শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
মতামত
হিন্দি চাপিয়ে দিলেই ভারতে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে?
হিন্দি চাপিয়ে দিলেই ভারতে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে?





শিবাংশু মুখোপাধ্যায়
Friday, Nov 1, 2019, 10:58 am
Update: 01.11.2019, 11:01:16 am
 @palabadalnet

'মানুষ ভাষা বলবার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়'- যখন কেউ এই কথা বলবেন তখন বুঝতে হবে তিনি নির্বিশেষ ভাষার জৈব দিক নিয়ে কথা বলতে চাইছেন। স্বভাবতই সেখানে আকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নগুলো ঘোরাফেরা করবে জিন এবং মানবমস্তিষ্কের গঠনের বিশেষ সূত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। এই জিনিসগুলো ভাষার ভেতরের দিক। আবার যখন কেউ বলবেন, ‘অমুক জনগোষ্ঠীর মানুষ অমুক ভাষায় কথা বলেন’, তখন বুঝতে হবে তিনি ভাষার বাইরের দিক অর্থাৎ ভাষার অজৈব দিক নিয়ে কথা বলছেন।

দ্বিতীয় ভাষার প্রশ্নটা ভাষার ভেতর-বাইরে ব্যাপ্ত। কারণ সে ক্ষেত্রে প্রশ্নটা ভাষার ভেতরের দিকেরও বটে আবার বাইরের দিকেরও বটে। দ্বিতীয় ভাষার ক্ষেত্রে, ভাষা শেখবার প্রক্রিয়াটা জৈব, কিন্তু কোনটা আমার দ্বিতীয় ভাষা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে দাঁড়াতে হবে ভাষার বাইরের চত্বরে। সেখানে, কোনটা আমার দ্বিতীয় ভাষা হবে, এই প্রশ্নের উত্তরটা নিয়মমাফিক হওয়া উচিত ভাষিক পরিবেশগত। অর্থাৎ আমি পারিবারিক বৃত্ত ছেড়ে যখন সামাজিক বৃত্তে পা রাখছি তখন আমার মাতৃভাষা ছাড়া অন্য যে ভাষা আমি সামাজিক পরিবেশ থেকে পাচ্ছি এবং বাহ্যিক সংযোগের জন্য যে ভাষা আমি সেই পরিবেশ থেকে শিখে নিচ্ছি সেইটাই আমার দ্বিতীয় ভাষা।

এখন যদি এই দ্বিতীয় ভাষার প্রশ্নটা সামাজিক পরিবেশের তোয়াক্কা না-করে রাষ্ট্রনৈতিক ফায়দার সূত্রে তোলা হয় তখন নানা সমস্যা দেখা দেয়। দেখা যাক দ্বিতীয় ভাষা বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? একজন ব্যক্তি যে এলাকায় বাস করেন সেই এলাকায় তার নিজের ভাষা অর্থাৎ তার মাতৃভাষা ব্যতীত অন্য কোনও ভাষা যদি সাধারণ ভাবে ব্যবহৃত হয়, এবং ওই ব্যক্তি নিজের ভাষা ছাড়াও ওই সাধারণ ভাবে ব্যবহৃত ভাষাও শিখে নেন, তবে সেই ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা বলা যেতে পারে। বা যদি কোনও এলাকায় বিশেষত শিক্ষাগত ক্ষেত্রে বা সরকারি কাজের ক্ষেত্রে কোনও ভাষা ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়, এবং সেই ভাষা যদি ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষের মাতৃভাষা না হয়, তবে আপনি সেই ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা বলতে পারেন।

ভাষার এই ব্যাপক ব্যবহার বা 'সাধারণ ভাবে ব্যবহৃত' বলতে আদপে কী বোঝায়, প্রশ্নটা সেইখানে। ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যা খুব বেড়ে যাবে যদি - প্রথমত, গোটা দেশজুড়ে কোনো একক ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করবার প্রস্তাব পেশ করা হয় এবং দ্বিতীয়ত, সেই দ্বিতীয় ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এত দিন ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ভারতের নাগরিকদের কাছে নানা সমালোচনা সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে তার প্রধান কারণ ইংরেজি ভাষা ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুলগুলো ছাড়া কোথাও জাতীয় ভাষার মর্যাদা নিয়ে ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়নি। কিন্তু হিন্দিকে ভারতের সর্বত্র দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালানো হলে সমস্যা আর-একটু জটিল হবে বইকি। তা ছাড়া, ইংরেজি ভারতের কোনও প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষা নয়, ফলে কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে ভারতে প্রাধান্য পেয়ে আসেনি। কিন্তু হিন্দি দ্বিতীয় ভাষা হলে সেই প্রাধান্য পাবে মূলত কিছু বিশেষ অঞ্চলের মানুষ।

