বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯ ২৯ কার্তিক ১৪২৬
 
মতামত
মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত জাপান, চীন আর ভারত
মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত জাপান, চীন আর ভারত





ল্যারি জ্যাগান
Monday, Nov 4, 2019, 2:30 pm
 @palabadalnet

চলতি বছরের আসিয়ান এবং বর্তমানে ব্যাংককে চলমান ইস্ট এশিয়ান সম্মেলনের আড়ালে এই অঞ্চলের প্রধান তিন দেশ – চীন, ভারত ও জাপান মিয়ানমারে তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য গোপনে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি যে এই মুহূর্তে ব্যাংককে অবস্থান করছেন, সেটাই প্রমাণ করে যে, এ অঞ্চলে তার দেশের গুরুত্ব বাড়ছে। এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনার মুখে উদ্বিগ্ন সু চি এখন তার দেশের সপক্ষে এশিয়ার ‘বন্ধু’ দেশগুলোর সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
 
সু চির ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন যে, তিনি মনে করেন ব্রিটেন আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে প্রতারণা করেছে। গত বছর তিনি তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগিকে বলেন যে, মিয়ানমার আসলে দুইটা মাত্র বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে – চীন ও জাপান, আর এর চেয়ে কিছু কম মাত্রায় ভারতের উপর।

আসিয়ানের সমর্থনটা যদিও তিন বড় প্রতিবেশীর সমর্থনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটাকে এক ধরনের স্বাভাবিক হিসেবে নেয়া হয়েছে।

মিয়ানমারে পশ্চিমাদের সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে, যদিও ব্রিটেন জাতিসংঘে তাদের সমালোচনার মাত্রা কিছুটা নমনীয় করেছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য তারা মিয়ানমারের দ্বারস্থ হচ্ছে। তবে নিজেদের দিক থেকে মিয়ানমার এশিয়াতেই তার শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিগত ছয় মাসে রাখাইনের বর্বর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিয়ানমারের বিচারের জন্য যে চাপ বাড়তে শুরু করেছে, সেখানে মিয়ানমার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশেষ করে জাতিসংঘে চীনের সুরক্ষা নেয়ার চেষ্টা করেছে।

এই বিষয়ে রাশিয়াকেও টার্গেট করে চেষ্টা চালানো হয়েছে কারণ রাশিয়া জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল মিন অং লাইং এবং সিনিয়র সরকারী কর্মকর্তারা বিশেষ করে জাতিসংঘে মস্কোর সমর্থন পেয়েছেন।

রাশিয়া অবশ্য মিয়ানমারের বড় ধরনের অস্ত্রের সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে, যেটা চীনকে কিছুটা বিস্মিত করেছে। বিগত তিন বছরে মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে রাশিয়া সফর করেছেন।

১৯৮৮ সাল থেকে জেনারেলরা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের পর এবং ১৯৯০ সালের আগের নির্বাচনের ফল বাতিল করার পর থেকে চীন মিয়ানমারের অনমনীয় মিত্র হিসেবে সাহায্য করে যাচ্ছে। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) অনেকে মনে করেন যে, একমাত্র চীনের সমর্থনের কারণেই আন্তর্জাতিক মহল ও পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা সত্বেও যতদিন খুশি স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করে গেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।

তবে সামরিক বাহিনী বেইজিংয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যেটার কারণ বেইজিং তাদের উপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সাম্প্রতিককালে তাদের ভারতীয় সাবমেরিন কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সেটা বোঝা গেছে। সামরিক স্বাধীনতার দিক থেকে এটা একটা ঘোষণা দেয়ার মতো, কারণ ভবিষ্যতে সাবমেরিন বন্দর তৈরির ক্ষেত্রে কোন চীনা ঠিকাদারকে কাজ দেয়া হবে না, বা চীনা সাবমেরিনের সাথে সেগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

মূলত মিয়ানমারের সামরিক সরবরাহের উৎস আরও সম্প্রসারণের জন্য সামরিক কমাণ্ডারদের সিদ্ধান্তের অংশ এটা। বেইজিংকে তারা পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। “সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ের দিন থেকে এই ঐতিহ্য চলে আসছে” – ওই জেনারেলের ঘনিষ্ঠ একটি সামরিক সূত্র এ কথা জানান।

তিনি বলেন, “থান শোয়ে জোর দিতেন যাতে তাতমাদাও বেইজিংয়ের উপর নির্ভরতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার জন্য রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা বজায় রাখে”। তিনি আরও বলেন, থান শোয়ে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির পক্ষে জোর প্রচারণা চালিয়ে গেছেন।

এই চিন্তাধারাটা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও রয়েছে, যেটা এসেছে আধুনিক মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল অং সানের কাছ থেকে। এই নীতি মিয়ানমারের বিখ্যাত কূটনীতিক উ থান্টও স্পষ্ট করে বলে গেছেন, যিনি জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমান এনএলডি সরকারও একই নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে।

