বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯ ২৯ কার্তিক ১৪২৬
 
মতামত
ফ্যাসিবাদের প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত
ফ্যাসিবাদের প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত





বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য
Monday, Oct 14, 2019, 1:13 am
 @palabadalnet

জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি, স্পেনের ফ্র্যাঙ্কো, চিলির পিনোচেত এদের শাসন বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করে রাজনৈতিক লেখক ড. লরেন্স ব্রিট ২০০৩ সালে ফ্যসিজম বা যেকোনো ফ্যাসিস্ট সরকারের চরিত্রের ১৪টি বৈশিষ্ট্য এক জায়গায় জড়ো করেছিলেন । ড. ব্রিট পরিষ্কার লিখেছিলেন এই ১৪টি বৈশিষ্ট্যই ফ্যাসিজিম চেনার উপায় ।  

১. শক্তিশালী উগ্র জাতীয়তাবাদের একটানা প্রচার: ফ্যাসিবাদীরা বা ফ্যাসিবাদী সরকার লাগাতার উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান , গান , সিনেমা ও বিভিন্ন রকমের অর্ধসত্য লেখা/ রচনা প্রচার করে চলে। পতাকার ব্যবহার খুব বেশি করা হয়। পোশাকে, রাস্তার মোড়ের বিল বোর্ডে সর্বত্র এসবের ব্যবহার দেখা যায় ।

২. মানবাধিকার রক্ষায় চূড়ান্ত অনীহা: রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দোহাই দেখিয়ে এবং সর্বোপরি ‘শত্রু’র ভয় দেখিয়ে জনগণকে এটা বোঝানো হয় যে সবসময় মানবাধিকারকে রক্ষা করার কোনও প্রয়োজনই নেই। ‘দেশরক্ষার’ তাগিদে মানুষ এসবে অভ্যস্ত হতে শুরু করলে এরপরের ধাপে আসে আইন বহির্ভূত বিচার সহ হত্যা , গুম খুন , বিনা বিচারে জেল ইত্যাদি ।

৩. শত্রু চিহ্নিতকরণ: উগ্র জাতীয়তাবাদের স্রোতে ভেসে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে মিছিল করে শাস্তি দাবি করে শাসকেরই তৈরি করে দেওয়া কোনও ‘শত্রু’র বিরুদ্ধে – যেমন কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে , কোনও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে , কোনো উদার মতবাদের বিরুদ্ধে এবং কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ।       

৪. যুদ্ধ সরঞ্জাম/ প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ: দেশজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্রের অপ্রতুলতা , বেকারি বৃদ্ধি কিংবা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা না থাকলেও প্রতিরক্ষা খাতে প্রয়োজনের চেয়েও বিপুল পরিমাণে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয় এবং সকল সময়ে দেশবাসীর সামনে সেনাবাহিনীর কাজকে গর্ব সহকারে মডেল হিসাবে পরিবেশন করা হয় ।

৫. প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক সমাজ: ফ্যাসিস্ট সরকার শাসিত সমাজ প্রায় পুরোটাই পুরুষকে প্রাধান্য দেয়। এককথায় চূড়ান্ত রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক।

৬. গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: ফ্যাসিস্ট সরকার নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে গণমাধ্যম অর্থাৎ খবরের কাগজ ও টেলিভিশনকে রাখে। কোনও সংবাদমাধ্যম তাদের বিরুদ্ধাচারণ করলে অথবা মনমতো খবর পরিবেশন না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। যুদ্ধের সময় কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয় ।  

৭. জাতীয় সুরক্ষা নিয়ে সর্বদা একটা চিন্তার আবহাওয়া তৈরি করা: এই অকারণ চিন্তার আবহাওয়া তৈরি করার জন্য সর্বদা একটা অমূলক ভয়ের / আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয় সমাজে সাধারণ মানুষের মধ্যে । 

৮. ধর্ম এবং সরকারকে এক করে দেওয়া: দেশের মধ্যে প্রচলিত প্রধান ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের আসল সমস্যা বা মতামতকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় শব্দবন্ধ বা কাল্পনিক ধর্মীয় ঘটনার উল্লেখ শোনা যায় সরকারি নেতা মন্ত্রীদের তরফ থেকে। অথচ সেই ধর্মে উল্লিখিত বা নির্দেশিত ভালো কাজকর্মের সাথে সরকারি কাজকর্মের বিন্দুমাত্র মিল থাকে না। এক্ষেত্রে স্রেফ ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে উলটোপথে চালনা করা হয় ।

