মতামত
কংগ্রেসের কমান্ডহীন হাইকমান্ড
কংগ্রেসের কমান্ডহীন হাইকমান্ড





সমৃদ্ধ দত্ত
Saturday, Jul 17, 2021, 6:00 am
Update: 17.07.2021, 6:03:37 am
 @palabadalnet

সোনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধী এক কথার মানুষ। তারা স্বধর্মে অটল। বিগত ২২ বছরে তারা নিজেদের দলের কোনো রাজ্য নেতাকে এককভাবে শক্তিশালী অথবা জনপ্রিয় হওয়াকে মোটেই পছন্দ করেননি। এমন একটা ব্যবস্থা করেছেন, যাতে তারা দল ছেড়ে চলে যান। এই ঐতিহ্য আজও চলছে। 

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মহারাষ্ট্র সরকারের এপিসেন্টার কে? শারদ পাওয়ার। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কে? জগনমোহন রেড্ডি। আসামের মুখ্যমন্ত্রী কে? হিমন্ত বিশ্বশর্মা। আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে? সর্বানন্দ সোনেওয়াল। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কে? পেমা খান্ডু। মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী কে? এন বীরেন সিং। পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী কে? এন রঙ্গস্বামী। মধ্যপ্রদেশে আগামীদিনে কে হবেন প্রধান মুখ? এবং তারপর কোনো একদিন মুখ্যমন্ত্রী? জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। এদের পরিচয়ের মধ্যে সাদৃশ্য কী? এরা সকলেই কংগ্রেসে ছিলেন। সকলেই কংগ্রেস পরিত্যাগ করেছেন। এবং নিজেদের রাজ্যের শীর্ষে উঠেছেন দলত্যাগের পর। তাদের কংগ্রেসে ধরে রাখার কোনো চেষ্টা হয়নি। অথবা হলেও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমাধানসূত্র বের করে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় নেয়নি দিল্লির হাইকমান্ড।  

বর্তমান কংগ্রেস হাইকমান্ডের একটাই নীতি। দীর্ঘদিন ধরে সেই নীতি থেকে তারা সরে যাচ্ছে না। একেই বলে স্বধর্মে অবিচল থাকা। নীতিটি হলো, সিদ্ধান্তহীনতা। ইউপিএ সরকার থেকে কংগ্রেদের সাংগঠনিক রদবদল।  কোনো দ্রুত এবং স্থির সিদ্ধান্ত না নেওয়াই হলো কংগ্রেসের অঘোষিত সিদ্ধান্ত। এই প্রবণতা বজায় রাখার রেকর্ড সৃষ্টি করছে গান্ধী পরিবার। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির একটাই অভিযোগ ছিল ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে। পলিসি প্যারালিসিস। অর্থাৎ নীতি ও সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ এই সরকার। পরপর দুটি ইউপিএ সরকার প্রচুর ভালো কাজ করেছে। কিন্তু ওই পলিসি প্যারালিসিস তাদের পঙ্গু করেছে প্রচারের ময়দানে। সত্যিই তারা মূল্যবৃদ্ধি থেকে দুর্নীতি, কোনো ইস্যুতেই স্ট্রং কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি সেই সময়। শুধু কাজ দিয়ে হয় না। আজকাল এই নতুন ভারতে পারসেপশন অর্থাৎ ইমেজ অনেকটাই তাৎপর্যপূর্ণ। 

যদিও কাজ না করে শুধু ইমেজ বিল্ডিং করলেও কিন্তু কোনো সরকার সাফল্য পায় না। যেমন আজকের মোদি সরকার। সারাদিন, সারা বছর ধরে শুধুই হেডলাইন ম্যানেজমেন্ট সরকারে পরিণত হয়েছে। নিত্যনতুন স্লোগান, নিত্যনতুন মায়াঞ্জন মাখা ঘোষণা এবং জনতাকে জোর করে বোঝানোর চেষ্টা যে, তোমরা ভালো আছো। সে জনতা না মানলেও এরা জবরদস্তি ঢাকঢোল পিটিয়ে মানিয়েই ছাড়বে যে, বলো তোমরা ভালো আছো! বলো আমাদের সরকার সফল! ইত্যাদি। পেট্রল ডিজেল ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে, মূল্যবৃদ্ধি চরমে, চাকরি নেই, জীবিকা নেই, কোভিড মোকাবিলায় কীভাবে ভারতবাসী স্বাভাবিক জীবনে ফিরবো তার কোনো দিশা নেই, অথচ এদের প্রচারে নাকি মাথা নেড়ে বলতে হবে, হ্যাঁ, আমরা ভালো আছি। আশ্চর্য এক সরকার!  সুতরাং এটাও কোনো পথ নয়। 

