শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
শিল্প-সাহিত্য
পাঞ্জেরী: একজন ফররুখ আহমদের গল্প
পাঞ্জেরী: একজন ফররুখ আহমদের গল্প





আহমেদ দীন রুমি
Monday, Jul 22, 2019, 6:49 pm
 @palabadalnet

If a great poet were to rise among the mussulmans of India, he could write a magnificent epic on the death of Hossen and his brother. He could enlist the feelings of the whole race on his behalf.

ভারতে মুসলমানদের মধ্যে বড় কোনো কবি জন্ম নিলে হোসেন ও তার ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে চমৎকার এক মহাকাব্য লিখতে পারতেন। রূপদান করতে পারতেন গোটা জাতির অনুভূতিকে। (মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, পৃষ্ঠা- ৫১)

বন্ধু রাজনারায়ণকে লেখা চিঠিতে আক্ষেপ করে কথাটা বলেছিলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার এই আক্ষেপ মোচনের দায় কাঁধে নিয়ে কেউ দণ্ডায়মান হয়নি। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতিকে বাংলা সাহিত্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য আবির্ভাব ঘটেছিল একজন সাহিত্যিকের- ফররুখ আহমদ।

মাইকেল তার কাব্যকাহিনী গড়ে তুলতে যেমন মহাভারত ও রামায়ণের মতো গ্রন্থ বেছে নিয়েছিলেন; ফররুখ তেমন সামনে টেনেছিলেন বিশ্ব মুসলিম সাহিত্য, আলিফ লায়লা ও হাতেম তাই এর মতো কাহিনীর। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলিম জাগরণের যে স্রোত প্রবাহিত হয়, তিনি তার প্রত্যক্ষ ফসল। সেই সাথে গেয়েছেন মানবতার জয়গান। আযানের মতো উদাত্ত স্বরে তার আহবান ধ্বনিত হয়েছে জাতির উদ্দেশ্যে। 

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো উঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।

                         (পাঞ্জেরী, সাত সাগরের মাঝি)

জন্ম ও জীবন

১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার শ্রীরামপুর থানার মাঝাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফররুখ আহমদ। ১৯২৪ সালে মা রওশন আখতারের মৃত্যু ঘটে। ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে রিপন কলেজে ভর্তি হন। স্কুল জীবনেই সম্পর্ক স্থাপিত হয় কবি গোলাম মোস্তফা, কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল এবং কবি আবুল হাশিমের সাথে। বিখ্যাত সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ছিলেন তার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের সহপাঠী। পরবরর্তীতে আহসান হাবীব, আবু রুশদ ও আবুল হোসেনের সঙ্গে মিত্রতা হয়।

রিপন কলেজে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশীর মতো প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের। ১৯৩৯ সালে সেখান থেকেই আইএ পাশ করেন। বন্ধু হিসেবে পান সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও ফতেহ লোহানীকে। স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে বিএ ভর্তি হলেও অসমাপ্ত রেখেই নেমে পড়তে হয় কর্মজীবনে। ১৯৪৩ সালে কলকাতা আই.জি. প্রিজন অফিসে যোগদান করেন। একবছর পরেই সেখান থেকে সরে গিয়ে যোগ দেন সিভিল সাপ্লাই অফিসে। ১৯৪৫ সাল থেকে মোহাম্মদী পত্রিকাতে যোগ দেন। এই চাকরিতে ইস্তফা দিলে বেকার জীবনের শুরু।

দেশভাগের পর ঢাকায় রেডিও পাকিস্তানে যোগ দেন। প্রথমদিকে বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে মুসলিম রেনেসাঁর সমর্থক হন। ফররুখের মুখে বেজে উঠেছে স্বীকারোক্তির মতো,

যখন শুনেছি আমি মৃত্যু আছে সূর্যেরও, অম্লান
অগণন জ্যোতিষ্কের ভাগ্যলিপি মৃত্যু দিয়ে ঘেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ আকাশ রহস্যের ডেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ জীবন ক্ষণিকের গান।