তৎকালীন দলের সেক্রেটারি উ লুইন আজ থেকে ১৫ বছর আগে আমাকে বলেছিলেন, “এনএলডি ক্ষমতায় আসলে আমরা জোট-নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করবো”। এখনও পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে এই নীতি রয়ে গেছে। কিন্তু কূটনীতিকরা বলছেন, আধুনিক বিশ্ব ও বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যের জন্য এটাকে পরিমার্জন করতে হবে।

চীন বহু দশক ধরে অং সান সু চিকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে এসেছে, কারণ শুরুর দিকে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন সু চি। কিন্তু মিয়ানমারের থিন সিনের সরকারের সাথে চীনের সম্পর্কের অবনতি শুরু হলে তৎকালিন বিরোধী দলীয় নেতা অং সান সু চির সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করে বেইজিং।

তাই সু চি যখন দেশের বেসামরিক সরকারের নেতা নির্বাচিত হলেন, চীন সরকার তখন তাকে ও তার সরকারকে যথেষ্ট তোষণ করেছে।

তবে, মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষের মতো সু চিও মিয়ানমারে বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মীদের মতো তিনিও চীনকে অপছন্দ করেন কারণ আগের সামরিক সরকারকে তারা পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল।

তবে, একই সাথে তিনি বাস্তবপন্থী। ২০০৩ সালের মার্চে এক সাক্ষাতকারে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “চীনের ব্যাপারে আমাকে সতর্ক হতে হবে”। এর পরপরই তার গাড়ি বহরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হামলা হয় এবং তিনি গৃহবন্দী হন। নিজের ক্ষোভ ও সন্দেহ দূরে সরিয়ে তিনি বলেছিলেন: “তারা শক্তিধর প্রতিবেশী, এবং তাকে ক্ষুব্ধ করাটা আমার উচিত হবে না”।

স্টেট কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে এবং একইসাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এই মনোভাব তার কৌশল নির্ধারণে সাহায্য করেছে। মিয়ানমারে যে সব ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে রাখাইন সঙ্কট এবং বর্বর সামরিক অভিযান থেকে প্রাণ বাঁচাতে সেখানকার প্রায় এক মিলিয়ন মুসলিম শরণার্থীর প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের পর থেকে মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও সহায়তার জন্য তারা আরও বেশি করে চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

তবে তার জন্য এটা একটা বড় সমস্যা তৈরি করেছে। বেইজিংয়ের সহায়তার জন্য তাদের উপর কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি চীনের উপর মিয়ানমারের অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন সু চি। সব মিলিয়ে তার যে ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাধীন, জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটাই এখন খর্ব হচ্ছে।

অন্তত দুই বছর আগেই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, যখন তিনি তার সরকারের একজন ভেতরের ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে, মিয়ানমার যদিও চীনের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু প্রকাশ্যে অন্তত মিয়ানমারের এটা প্রকাশ করা উচিত হবে না যে, তারা বেইজিংয়ের এতটা ঘনিষ্ঠ, কারণ ভবিষ্যতে এটা দেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সুযোগকে সীমিত করে দেবে।

বিগত এক বছর বা এর কাছাকাছি সময় ধরে মিয়ানমারের নেতারা তাদের কৌশলগত ছাতা সম্প্রসারিত করার এবং ‘জোটের’ ক্ষেত্র বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই জাপান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের কারণ হলো নিরব কূটনীতি এবং পর্দার পেছনের আর্থিক সহায়তা। তবে, এটা অবশ্যই ভবিষ্যতে মিয়ানমারের জন্য দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করতে পারে, কারণ বেইজিংয়ের কাছে বিষয়টি অজানা নেই।

চীনা কূটনীতিকরা ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করেছেন যে, তারা মনে করেন মিয়ানমার তাদেরকে প্রকাশ্যে যথেষ্ট কৃতিত্ব দেয়নি যদিও শান্তি প্রক্রিয়া এবং রাখাইন শরণার্থীদের পুনর্বাসনের পেছনে তাদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তারা মনে করেন, জাপান আরও কম অবদান রেখে আরও বেশি স্বীকৃতি পাচ্ছে। স্টেট কাউন্সিলর সম্প্রতি জাপানের নতুন সম্রাটের সিংহাসনে আরোহন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের কাছে জাপানের গুরুত্বের দিকটি উঠে এসেছে। চলতি বছরে দুবার জাপান সফরে গেলেন সু চি, অন্যদিকে চীনে তিনি গিয়েছেন একবার।

যদিও এই সংখ্যাগত হিসাব করলে সেটা পররাষ্ট্র নীতির বিশদ ও জটিল প্রকৃতির প্রতি অবমূল্যায়ন করা হবে, কিন্তু বেইজিংয়ের মধ্যে এটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং মিয়ানমারকে চীন সরকার যে সহায়তা দিয়েছে, সেটার প্রকাশ্য স্বীকৃতি তারা আশা করে। আর তাই, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মিয়ানমার সফরে এই এজেন্ডাটি হয়তো আবার ফিরে আসবে।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

ল্যারি জ্যাগান: বিবিসির সাবেক সাংবাদিক,  বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক বার্তা সম্পাদক জ্যাগান মিয়ানমার বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ।


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]