এখানে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরাসরি তার মন্তব্য তুলে দিচ্ছি, ২০১৭-তে প্রকাশিত অখণ্ড 'সাংস্কৃতিকী' থেকে: '...বিভিন্ন লোক ভাষা নিজ-নিজ ক্ষেত্রে চলিবে - এগুলির প্রত্যেকটিকেই ভারত সরকার এখন বা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিয়াছেন, কেবল হিন্দি এখন একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা নহে; যদিও হিন্দিকে সরকারি কাজকর্মের ব্যবহৃত ভাষা রূপে নিখিল ভারতের সর্বত্র যথাসম্ভব স্থাপিত করবার চেষ্টা চলিতেছে।' পরের স্তবকেই সুনীতিকুমার হিন্দি ভাষা সম্পর্কে লিখছেন, 'হিন্দি আধুনিক ভারতের একটি শ্রেষ্ঠ ভাষা, এবং ইহা উত্তর ভারতের আর্য্য-ভাষী জনগণের অনেকের কাছে সহজবোধ্য হইলেও, অধিকাংশ লোকের কাছে দুর্বোধ্য।' ওই পাতাতেই তিনি আরও বলেছেন - বাংলা, মৈথিলির মতো হিন্দিও একটা প্রাদেশিক ভাষা মাত্র।

ও দিকে এই বছর ১৪ সেপ্টেম্বর হিন্দি ভাষা দিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হিন্দি ভাষাকে ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব দেন। গোটা ভারতকে এক সূত্রে গাঁথাই ছিল তার এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। তিনি অবশ্য ভারতের সমস্ত ভাষার নিজস্ব গুরুত্বের কথা স্বীকার করেছেন। তার টুইট-এ যা বক্তব্য ছিল তার বাংলা করলে দাঁড়ায়: ভারত বহু-ভাষার দেশ এবং প্রতিটা ভাষার নিজস্ব মহত্ব বা গৌরব রয়েছে, কিন্তু পুরো দেশে এক ভাষা হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক যা সমগ্র বিশ্বের কাছে ভারতের পরিচয়ের ধারক হয়ে উঠবে। বর্তমানে ভারতকে একসূত্রে বাঁধার কাজ যদি কোনও একক ভাষা করতে পারে তবে সেই ভাষা একমাত্র হিন্দিই, যা ভারতের সর্বাধিক জনসংখ্যার দ্বারা ব্যবহৃত। ভারতের নানা প্রান্তে প্রতিবাদ শুরু হতেই, শাহ জানান তিনি আঞ্চলিক মানুষের ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বলেননি। বরং তিনি নিজ নিজ ভাষাকে গুরুত্ব দেবার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছিলেন।

ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যাটা একটু বেশিই জটিল। এমনিতেই ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের দাপটে বাংলা তো বটেই, অন্যান্য ভাষার ছেলেমেয়েরাও কুঁকড়ে থাকে। হিন্দি ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করলে বাংলাভাষী ছাত্রের কাছে তার নিজের ভাষা হয়ে উঠবে তৃতীয় ভাষা, আর অন্যান্য ভাষার ছেলে-মেয়েদের কাছে তাদের নিজের ভাষা হয়ে উঠবে চতুর্থ ভাষা। ধরুন একজন পশ্চিমবঙ্গের কোঁড়াভাষী বাচ্চা ইংরেজি মিডিয়াম ইস্কুলে ভর্তি হল, সে ইংরেজি পড়বে প্রথম ভাষা হিসেবে। সরকার চাপিয়ে দিলে সে হিন্দি পড়বে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী হিসেবে বাংলা ভাষাকে তাকে গুরুত্ব দিতেই হবে, অর্থাৎ তার নিজের ভাষা চলে গেল চতুর্থ স্থানে। যদি আদৌ তার ভাষা বেঁচেবর্তে থাকে।

মহাত্মা গান্ধীর 'হিন্দ স্বরাজ' বেরিয়েছিল ১৯০৯ সালে। ওই গ্রন্থে তিনি বলেছিলেন, ভারতকে নিজের দেশ বলে দাবি করবার আগে আমাদের উচিত নিজের ভাষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে আমাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে জাগরুক রাখা। তার মতে ভারতের ক্ষেত্রে একক সর্বজনীন ভাষা অবশ্যই হওয়া উচিত হিন্দি যা লেখার ক্ষেত্রে দুটো বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে, পারসিক ও নগরী। এতে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক হয়তো আরও গভীর হবে। এবং এই ভাষার চয়নে যথাশীঘ্র সম্ভব ইংরিজি ভাষাকে বাতিল করা যাবে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, বাপু হিন্দি নামটা হিন্দুস্থানি ভাষার অর্থে ব্যবহার করতেন, যেখানে তার মাথায় থাকতো হিন্দি এবং উর্দুর মেলবন্ধনের মধ্যে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা। তিনি বলতেন, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে হিন্দুস্থানিকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা না দিলে কোনও দিন আমাদের স্বরাজ্যের ভাবনা ফলপ্রসূ হবে না।