- মুহূর্তের কবিতা

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতি তার ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তার লেখা ছিল কঠোর। ১৯৬৬ সালে সিতারা-ই ইমতিয়াজ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭১ সালে তিনি কোনো পক্ষেই যাননি। তারপরেও স্বাধীনতার পর তাকে চাকরির ক্ষেত্রে বিপর্যয়ে পড়তে হলো। এ সময়ে এগিয়ে এলেন আরেক কিংবদন্তী সাহিত্যিক আহমদ ছফা। ‘ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ শীর্ষক তীব্র ও তীক্ষ্ণ প্রতিবেদন লিখলেন গণকণ্ঠ পত্রিকায়। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে তিনি স্বজাতির অতীত ও বর্তমানকে বিম্বিত করেছেন দর্পণের মতো।

সাহিত্যচর্চা

কিশোর বয়স থেকেই কবিতার জগতে প্রবেশ করলেও ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত বুলবুল পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় ‘রাত্রি’ নামে এবং মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত মোহম্মদীতে ‘পাপ-জন্ম’ নামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘অন্তর্লীন’ প্রকাশিত হয় মোহাম্মদীতে আষাঢ় সংখ্যায়। অন্যান্য প্রকাশিত গল্প বিবর্ণ, মৃত বসুধা, যে পুতুল ডলির মা, প্রচ্ছন্ন নায়িকা প্রকাশিত হয় ১৩৪৪-৪৬ বঙ্গব্দের পরিসরে। ১৯৩৮ সালে আল্লামা ইকবালের মৃত্যুতে তাকে উদ্দেশ্যে করে লেখেন স্মরণী। ১৯৪১ সালে কাব্যে কোরান শিরোনামে মোহাম্মদী ও সওগাত পত্রিকায় বেশ কিছু সুরার স্বচ্ছন্দ অনুবাদ করেন।

ফররুখ আহমদ প্রথম খ্যাতি পান ১৯৪৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা 'লাশ' কবিতার জন্য। প্রকাশিত হয় সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আকাল’-এ। প্রথম কাব্যগন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয় এ বছরেই। কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির ও রেজাউল করীম তার কবিতার সম্ভাবনা প্রকাশ করেন। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ কাব্য-পুস্তিকা।

দেশভাগের বছর ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায়। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজাম মুনীরা’। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বেতারে প্রচারিত হয় তার কাব্যনাট্য ‘নৌফেল ও হাতেম’। প্রযোজক ও নায়ক হিসেবে ছিলেন খান আতাউর রহমান। ১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ লাভ করেন। একই বছর পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। পরবর্তী বছর নৌফেল ও হাতেম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ঢাকা হলে তাকে দেয়া হয় বিপুল সংবর্ধনা।

১৯৬৩ সালে ‘মুহূর্তের কবিতা’ সনেটগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহ’ তে ফররুখের ডাহুক আবৃত্তি করা হয়। পাখির বাসা নামে শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৯৬৫ সালে। পরের বছর আসে আরেকটি গ্রন্থ– হাতেম তা‘য়ী। গ্রন্থদ্বয়ের জন্য যথাক্রমে ইউনেস্কো পুরস্কার ও আদমজী পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারে অভিনবত্ব, বিষয়বস্তু ও মৌলিক আঙ্গিক তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। যেমন-

ভেঙে ফেলো আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ 
দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ; 
ছিড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ, 
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দাবাদ!

