিক আঘাত হলো প্রায় ১৫০০ মানুষের উপর ইসরাইলি যুদ্ধ সরঞ্জাম – পেগাসাস দিয়ে নজরদারি চালানো। এই উৎপাদনকারীরা বলেছে, তারা এটা শুধু সরকারের কাছেই বিক্রি করে থাকে।

ভারতীয় নাগরিকদের উপর নজরদারির ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম রয়েছে। যেখানে বলা আছে যে, এ জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিবের লিখিত অনুমতি লাগবে এবং সেই অনুমতি দেয়ার জন্য বেশ কয়েকটি সংস্থার সুপারিশ থাকতে হবে। অধিকার কর্মী, সাংবাদিক, বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ ও বিচারকদের হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্টে এই নজরদারির বিষয়টি খুবই কেলেঙ্কারির ব্যাপার।

ভারতের জনগণের কাছে মোদির কোন দায় নেই। এখন পর্যন্ত তিনি এ কথা জানাতে অস্বীকার করে এসেছেন যে, কে তাকে রুপির নোট বিলুপ্ত করার পরামর্শ দিয়েছিল। তার এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে অর্থনীতিরই শুধু ক্ষতি হয়নি, বরং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তাদের দুজন যোগ্য গভর্নরকে হারিয়েছে। আরবিআইয়ের যে স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ছিল বিশ্বে, সেটাও ধুলায় মিশে গেছে। একই সাথে মোদির অধীনে ভারত সরকার যে সব অর্থনৈতিক তথ্য দিচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারেও আস্থা হারিয়ে গেছে মানুষের।

কাশ্মীরের অবরুদ্ধ অবস্থা, নজরদারি কেলেঙ্গারি আর সরকারের নানান দাবি সত্বেও অবনতিশীল অর্থনীতি – সব মিলিয়ে ভারত ক্রমেই একটা পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে উঠছে।

ইতিহাস মোদিকে কিভাবে স্মরণ করবে? সেই রায় হয়ে গেছে।

সূত্র: গালফ নিউজ

স্বাতী চতুর্বেদী: ভারতীয় সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক



  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]