কিন্তু কংগ্রেস ২০০৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত অসংখ্য উন্নয়নের পদক্ষেপ নিয়েও স্রেফ ভাবমূর্তিকে স্বচ্ছ ও সফল রাখতে পারলো না সিদ্ধান্তহীনতার কারণে। এর অন্যতম কারণ প্রধানমন্ত্রীর অথরিটি ছিল না। তিনি বলবেন অথবা করবেন এক, আবার সেদিন বিকেলে হাইকমান্ড সম্পূর্ণ উল্টো কিছু হয়তো বলে বসবে। যা যতটা ড. মনমোহন সিংয়ের পক্ষে অসম্মানজনক, ততটাই সরকার ও দলের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে সহায়ক। 

সরকার চালানোর এই প্রক্রিয়ার ছাপ পড়েছে দল পরিচালনাতেও। সরকারে থাকাকালীন সাধারণত প্রত্যেক শাসক দল মুন্সিয়ানার সঙ্গে নিজেদের দলীয় সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে তোলার দিকে মনোনিবেশ করে। কোথায় কী! কংগ্রেস ওই ১০ বছরে নিজেদের দলের সংগঠনকেই বরং বেশি করে ডুবিয়ে দিয়েছে। কেন? কারণ, কংগ্রেসের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং দলের ওয়ার্কিং কমিটির নীতি নির্ধারকেরা নিজেদের এলাকায় জনপ্রিয় যারা অথবা ভালো বাগ্মী কিংবা সংগঠনে সফল, এরকম কাউকে নেতৃত্বে তুলে আনেননি। গুরুত্বপূর্ণ পদও দেওয়া হয়নি। সুতরাং ২০১৪ সালে দেখা গেল সরকারের পতন ঘটেছে, দলের সংগঠনও ধসে পড়েছে।  

কংগ্রেসের সিদ্ধান্তহীনতা ও ভুল সিদ্ধান্তের পরবর্তী মিশন পাঞ্জাব ও রাজস্থান। পাঞ্জাবে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং ২০১৭ সালে নিজের ক্যারিশমায় জয়ী হয়েছেন। আকালি দল ও বিজেপি জোটের সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে জিতিয়ে এনেছেন পাঞ্জাবে। এমনকী আম আদমি পার্টির উপস্থিতি সত্ত্বেও। ক্যাপ্টেন সফল মুখ্যমন্ত্রী। দলে অথরিটি আছে। রাজ্যে গ্রহণযোগ্যতা আছে।  অথচ তাকে ঠিক ভোটের আগে ডিসটার্ব করতে কে নেমেছেন? একজন নন-সিরিয়াস ব্যক্তিত্ব। যিনি সকালে টেলিভিশন শোতে লোক হাসান, দুপুরে ক্রিকেট ধারাবিবরণী দেন, সন্ধ্যায় কংগ্রেস করেন ‌এবং রাতে কংগ্রেস বিরোধী ট্যুইট করেন। নভজ্যোৎ সিং সিধু। 

তিনি যদি অমরিন্দর সিংকে সরানোর চেষ্টা করে নিজেই পাঞ্জাব কংগ্রেসের প্রধান হওয়ার আবদার করেন, সেটা যে কোনো সেনসিবল দলের পার্টি নেতৃত্ব প্রথম দিনেই কড়া এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেবে। কিন্তু কংগ্রেসের হাইকমান্ড কী করল? সেই সঙ্কটকে জিইয়ে রাখল। তারা দেখা করছেন সিধুর সঙ্গে। ছবি তুলছেন সিধুর সঙ্গে। অথচ ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের জেতা ম্যাচ ছিল আগামী বছর। তিনি দ্বিগুণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রশান্ত কিশোরকে এক বছর আগেই মনোনীত করেছেন নিজের উপদেষ্টা হিসেবে। প্ল্যান করে এগচ্ছেন। কৃষক বিক্ষোভের কারণে পাঞ্জাবে বিজেপির অবস্থা শোচনীয়। অকালি দল ও কংগ্রেসের মধ্যে লড়াই হবে। এবং অবশ্যই আগামীকাল ভোট হলে কংগ্রেস জয়ী হবে। কিন্তু এই জেতা খেলাকে হারিয়ে দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন রাহুল গান্ধী সোনিয়া গান্ধীরা। আজীবনের দোলাচলের কারণে। 
 