ব্যঙ্গকবিতা ও সনেটেও তার কৃতিত্ব অসাধারণ। অন্যান্য রচনাবলির মধ্যে আছে হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১, ছড়ার আসর (১৯৭০, শিশুতোষ), হরফের ছড়া (১৯৬৮), নতুন লেখা (১৯৬৯) প্রভৃতি। দুর্ভিক্ষ বিষয়ক কবিতা ১৯৭৪ (একটি আলেখ্য) তার সর্বশেষ লেখা। এছাড়া তার সামগ্রিক জীবনে লিখেছেন প্রচুর হামদা-নাত, অনুবাদ করেছেন মাওলানা শফিউল্লাহকে নিবেদিত উর্দু ক্বাসিদা এবং বিচ্ছিন্ন নানা কবিতা।

ফররুখ ও মুসলিম রেনেসাঁস

১৭৫৭ সালে পলাশীর ঘটনা, ১৮৫৭-৫৮ সালে ভারতের আজাদী আন্দোলন, পরবর্তী দিনগুলোতে ব্রিটিশ বিরোধী বিভিন্ন তৎপরতা, ১৯২৩ সালে তুরস্কে দীর্ঘকালের মুসলিম খেলাফতের অবসান প্রভৃতি ঘটনাবলি ফররুখ আহমদকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে রেনেসাঁয় জ্বলে উঠে ইউরোপ। তাদের অনুপ্রেরণা ছিল প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিক্ষা, শিল্প এবং সভ্যতা। ফররুখ আহমদ অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন নবম ও দশম শতকের বাগদাদ, কায়রো কিংবা কর্ডোবার ভাঁজে। আর তাই রুমি, ফেরদৌসি, জামী, কারবালা কিংবা শবে কদর অনায়াসে তার কবিতার বিষয়স্তু হয়ে উঠেছে। তার উদাত্ত বাণী,

ভেঙে ফেল আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ
দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ,
ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল-অবসাদ,
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ।

- সিন্দবাদ, সাত সাগরের মাঝি

রেনেসাঁ মানে পুরেনোকে জাগিয়ে তোলা না। পুরাতন ভিতের উপর নতুন ব্যবস্থা ও নতুন পরিস্থিতিতে সামঞ্জশ্যপূর্ণ জাগরণ। ফররুখ তা বুঝতে পেরেছিলেন তীব্রভাবে।

এজন্য অধঃপতিত মুসলিম জাতির আশা ও ঐতিহ্যকে তুলেছিলেন কণ্ঠ ও ভাষায়,

মোর জামাতের সকল স্বপ্ন ভেঙে ভেঙে হ’ল চুর,
মিশে গেল মরু-বালুকায়-সাইমুমে,
ঝড়-মৌসুমে চলো আজি মোরা গড়ি সেই কোহিতুর
কারিগর, তুমি থেকো না অসাড় ঘুমে।

- কারিগর, আজাদ করো পাকিস্তান

ফররুখ বনাম নজরুল

প্রায়ই ফররুখ আহমদের প্রসঙ্গ সামনে আসলে কাজী নজরুল ইসলামের নামকেও আনতে দেখা যায়। বস্তুত তারা উভয়েই বাংলার মুসলিমদের সমস্যা নিয়ে ভাবিত ছিলেন। তবে নজরুলের যখন সাহিত্য জীবনের সমাপ্তি, ফররুখের তখন শুরু। নজরুলের আবির্ভাব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়। বিপরীতে ফররুখ এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, পাকিস্তান আন্দোলন ও দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ফলে বাঙালি মুসলমানের বঞ্চনা, অপমান এবং সামাজিক হতশ্রী অবস্থা উভয়েই পর্যবেক্ষণ করলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সাড়াদান সমান ছিল না। মরু-ভাস্কর, কাব্যে আমপারা, রুবাইয়াতে উমর খৈয়াম কিংবা অজস্র গজল রচনার পরেও নিজেকে ধর্ম ও জাতের উর্ধ্বে উঠে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সমন্বয়বাদী হিসেবে। ১৯২৯ সালে এলবার্ট হলে বলতে পেরেছেন,

যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।

ফররুখ এদিক থেকে বিপরীত। তখন দুই প্রতিবেশি সম্প্রদায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের টানাপোড়েনে। তার দায়ভার উভয় সম্প্রদায়ের। আল্লামা ইকবালের ভাবশিষ্য ফররুখ নিজ জাতির সমস্যাকে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়েছেন। তার কথা ছিল,

