বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯ ২৯ কার্তিক ১৪২৬
 
মতামত
ক্রিকেটারদের আন্দোলন: দুর্বল হয়ে আসছে রাজনৈতিক দায়মুক্তি!
ক্রিকেটারদের আন্দোলন: দুর্বল হয়ে আসছে রাজনৈতিক দায়মুক্তি!





আফসান চৌধুরী
Friday, Oct 25, 2019, 11:00 am
Update: 25.10.2019, 11:02:39 am
 @palabadalnet

বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই একটা উত্তেজনাকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কারণ প্রতিদিনই এখানে রোমাঞ্চকর সব খবর শিরোনাম হচ্ছে। এটা অনেকটা টিভি সিরিয়াল দেখার মতো যেখানে প্রতিদিনই উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধরা পড়ছেন। যারা ধরা পড়েছেন, তারা অজানা কারণে ক্ষমতার কাছে ধরা পড়েছেন এবং এখন তাদের কড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।

ঠিক হোক বা ভুল, অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে, রাজনীতির অধিকাংশ ক্ষমতাধর মানুষই অপরাধী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের রাঘব বোয়ালদের মালিকানায় অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার খবর প্রকাশ হওয়াটা ছিল একটা বড় আবিষ্কার। অবশ্য অনেকেই তাদের ব্যাপারে জানতেন। তবে খুব কম মানুষই এটা নিয়ে আগে কথা বলেছেন। কারণ এটা জানা ছিল যে, যারা এগুলো চালায় তারা মূলত ক্ষমতাসীন দলের হাতে ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেশিশক্তির কাজ করতো।

এই সব অপরাধী কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে যে সত্যটি নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেটা হলো বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন শ্রেণী এবং দুর্নীতিগ্রস্তরা একসাথেই বাস করে আসছিল। তাদের কিছু হয়তো ধরা পড়েছে, কিন্তু অধিকাংশই পড়েনি। এই সব ঘটনার মাধ্যমে ‘সৎ রাজনীতিবিদের’ ধারণাটাই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে গেছে যদিও বহু রাজনীতিবিদ এগুলোর প্রতিবাদ শুরু করেছেন। ধারণা হিসেবে এগুলো সবসময় সেখানে ছিল, এবং এই ষাঁড়াশি অভিযানের আগে যদি সেগুলোর কথা প্রকাশ্য বলা হতো, তাহলে মারাত্মক সহিংসতা শুরু হয়ে যেতো।

জনতার অভিমত

এমনকি আজও জনগণের ভূমিকা এখানে দর্শকের মতো এবং তারা জানে যে, কোন কিছুতেই তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। ক্ষমতাধররা যদি এমনকি সুবিধাভোগী অপরাধীদের উপরও ষাঁড়াশি অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা আসলে জনগণের ইচ্ছার কারণে হয়নি। এই সব অপরাধীদের বহু বছর ধরে এভাবে চলতে দেয়া হয়েছে। আসলে, সবকিছুই ক্ষমতাধররা যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেভাবে চলবে।

সে কারণে রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহের বিষয়টি জনপ্রিয় কোন বিষয় নয়। মানুষ অবশ্য অপরাধীদের ধরা পড়ে রিমাণ্ডে নেয়ার খবর পড়তে পছন্দ করে। অসহায় নাগরিকদের জন্য এখানে তৃপ্তির অনেক বিষয় রয়েছে।

কিন্তু মানুষের এতটুকু বোঝার মতো বোধবুদ্ধি রয়েছে – যেটা তারা অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে, ৫০ বছরে যেটা বদলায়নি, হাতেগোনা কয়েকজনকে ধরলেই সেটা বদলে যাবে না। এখানে সিস্টেমটা শুধু ধরা পড়ে গেছে।