বাপু হিন্দুস্থানিকে গুরুত্ব দিতেন কারণ, (ক) সরকারি কর্মচারিদের পক্ষে হিন্দুস্থানি শিখে নেওয়া সহজ হবে, (খ) একমাত্র ওই ভাষার পক্ষেই সম্ভব সমগ্র ভারতের ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, এবং রাজনৈতিক আদানপ্রদানের প্রতিনিধিস্থানীয় ভাষা হয়ে ওঠা, (গ) এমনকী সমগ্র ভারতের নাগরিকের পক্ষেও এই ভাষা শিখে নেওয়া সহজ, (ঘ) সবচেয়ে বড় কথা হিন্দুস্থানি ভারতের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অধিবাসীর ভাষা। গান্ধীর এই স্বপ্ন সফল হয়নি।

ভারতে কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬-এর ৯ ডিসেম্বর। ওই কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিই ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভাষা বিতর্কের প্রথম সাক্ষী। অ্যাসেম্বলির সদস্যদের মধ্যে আর ভি দেউস্কর, বালকৃষ্ণ শর্মা, বিহারের বাবুনাথ গুপ্তা, তৎকালীন বম্বের বিনায়ক পটাসকর, মধ্যপ্রদেশের রবিশঙ্কর শুক্লা প্রমুখ হিন্দিকে একক জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পক্ষে সওয়াল করতেন। পরবর্তীকালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও হিন্দু-হিন্দি যোগ সূত্র মোতাবেক হিন্দি ভাষাকে একক জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পক্ষে দাবি তুলেছিলেন। আর এর উলটো দিকে, যারা হিন্দিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার বিপক্ষে ছিলেন, তাদের মধ্যে টি টি কৃষ্ণমাচারী, জি দুর্গাবাই, এন জি রঙ্গা, এন গোপালস্বামী আইঙ্গার প্রমুখ। এঁদের মত ছিল জাতীয় ভাষা হিসেবে ইংরিজির পক্ষে। বিতর্কের তিন বছর পরে অ্যাসেম্বলি মোটামুটি যে সিদ্ধান্তে থিতু হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের নাম ছিল, মুন্সী-আইঙ্গার ফরমুলা। ওই ফরমুলা অনুযায়ী, ভারতীয় সংবিধান কোনও জাতীয় ভাষার উল্লেখ করবে না, কেবল অফিসিয়াল ভাষার উল্লেখ থাকবে। আজও সে সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে সংবিধানের অষ্টম তফশিলে কেবলমাত্র ২২টা অফিসিয়াল ভাষারই উল্লেখ করা হয়।

ভারতে ভাষা বিতর্কের ইতিহাস আরও অনেক দীর্ঘ। এখানে ইতিহাসের দুয়েকটা মুহূর্তের উল্লেখের মধ্যে দিয়ে দুটো প্রধান সমস্যার কথা উল্লেখ করা গেল। এক, ভাষিক পরিবেশের বিচারে এক দিকে যেমন ভারতের সর্বত্র হিন্দিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করায় মানুষের অসুবিধে, দুই, হিন্দিকে রাজনৈতিক স্বার্থে জাতীয় ভাষা করে তুলতে চাইলেও রাষ্ট্রীয় স্তরে নানা ভাবে অশান্তির আগুন ছড়ানোর সম্ভাবনা। এখন কারও যদি এইটে মনে হয় যে, রাষ্ট্রীয় স্তরে এই সব ঠুনকো জিনিস নিয়ে অশান্তি বাড়লেই তো ভালো, অর্থনৈতিক দ্বিচারিতার খবর মানুষের কানে কম পৌঁছোবে, তা হলে তিনি বা তারা ভুল করবেন। কেননা ভাষা কোনও অকিঞ্চিৎকর বিষয় নয়। বরং তা অন্তত সুশীল সমাজের মানুষের কাছে বড় আবেগের জিনিস, দ্বিতীয়ত, ভাষা থেকে যেমন জমির দখলদারিতে পৌঁছোতে মানুষের সময় লাগে না, তেমনই ভাষা অতি সহজেই মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে অর্থনীতিতে। এমতাবস্থায়, আবার সেই পুরনো হিন্দি-হিন্দু বিতর্ককে খুঁচিয়ে তুললে লোকসান বাড়বে বই কমবে বলে মনে হয় না।

সূত্র: এই সময়

শিবাংশু মুখোপাধ্যায়:  এসএনএলটিআর-এ ভাষাতত্ত্ববিদ


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]