হে মাঝি! এবার তুমিও পেয়ো না ভয়,
তুমিও কুড়াও হেরার পথিক-তারকার বিস্ময়,
ঝরুক এ ঝড়ে নারঙ্গী পাতা, তবু পাতা অগণন,
ভিড় করে-যেথা জাগছে আকাশে হেরার রাজতোরণ।

- সাত সাগরের মাঝি, সাত সাগরের মাঝি    

জীবন ও মানবতাবোধ

গণতন্ত্রী কিংবা সাম্যবাদীরা প্রায়ই ফররুখকে ভুল বোঝেন। প্রধান কারণ মুসলিম জাতীয়তাবোধ এবং ইসলামী ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার প্রতি তার দ্বিধাহীন সমর্থন। বস্তুত ফররুখ আহমদ আবিষ্কার করেছেন অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রামকে। তার বড় প্রমাণ লাশ কবিতাটি, যার মধ্য দিয়ে তার উত্থান।

শাশ্বত মানব-সত্তা, মানুষের প্রাপ্য অধিকার,
ক্ষুধিত মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় রুধিয়া দুয়ার,
মানুষের হাড় দিয়ে তার আজ গড়ে খেলাঘর,
সাক্ষ্য তার পড়ে আছে মুখ গুঁজে ধরণীর পর।

- লাশ, সাত সাগরের মাঝি

স্বধর্ম আর স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা তাকে চ্যুত করেনি বিশ্বমানবতা থেকে। তার কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে,

লোহুতে পার্থক্য নাই বনি আদমের।
শিরায় শিরায় আর ধমনীতে দেখি বহমান
এক রক্তধারা।

- হাতেম তায়ী

সাম্যবাদ কিংবা গণতন্ত্রের চরম উদ্দেশ্য সামাজিক শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ফররুখ ইসলামের আদর্শের সাথে তা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই নিপীড়িতের হয়ে, অত্যাচারিতের হয়ে বারবার ধ্বনিত হয়েছে তার কলম ও কণ্ঠ।

ফররুখ ও আধুনিকতা

তথাকথিত আধুনিক কবিদের মতো না হয়েও ফররুখ আহমদ আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা তার লেখাতেও দৃশ্যমান। হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’ বই প্রকাশ করেন ১৯৯৩ সালে। ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তার অভিমত উল্লেখযোগ্য। ‘ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তরণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তাঁর কাব্যভাষা এবং আঙ্গিকের প্রয়োগে।’ চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারে তার মুন্সিয়ানা অনন্য।

রাত্রির অগাধ বনে ঘোরে একা আদম-সুরত
তীব্রতর দৃষ্টি মেলে তাকায় পৃথিবী,
জাগো জনতার আত্মা, ওঠো, কথা কও,
কতোকাল আর তুমি ঘুমাবে নিসাড়
নিস্পন্দ।

- রাত্রির অগাধ বনে, আজাদ করো পাকিস্তান

কাব্যকে নিছক পদ্যে রূপান্তরিত হবার হাত থেকে বাঁচিয়ে তার সাথে জীবনকে সম্পৃক্ত করতে পারার সাফল্যই তাকে ব্যতিক্রম করেছে। পরিণত করেছে মৌলিক কবিতে। চল্লিশের দশকে উপমহাদেশে মুসলিমদের স্বপ্নকে আর কোনো কবি এতটা কাব্যময় করে তুলতে পারেনি। এ যেন প্রিয় হারানো কোনো বাদশাহের অজস্র শব্দে সাজানো তাজমহল। চিত্রকল্পে সাদা, কালো, লাল এবং সবুজের সাথে হলুদের ব্যবহার দেখা যায়। জাফরান এবং জোছনাকে ফররুখ নিয়ে গেছেন অন্য মাত্রায়। আশা-নিরাশা, স্বপ্ন ও মোহময় জগতকে দৃশ্যমান করতে তিনি প্রায় ধূসর রংকে সামনে এনেছেন। নিকষ আকিক, লাল পোখরাজ, নারঙ্গী বন, রাঙা প্রবাল প্রভৃতি পাঠককে নিয়ে যায় অন্য এক জগতে। তারুণ্য-যৌবন, আশা ও আকাঙ্ক্ষা এসেছে নীল রঙ নিয়ে। যেমন-