৯. কর্পোরেট শক্তিকে সুরক্ষা প্রদান: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেই নির্দিষ্ট দেশের প্রধান প্রধান শিল্পপতিরা নিজেদের সর্বোচ্চ মুনাফার স্বার্থেই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে অর্থ সরবরাহ করে , নতুন নেতা তৈরি করে এবং সর্বোপরি সবরকম সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে ।  

১০. শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষায় ব্যাপক কাটছাঁট: যেহেতু একমাত্র সংগঠিত শ্রমিক শক্তিই ফ্যাসিবাদের ভয়ের কারণ হয় তাই হয় শ্রমিক সংগঠনগুলিকে একেবারে ভেঙে দেওয়া হয় কিংবা শ্রমিকদের যাবতীয় অধিকার ক্রমাগত খর্ব করা হতে থাকে ।

১১. বুদ্ধিজীবী এবং শিল্প সাহিত্যের প্রতি অনীহা: ফ্যাসিস্ট সরকার সবসময়েই উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণামূলক কাজে অনীহা প্রকাশ করে । এরকম সরকারের অধীনে মুক্ত চিন্তা প্রকাশের জন্য শিক্ষক অধ্যাপকদের পুলিশি হয়রানি ও জেলে যাওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার। সাহিত্য বা শিল্পকর্মে স্বাধীন মতামতের জন্য আক্রমণও নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যাসিস্টদের নিয়ে কার্টুন / মশকরা করা যায় না। শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সরকারি অনুদানও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১২. অপরাধ , সাজা ও পুলিশ রাষ্ট্র: ফ্যাসিবাদী শাসনে পুলিশকে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয় আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। দেশপ্রেমের টোটকায় বুঁদ রেখে মানুষকে প্রায়শই নাগরিক স্বাধীনতা থেকে দূরে রাখা হয়। পুলিশের অত্যাচার কিংবা এনকাউনটার ইত্যাদিকে বৈধতা দেওয়া হয়। ফ্যাসিস্ট শাসনের পরিপূর্ণ বিকাশে জাতীয় পুলিশ বাহিনীও তৈরি করা হয় যাদের হাতে অভূতপূর্ব সীমাহীন আইন বহির্ভূত ক্ষমতা দেওয়া থাকে ।

১৩. অবৈধ নিয়োগ এবং দুর্নীতি: ফ্যাসিস্ট শাসন সবসময়েই একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের মানুষ ও তাদের সহকারীদের দ্বারা পরিচালিত হয় যারা নিজেদেরই একে অপরকে সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে নিয়োগ করে থাকে। সরকারি নেতাদের দ্বারাই ফ্যাসিস্ট জমানায় সরকারি সম্পত্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ চুরি করা নিত্যদিনের ঘটনা ।

১৪. নির্বাচনে জালিয়াতি: কিছুক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট শাসনে নির্বাচনকে সম্পূর্ণরূপেই প্রহসনে পরিণত করা হয়। আবার অন্যসময় কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিহত্যা ঘটিয়ে বা অন্য কোনও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়ে নির্বাচনের অভিমুখ পালটে দেওয়া হয়। কখনও আইনের অপব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যার ক্ষেত্রে গণ্ডি টেনে দেওয়া হয়। কখনও মিডিয়াকে দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল খবর পরিবেশন করিয়ে জনমত অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় । ফ্যাসিস্ট শাসনের অন্যতম আর একটা বৈশিষ্ট্য হলো বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নির্বাচনে কারচুপি চালানো।

এই বৈশিষ্ট্যগুলি সাধারণ চরিত্র হলেও একবিংশ শতাব্দীর অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান ও বিকাশের আরও নানা রকম বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে ব্যবহার করেই বেড়ে ওঠা তার অন্যতম লক্ষণ বলে পর্যবেক্ষকরা বলছেন। 

ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিস্টসুলভ শক্তির শাসন প্রথম দিকে টিকে থাকে মূলত দেশের যুব অংশের প্রবল সমর্থনের জন্য। দেশে দেশে অতি দক্ষিণপন্থার বিকাশের ধারা নজর করলে দেখা যায় বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বায়নের কারিকুরি দেখলেও তার খুব কম অংশই সেই বিশ্বায়নের সুফল ভোগ করেছে। বরং একটা হতাশা, একটা ক্রোধ থাকে এদের মধ্যে। এদেরকেই আজ ইউরোপ আমেরিকা এশিয়া সহ দুনিয়া জুড়েই উগ্র দক্ষিণপন্থী উত্থানের অক্সিজেন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটাও বিশ্বায়ন, ঘৃণার। 

আমেরিকাতে এরা ট্রাম্পকে পছন্দ করছে , আর ভারতে মোদিকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণই দক্ষিণপন্থার দিকে চলে গেছে, একথা বলা একেবারেই ভুল হবে। কিন্তু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এই সমর্থককুলে যেমন বহু গরিব রয়েছেন তেমনি বেদের মধ্যে বিজ্ঞান খোঁজা আধুনিক ডিগ্রিধারীও উচ্চ মধ্যবিত্ত, ধনীও রয়েছেন। এদেরকে দিয়েই বা এদের ঘৃণাকে হাতিয়ার করেই যেকোনো বেআইনি ও মানবতাবিরোধী কাজে সরকার বৈধতা নিয়ে নেয়। আমাদের দেশে কাশ্মির একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হতে পারে। সরকার দেশের যুব প্রজন্মের বড় অংশের কাছে এই ধারণা তৈরি করতে পেরেছে যে, কাশ্মিরিদের এরকম বন্দিদশাই প্রাপ্য। ফেসবুক টুইটার গুগল সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় কাশ্মিরি মহিলাদের নিয়ে নানারকম ফ্যান্টাসি ছড়িয়ে পড়ছে । অর্থাৎ ‘জয়ে’র পর জমি জায়গা সহ নারীরও অধিকার। শেষ পর্যন্ত এটা কিন্তু আদি ফ্যাসিবাদের বিকৃত উল্লাস।

ভারতে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়ে গেছে, এমন মন্তব্য করা হচ্ছে না। দ্বিতীয় মোদি সরকার তৈরি হবার পরে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল পাশ হয়েছে ৩৫টি। ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে যা একটি রেকর্ড। এই বিলগুলির মধ্যে রয়েছে কুখ্যাত এনআইএ এবং ইউএপিএ সংশোধনী বিল যা একজন মানুষকে স্রেফ সন্দেহের বশে সন্ত্রাসবাদী দাগিয়ে গ্রেপ্তার করাতে পারবে। পাশ হয়েছে শ্রম অধিকার সংশোধনী আইন যা মালিকদের আরও সুবিধা দিয়েছে শ্রমিককে যখন তখন ছাঁটাইয়ে। দুঃখের বিষয় হলো,  প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সহ অধিকাংশ বিরোধী দল জোরের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। ব্যতিক্রম সেই বামপন্থীরা। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে রাস্তায় নেমে বামপন্থীরাই একমাত্র সোচ্চারে বিরোধিতা করেছে এই সব কালা কানুনের।

বিশিষ্ট লেখক এ জি নুরানি কদিন আগে বলেছেন - দেশরক্ষার এই লড়াই মানুষের দরবারে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই লড়াই জেতার কোনো শর্টকার্ট রাস্তাও নেই । মানুষকে উপযুক্ত শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমেই এই লড়াই জোরদার হবে। দরকারে ছড়িয়ে দিতে হবে পুরানো দিনের মতো সেই ছোট ছোট পুস্তিকা। ভারতের একটা সফল অতীত রয়েছে এই ক্ষেত্রে। পুস্তিকা রচনা করে দেশকে একসময় লাগাতার পথ দেখিয়েছেন গান্ধী, নেহরু , আজাদ , এম এন রায় , পি সি যোশী , রণদিভে প্রমুখ । দেশের মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে , বিশেষ করে গরিব ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষকে। জীবনজীবিকার সংগ্রামকে জোরদার করেই জনগণকে সমবেত করা সম্ভব। বামপন্থীরা সে চেষ্টাই করছেন। লড়াই সহজ নয়, তবু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য কেউ যেন বলতে পারে আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবেই লড়াইতে ছিলাম ফ্যাসিবাদের উত্থান প্রতিহত করার কাজে।

সূত্র: গণশক্তি

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদ

পালাবদল/এসএফ


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]