রাহুলের যা নেই, নরেন্দ্র মোদির সেই দুটি সম্পদ আছে। যা দল পরিচালনায় সবথেকে বেশি দরকার। একক জনপ্রিয়তা এবং দলের মধ্যে অথরিটি। এই দুটি বৈশিষ্ট্যই তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যতই নরেন্দ্র মোদি জনপ্রিয়তা হারাবেন, ততই তার দলের ওপর অথরিটি কমবে। সেই কারণেই মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এত ভয় পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে একাকী একজন আঞ্চলিক নেত্রী যে অথরিটি নিয়ে মোদির টিমকে হারিয়ে দিয়েছেন, সেটা অবিশ্বাস্য। ভারত তো বটেই, আন্তর্জাতিক মহলেই এই বার্তাটি বিপুল ধাক্কা দিয়েছে মোদির ভাবমূর্তিকে।  ইমেজ বিল্ডিংয়ের নেশায় তিনি বা তার দল কুশলতা ছাড়াই ঝাঁপিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। এবং পরাস্ত হয়েছেন। এটা তার অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো। এটাই বেশি ভয়ের। 

ঠিক এখান থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে একটি বিশেষ প্রবণতা। সেটি হলো, আজকাল আর ভারত রিমোর্ট কন্ট্রোলে পরিচালিত হতে চাইছে না। অর্থাৎ রাজ্যজয়ের ক্ষেত্রে দিল্লিতে বসে থাকা নেতার ক্যারিশমা অথবা জনপ্রিয়তা কোনো ফ্যাক্টর হচ্ছে না। রাজ্যের চাই নিজের জোরালো নেতা। সেই কারণে দেখা যাচ্ছে ঠিক যে রাজ্যগুলিতে বিজেপির নিজস্ব কোনো শক্তিশালী নেতা নেই, সেখানে বিজেপি জিততে পারছে না। মোদির হাজারো উপস্থিতি সত্ত্বেও নয়। 

যেমন, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তামিলনাড়ুতে এবার বিজেপি পরাস্ত। আবার আসামে জয়ী। কেন? কারণ আসামে কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া হিমন্ত বিশ্বশর্মা এককভাবে অনেক জনপ্রিয় এক নেতা। তাই আসামবাসী দ্বিধা করেনি বিজেপিকে ভোট দিতে। তিনিই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। উত্তরাখণ্ড, গোয়া, হরিয়ানায় বিজেপি সংগঠনগতভাবে টালমাটাল। সেখানে সরকার চলছে দলের। কিন্তু শক্তিশালী রাজ্য নেতা নেই।  ঠিক সেই কারণে ঝাড়খণ্ডে বিজেপি হেরে গিয়েছে। মহারাষ্ট্রে পরাজিত। সুতরাং এখন মোদি এবং অমিত শাহ চেষ্টা করছেন রাজ্যে রাজ্যে জনপ্রিয় একজন নেতাকে দলের মুখ করতে। যাতে কেন্দ্রে মোদি এবং রাজ্যে অন্য কেউ, এরকম একটা বার্তা দেওয়া যায়। সেই নেতা কংগ্রেস থেকে এলো কি না সেটা নিয়ে আর মাথাব্যথা নেই মোদির। বরং অন্য যেকোনো দলের থেকে রাজ্যে জনপ্রিয়, এরকম নেতাদের দলে আনছেন তিনি যেনতেনপ্রকারে। পাশাপাশি নিজের দলের নতুন প্রজন্মের নতুন নেতাদের প্রমোট করার কাজও চলছে। 

পক্ষান্তরে রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধীরা উল্টো। শতাব্দীপ্রাচীন একটি দলকে কীভাবে চালানো উচিত, কী কী ইস্যু চিহ্নিত করে ময়দানে ঝাঁপানো দরকার, কোন কোন নেতা কোন কোন রাজ্যে যোগ্য, কীভাবে শূন্য থেকে হলেও শুরু করা যায় এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা‌ই নেই। তাদের দল থেকে চলে যাওয়া নেতানেত্রীরা কতটা সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের দলগুলো চালাচ্ছেন সেটা দেখেও রাহুলের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সিদ্ধান্তহীনতা কতটা চরম হলে একটা জাতীয় স্তরের দলে স্থায়ী সভাপতি নিয়োগ করা হয় না দীর্ঘদিন, সেটা সহজেই অনুমেয়। এখনই উচিত গান্ধী পরিবারের বাইরের কোনো অভিজ্ঞ কংগ্রেস নেতাকে সভাপতি করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাহুলরা কি আদৌ চান মোদি সরকারকে হারাতে? নাকি তারা এভাবেই ট্যুইট বিপ্লবী হয়েই থেকে যেতে পছন্দ করবেন? তাদের পরিচয় কী? কমান্ডহীন হাইকমান্ড? 
 
সমৃদ্ধ দত্ত: ভারতীয় সাংবাদিক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]