ঝলসায় কালো মেহরাবে তাজা মুক্ত নীল প্রভাত। (বার দরিয়ায়)

আমরা কি ফররুখকে ভুল বুঝছি?

নয়া প্রগতিশীলতার স্রোতে ফররুখ আহমদের তাৎপর্য মূল্যায়নে বিশাল বড় ভুল হচ্ছে। প্রায়ই পাকিস্তান ও সাম্প্রদায়িকতার এক পৈতা ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে তার গলায়। অথচ বিষয়টাকে আমরা ইতিহাসের আলোয় ফেললে সত্যিকার ফররুখের মনস্তত্ত্ব ধরা যায়। তার উত্থানের সময় নিখিল ভারতে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব প্রকট। শুধু ভারতের স্বাধীনতা নয়, মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশ চেয়েছিল স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১৪) বইতে তখনকার তরুণদের মনোভাব টানতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন,

পাকিস্তান আনতে না পারলে লেখাপড়া শিখে কি করব?

তিনি আরও লেখেন,

অখণ্ড ভারতে যে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না এটা আমি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতাম।

আনিসুজ্জামানের আত্মজীবনী কাল নিরবধিতে বলা হয়েছে, ‘আমার জ্ঞান হতে দেখি, বাড়ির সকলে পাকিস্তান চান, মুসলিম লীগকে সমর্থন করেন এবং জিন্নাহ্‌কে নেতা মানেন। আশপাশেও এই ভাবটাই প্রবল ছিল’।  পরবর্তী সময়ের আরেক কিংবদন্তি আহমদ ছফার ভাষায়,

পাকিস্তান এবং ইসলাম নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি, এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। অন্য অনেকের কথা বাদ দিয়েও কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহ্‌র ওপর নানা সময়ে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে সঞ্চয়িতার মতো একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে বলেই আমাদের ধারণা। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃষ্ঠা- ৫৩৯)

আদতে ফররুখ আহমদের অবস্থান ছিল শোষণের বিরুদ্ধে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলি চালানোর প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তান থেকে তাৎক্ষণিক সব অনুষ্ঠান বন্ধ করেন তিনি। নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে নিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের হাত থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান। ‘হায়াতদারাজ খান’ ছদ্মনামে পাকিস্তানি শাসকচক্রের অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে রচনা করেন অসংখ্য ব্যঙ্গ কবিতা। খুব সম্ভবত তার অপরাধ, তিনি তার জনগোষ্ঠীর ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী নতুন জাগরণকে ধরতে পারেননি। 

সে যা-ই হোক, ফররুখ আহমদকে বিয়োগ করলে বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ এক অভিজ্ঞতাকে বিয়োগ করার মতো বোকামি হবে। বাঙালি জাতিসত্তা এবং বাংলা কবিতার অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে বিয়োগ করা হবে। ফররুখ আহমদের প্রয়োজনীয়তা বাঙালির ইতিহাসের জন্যই। পৃথিবীর কোনো জাতিই নিশ্চয়ই নিজের সংস্কৃতির সম্পদকে ছুড়ে ফেলবে না। ফররুখ আহমদের অস্তিত্ব বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্য বাড়ায় বৈ কমায় না। বহু ফুলের উপস্থিতি যেমন আরো বৈচিত্যময় ও সমৃদ্ধ করে তোলে বাগানকে।

পালাবদল/ ডেস্ক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]