ক্রিকেটারদের বিদ্রোহ

সে কারণে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট খেলোয়াড়দের বিদ্রোহের বিষয়টি বহু দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের সবাই মূলত এক হয়ে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছে। তারা বলেছে যে, দাবি না মানা পর্যন্ত তারা খেলবেন না। বাংলাদেশে এটা একটা বড় ধরনের সঙ্কট। ক্রিকেট জাতীয় রাজনীতির চেয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতি নিয়ে একটু তর্ক-বিতর্ক করা ছাড়া সেখানে মানুষের আর কোন স্বার্থ নেই।

কিন্তু ক্রিকেট এখানে মানুষকে আশা, গর্ব, মালিকানা ও অংশগ্রহণের অনুভূতিগুলো দেয়, যেটা অন্যান্য ক্ষেত্রে হারিয়ে গেছে। ক্রিকেট একই সাথে রোল মডেলও দিচ্ছে। কোন পুরুষ বা মহিলা সুস্থ মাথায় কোন রাজনীতিবিদকে তার রোল মডেল ভাববেন না। কিন্তু যে দেশে দেব দেবতার ঘাটতি পড়েছে, সেখানে ক্রিকেটাররা এখন নতুন দেবতা হয়ে উঠেছেন। রাজনীতি এবং শাসন ব্যবস্থা যে শূণ্যতা তৈরি করেছে, সেটা তারা পূরণ করছে। সে কারণে ক্রিকেটারদের আন্দোলন সামান্য কিছু রাজনৈতিক গুণ্ডাকে ধারার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের মা সংগঠন হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং এটার নেতৃত্বে আছেন নাজমুল হাসান পাপন, যিনি প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছের মানুষ। তিনি একই সাথে বেক্সিমকো গ্রুপের জন্যও কাজ করেন, যেটার মালিকও উপদেষ্টা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছের মানুষ। পাপন সাধারণভাবে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। এই ক্ষোভের একটা কারণ হলো পাপনের পরিচিতজনদের দিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালনার সিদ্ধান্ত।

বহু খেলা বিষয়ক ভাষ্যকার ও কর্মী বলেছেন যে, পাপন বিসিবিকে তার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের মতো পরিচালনা করে আসছেন। অনেকেই এখন অভিযোগ নিয়ে আসছেন। পাপন এখন কিছুটা দুর্বল অবস্থানে আছেন কারণ তার ঘনিষ্ঠ বিসিবি সহযোগীদের একজন গুণ্ডা-বিরোধী অভিযানে ধরা পড়ে কারাগারে রয়েছে।

পাপনের বিরুদ্ধে জুয়া ব্যবসায় জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, সে ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। তবে, শুরুতে তিনি খেলোয়াড়দের সাথে আলোচনা না করার হুমকি দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে হুমকি দিয়েছিলেন, পরে তিনি আলোচনার আহ্বান জানান।

দায়মুক্তি দুর্বল হয়েছে, খুশি মানুষ

অবশ্যই, ক্রিকেট জনতা যে কারণে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা হলো বর্তমান ষাঁড়াশি অভিযান। বহু ক্ষমতাধর লোকেরই এখন খোঁজ নেই, অনেকেই ক্ষমতাসীন দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, এবং আরও অনেকে আশাহত হয়েছে। দায়মুক্তির মাত্রা কমে যাওয়ায় একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই এখন সমালোচিত হচ্ছেন এবং অনেকেই মনে করছেন যে, তাদের কথা আগের চেয়ে আরো বেশি শোনা হবে এখন।

সুতরাং ক্রিকেটে এখন যেটা হচ্ছে, সেটা হলো কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তি আগে যে দায়মুক্তি উপভোগ করে এসেছেন, সেটা হারিয়ে যাওয়ার একটা প্রতিফলন। বাংলাদেশের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে দায়মুক্তির সংস্কৃতির উপর। এটা যদি দুর্বল হয়ে যায়, এটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, যে সিস্টেমটা গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

আফসান চৌধুরী: বিশিষ্ট সাংবাদিক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]